“দলিত কী কথা বলতে পারে?”
আর্টিক্যাল ১৫-এ আয়ুষ্মান খুরানা তার অভিনয় প্রতিভা চিনিয়ে দিয়েছিলেন। আন্ধাধুন-চলচ্চিত্রেও নিজেকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় যখন ‘আনেক’-এর ট্রেলার এসেছিল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এটি আর্টিক্যাল ১৫-এর মতোই কিছু একটা হবে। তবে মুক্তির পর এই এ্যাকশন থ্রিলারধর্মী চলচ্চিত্রটি যেন বলিউডে দলিত বা আদার কিংবা মাইনরিটিকে উপস্থাপনে মাইলফলক সৃষ্টি করেছে। ইংরেজিতে যাকে গ্রাউন্ড ব্র্যাকিং বলে, সেইরকমই এর কাহিনি। চলচ্চিত্রটিতে এ্যাকশন থ্রিলারের সব উপাদান ব্যবহার করেও বিরোধী দুইপক্ষের মাঝে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ঐতিহ্য তৈরি করেছেন অনুভব সিনহা। অন্যভাবে রাষ্ট্র নামক বস্তুটির সাথে জনগনের সম্পর্কের তদন্তই ‘আনেক’ নামক এই চলচ্চিত্রটি। যেখানে প্রথাগত বলিউডি চলচ্চিত্র রাজধানী ‘দিল্লী’র বাইরে অন্যঅঞ্চলগুলোর নিজস্বতাকে, বিশেষ স্বরকে, অধিকারকে, তাদের দু:খ-দুর্দশাকে বা বাস্তবতাকে স্বীকার করে না। অনুভব সিনহা সেখানে উল্টো পথে হেঁটেছেন, তিনি কেন্দ্রের (দিল্লী) সাথে প্রান্তের (বাকিঅঞ্চল) সম্পর্কের ধরণটাকেই নির্ণয় করতে চেয়েছেন। তাই গায়ত্রী চক্রবর্তীর প্রশ্নটিকে এখানে মূল ভূমিকায় নিয়ে এসেছেন তিনি, “দলিত কী কথা বলতে পারে?”
চলচ্চিত্রটিতে আইপিএস অফিসার ‘আঞ্জানাইয়্যা বেল্লামকুণ্ডা’ নামক চরিত্রে জে.ডি চক্রবর্তী মাত্র কয়েক মিনিট স্ক্রিনটাইম পেয়েছেন, কিন্তু এর মাঝেই তার অভিনয় ছিল অনবদ্য। তার চরিত্রটি এমন, যিনি সত্যিকারভাবেই রাষ্ট্রের সিস্টেমকে জানেন, তিনি জানেন সিস্টেমের ভেতরে থেকে একে বদলানো যাবে না। শান্তিকে তিনি সাবজেক্টিভ বা অনিরপেক্ষ মনে করেন। “বুদ্ধ তো শান্তি পেয়েছিলেন, কিন্তু তার স্ত্রী আর ছেলের কী হয়েছিল? তারা কী শান্তি পেয়েছিল?” সিনেমাটিতে তার প্রথম আবির্ভাবেই, জ্বলে যাওয়া এক গ্রামে তদন্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন এই কথাগুলো।
‘আনেক’-এর গল্প এরকম— ভারত বহুরাজ্য নিয়ে গঠিত একটি দেশ। সব রাজ্যই আবার কেন্দ্রের অধীনে। এই রাজ্যগুলোর নিজস্বতা আছে, আবার যেহেতু কেন্দ্রেরও নিজস্ব আখাঙ্ক্ষা আছে, তাই আখাঙ্ক্ষাগুলো যদি পরস্পর বিরোধী হয় তাহলে বিরোধ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই কেন্দ্রকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। এরকমই এক রাজ্য ভারতের পূর্বাঞ্চল, যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর সাথে কেন্দ্রের সম্পর্ক ঠিক করার জন্য সিক্রেট এজেন্ট জশোয়াকে (আয়ুষ্মান খুরানা) পাঠানো হয়। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বিদ্রোহী লিডার টাইগার সাংগা (লইটংবাম দোরেন্দ্র সিং)’র সাথে কেন্দ্র শান্তিচুক্তি করতে চায়, আর এতে যেন কোনো বাধা না পড়ে সেই দায়ত্বিভারই জশোয়ার উপর। টাইগার সাংগাকে ভয় দেখানোর জন্য তার টিম ‘জনসন’ নামে এক কল্পিত চরিত্রের সৃষ্টি করে, কিন্তু এই চরিত্রটি এতোই জনপ্রিয় রূপক হয়ে যায় যে জনগণও এই নামের সাথে একাত্ব হয়ে পড়ে। এইভাবে আরেক বিদ্রোহী দলের লিডার নিজেকে ‘জনসন’ বলে দাবি করতে থাকে। কিন্তু এইসব বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রকৃত ‘জনসন’ আসলে কে, সেটা জশোয়া বা তার টিম জানে না, তাকে খুঁজে বের করাই জশোয়ার কাজ হয়ে পড়ে। এই পর্যায়ে ‘আইডো’ (আন্দ্রেয়া কেভিচুসা) নামে এক বক্সারের সাথে জশোয়ার পরিচয় হয়, তার বাবা ওয়াংনাও (মিপহাম ওটসাল)কেই বিদ্রোহীদের লিডার বলে ধারণা করে সে। কিন্তু একসময় জশোয়ার মনে শান্তি আর নিয়ন্ত্রণের বৈপরীত্য নিয়ে সন্দেহ জেগে ওঠে। নিয়ন্ত্রণেই কি শান্তি আসে? এরকম প্রশ্ন জেগে উঠতে থাকে তার মনে। আর এখানেই চলচ্চিত্রটি অন্য এক দিশায় মোড় নেয়, তার মনে হতে থাকে আসলেই কী কেউ শান্তি চায়?

অন্যদিকে আইডো, ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের মানুষের উপর যে বর্ণবাদী আচরণ করা হয় তার প্রতীক হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছে। বক্সিংকেই সে তার কন্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কারণ সে জেনেছে বিজয়ীকে কথা বলতে দেওয়া হয়, পরাজিতকে না। কিন্তু বিজয়ী যে এখানে কেন্দ্র আর পরাজিতের অপর নাম প্রান্ত, সেটা সে জানে না। সে এটাও জানে না, বক্সিং চ্যাম্পিয়ন হলে সে কেন্দ্রেরই কন্ঠস্বর হবে, প্রান্তের না। তার বাবাকে যখন সে তার খেলা দেখতে যাওয়ার কথা বলে, তখন তার বাবা তাকে বলে “আমার যুদ্ধ আজ থেকেই, তুমি যাবে?” সে যখন বলে এই যুদ্ধ তার না, তখন তার বাবা বলে তোমার যুদ্ধও আমার না, আমরা আলাদা-আলাদা যুদ্ধ করছি। এই যুদ্ধগুলোকে এক তারে মেলাতে হবে। এর আগে কিছুই সম্ভব নয়।
চলচ্চিত্রটিতে আইপিএস অফিসার ‘আঞ্জানাইয়্যা বেল্লামকুণ্ডা’ নামক চরিত্রে জে.ডি চক্রবর্তী মাত্র কয়েক মিনিট স্ক্রিনটাইম পেয়েছেন, কিন্তু এর মাঝেই তার অভিনয় ছিল অনবদ্য। তার চরিত্রটি এমন, যিনি সত্যিকারভাবেই রাষ্ট্রের সিস্টেমকে জানেন, তিনি জানেন সিস্টেমের ভেতরে থেকে একে বদলানো যাবে না। শান্তিকে তিনি সাবজেক্টিভ বা অনিরপেক্ষ মনে করেন। “বুদ্ধ তো শান্তি পেয়েছিলেন, কিন্তু তার স্ত্রী আর ছেলের কী হয়েছিল? তারা কী শান্তি পেয়েছিল?” সিনেমাটিতে তার প্রথম আবির্ভাবেই, জ্বলে যাওয়া এক গ্রামে তদন্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন এই কথাগুলো। সত্যিকারার্থে শুধুমাত্র কোনো প্রাজ্ঞ দার্শনিকই পারেন ধ্বংসের মাঝে দাঁড়িয়ে এরকম উক্তি করতে, জে.ডি খুব ভালোভাবেই সেটি বুঝেছিলেন বলে মনে হয়। অভিনয়ে দক্ষতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তিনি।
‘আনেক’-এর নতুনত্ব বুঝতে হলে এর মাঝে যে বিরোধীপক্ষ আছে তাকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সেটি বুঝা দরকার। এখানে বিরোধীপক্ষ খোদ রাজ্যটির জনগণ, একজন দুইজন নয়, সবাই। আর এই সবাই-ই এখানে প্রকৃত বিচারে দলিত। কেন্দ্র যাদের কথা বলার অধিকার আছে বলে মনে করে না। একইরকম ঘটানা অন্যত্রও যে চলছে তা বুঝাতে পরিচালক কাশ্মীরের ইঙ্গিতও দিয়েছেন ‘জশোয়া’র বস ‘আবরার হাসান’ (মনোজ পাহওয়া)কে দিয়ে। জশোয়া প্রায়ই আবরারের উল্লেখে ‘ব্যক্তিগত’ শব্দটি ব্যবহার করে। টাইগার সাংগাও প্রধানমন্ত্রীর সাথে মিটিংয়ে কাস্মীরের কথা উল্লেখ করে আবরারের কাছে। পূর্বাঞ্চল আর কাশ্মীর যে একই ভাগ্য বরণ করেছে, তার কথা বলে।
যাইহোক, মূল সত্যটি হলো জনগণকে কথা বলতে দেওয়া হয় না, সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের দমন করা হয়, তাদেরও যে কথা বলার অধিকার আছে, সেই দিকটিতেই নির্দেশ করা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। কিন্তু কী সেই কথা? সেটি কেউ জানে না, বর্তমানে কথার জায়গা নিয়ে নিয়েছে অস্ত্র। এই কারণে জশোয়ার প্রশ্নের উত্তরে ‘আঞ্জানাইয়্যা’ জানায়, “আসলে শান্তি নেই, আছে শুধু নিয়ন্ত্রণ। নিয়ন্ত্রণ সহজ।” আর ঠিক এখানেই প্রথাগত বলিউডি সিনেমার সাথে ‘আনেক’-এর পার্থক্য। এই চলচ্চিত্রে অন্তত দলিতকে চিহ্নিত করা হয়েছে, জনগণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সাধারণ জনগণ, যাদের ভোট ছাড়া কথা বলার অধিকারকে রাষ্ট্র স্বীকার করে না, আর ভোটের পর ক্রমেই তারা দলিতের মর্যাদাভুক্ত হয়। এই ঘটনাটা শুধু ভারতেই ঘটে এমন নয়, তৃতীয় বিশ্বের সর্বত্রই একইরকম। একদিক দিয়ে দেখলে পূর্বোল্লেখিত গায়ত্রী চক্রবর্তীর উক্তিটির সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে এই চলচ্চিত্র, এরকম প্রশ্ন তৈরি করে যে—রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের কাছে জনগণই কি প্রকৃত দলিত?
আবার, আঞ্জানাইয়্যা বেল্লামকুণ্ডা ( জে. ডি. চক্রবর্তী) বলে,
“যখন সবকিছু নিয়ন্ত্রনে থাকে তখন তাকে শান্তির মতো মনে হয়।
শান্তি কখনও অর্জিত হয় না, ভায়োলেন্স অর্জিত হয় শান্তির কারণে, দু:খিত নিয়ন্ত্রণের কারণে।
আমি মনে করি মানুষ শান্তি পছন্দ করে না।”
‘আনেক’ বহুঅর্থবোধক এক চলচ্চিত্র্র, এর সিনেমাটোগ্রাফি, চরিত্রনির্মাণ, প্লট আর বাস্তবতার সাথে মূল গল্পের যোগাযোগ একে অন্য মাত্রা দিয়েছে। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অনুভব সিনহা বর্তমান সময়ের কথাই বলেছেন সিনেমার ভাষায় তার মতো করে।
আনেক
পরিচালক: অনুভব সিনহা
প্রকাশকাল: ২০২২