হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের বিরলপ্রজ ঔপন্যাসিকদের একজন যিনি জীবত থাকাকালে এবং মৃত্যুর পরেও সমানভাবে জনপ্রিয়। তবে, এখানেই শেষ নয়, যতই দিন যাচ্ছে ততই তিনি নতুন, নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছেন। কথাসাহিত্যে তাঁর অবদানের মূল্যায়ন এবং লেখার গুণবিচারে ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলো পাওয়া তাঁর লেখকসত্তার অমরতার চিহ্নকেই ধারণ করে। হুমায়ূনকে নিয়ে পাঠকদের কৌতূহলের নিবৃত্তি ঘটেনি এখনও। কিন্তু তাকে নিয়ে এত লেখার ভিড়েও ব্যক্তি হুমায়ূনের অব্যক্ত দিক, পারিবারিক জীবন আর শিল্পীসত্তাকে তুলে ধরতে পারে এরকম লেখা হয়েছে খুবই কম। কিংবা হয়ইনি বলা যায়। এরকমই এক কাজ ‘‘কয়েকজন হুমায়ূন আহমেদ’’।
হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সাপ্তাহিক বিচিত্রা এবং সাপ্তাহিক ২০০০-এ ১৯৯২ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক আসিফ নজরুল কয়েকটি প্রতিবেদন করেছিলেন। কালের বিচারে যেগুলো এখন অমূল্য কিন্তু পাঠকদের হাতের নাগালে নেই। এই প্রতিবেদনগুলোই এতোকাল পর মলাটবদ্ধ হয়েছে এই বইয়ে। এগুলো ছাড়াও যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি লেখা। মূল্যবিচারে এই সংযোজিত লেখাগুলো বইটিকে আরও সম্মৃদ্ধ করেছে।
বইটিতে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে এসেছে, বাবা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে শীলা আহমেদের একটি সাক্ষাৎকার ‘‘বাবার বইয়ের মধ্যে একটা মায়া আছে’’— সাক্ষাৎকারটিতে শীলা আহমেদ বাবার লেখালেখির প্রক্রিয়া এবং প্রকাশকদের চাপ, শেষদিকের লেখার পুনরাবৃত্তি নিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করেছেন । আর এই অংশেই আছে কচ্ছপের গল্প নামে স্বয়ং হুমায়ুন আহমেদের একটি লেখা। লেখকদের নিজেদের মাঝে হিংসার সরস বিবরণ নিয়ে লেখা এটি।
শুরুতেই হুমায়ূন আহমেদের সাথে আসিফ নজরুলের সাক্ষাৎ নিয়ে ‘‘অন্তরঙ্গ হুমায়ূন’’ নামক অধ্যায়ে আসিফ নজরুলের স্বকীয় পর্যবেক্ষণঋদ্ধ স্মৃতিকথা পাই আমরা। এখানে আসিফ নজরুলের সাথে তাঁর সম্পর্কের ধরণ এবং সেই সময়পর্বে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তারও একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। কথাসাহিত্যিক আসিফ নজরুলের সাহিত্যকর্মেরই আরেক উদাহরণ যেন সরস আর প্রাঞ্জল বর্ণনায় এই স্মৃতিচারণ।
বইটির মূল ভিত্তিপ্রস্তরে আছে, হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত জীবনের এক গভীর আর স্পর্শকাতর অধ্যায়, উনার প্রথম স্ত্রীর সাথে যাপিত কালখণ্ডকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বর্ণনা ‘‘গুলতেকিনের সংসারে হুমায়ূন’’, এখানে এক অন্য হুমায়ূনকে পাওয়া যায়। আর আমাদের চোখেও রহস্যের কুয়াশা সরে যেতে থাকে যেন ধীরে ধীরে।
আরেকটি প্রতিবেদন তাঁর লেখক সত্তা নিয়ে ‘‘অভিযুক্ত হুমায়ূন আহমেদ : সাহিত্য বনাম আদালত’’। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য নিয়ে বলতে বলতে প্রসঙ্গক্রমে আদালত নিয়েও তথ্যপূর্ণ বিবেচনা এনেছেন লেখক। আমরা দেখেছি আদালত সমাজ, রাষ্ট্র আর লেখকের ত্রিমুখী অবস্থানের সমাধান দিতে পারে না, কিন্তু সৎ সাহিত্যিক নিজেকে সমাজ আর রাষ্ট্রের সমালোচক হিসেবেই দেখেন, এরকমটাই বলে সাহিত্যের চিরাচরিত ইতিহাস। আসিফ নজরুলের অন্তর্ভেদী পর্যবেক্ষণ এখানে ভিন্ন আলো ফেলেছে। এখানে উল্লেখ্য, আমরা দেখতে পাই আসিফ নজরুল বাকের ভাইয়ের ফাঁসি নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদনে এই আদালতেরই ভিন্নরূপ নিয়ে কথাসাহিত্যের সমান্তরালে নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ কেমন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারতেন যেন তারই এক বিবরণী উপস্থাপন করেছেন।
বইটিতে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে এসেছে, বাবা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে শীলা আহমেদের একটি সাক্ষাৎকার ‘‘বাবার বইয়ের মধ্যে একটা মায়া আছে’’— সাক্ষাৎকারটিতে শীলা আহমেদ বাবার লেখালেখির প্রক্রিয়া এবং প্রকাশকদের চাপ, শেষদিকের লেখার পুনরাবৃত্তি নিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করেছেন । আর এই অংশেই আছে ”কচ্ছপের গল্প” নামে স্বয়ং হুমায়ুন আহমেদের একটি লেখা। লেখকদের নিজেদের মাঝে হিংসার সরস বিবরণ নিয়ে লেখা এটি।
এই বইয়ে এক অনন্য কথাসাহিত্যিকের শিল্পসত্তা এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন আকর্ষণীয়-অনাকর্ষণীয় দিক উপস্থাপিত হয়েছে আসিফ নজরুলের চোখে। এরই ধারবাহিকতায় এসেছে ‘‘নুহাশপল্লীর হুমায়ূন’’ আর ‘‘অবিশ্বাস্য হুমায়ূন’’ শিরোনামে লেখা দুইটি।
বাড়তি হিসেবে বলা যায় এক মলাটের ভেতর পাঠকরা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে গভীর এক অর্ন্তদৃষ্টির সাক্ষাৎ পাবেন।
কয়েকজন হুমায়ূন আহমেদ
লেখক : আসিফ নজরুল
বিষয় : স্মৃতিকথা
প্রকাশন : বাতিঘর
প্রকাশ সাল : ২০২২
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১২০
মুদ্রিত মূল্য : ৩২০ টাকা।
বইটি কিনতে হলে :
কয়েকজন হুমায়ূন আহমেদ – বাহিরানা