বাহিরানা

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল বই রিভিউ—কল্লোল লাহিড়ী—নারীজীবনের হার না মানার উপাখ্যান


বাহিরানা ডেস্ক

কল্লোল লাহিড়ীর প্রথম উপন্যাস ‘গোরা নকশাল’ (২০১৭), প্রকাশের পরই বেশ সাড়া ফেলেছিল। এরপর, ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’ (২০২০), তাঁর লেখার পরিধিকে অন্য এক উঁচ্চতা দিয়েছে। বইটিতে তিনি দুইবাংলাকে ধরতে চেয়েছেন ইন্দুবালা নামের এক সংগ্রামী নারীর জীবনের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। দুই হাজার বাইশ সালে বইটির বাতিঘর সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পর সাহিত্যমহলে বেশ আলোড়ন তোলেছে।

উপন্যাসটির আখ্যানভাগে আমরা দেখতে পাই:

খুলনার মেয়ে ইন্দুর বিয়ে হয় কলকাতায়। এরপর নতুন জীবনে প্রবেশ করে জুয়াড়ী এবং মাতাল স্বামী, সেইসাথে শাশুড়ির বৈরিভাব আর নতুন পরিবেশ—এসবে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে সে। এসবের মধ্যেই সময় বয়ে যেতে থাকে তাও পঁচিশ বছর বয়সে সে বিধবা হয়। তিন সন্তান নিয়ে এরপর শুরু হয় তার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবন, যেখানে ক্রমেই সে দেখতে পায় স্বামী বেঁচে থাকতে যারা তাকে ঘিরে থাকত তারা দ্রুতই অপসারিত হচ্ছে। অকস্মাত্ এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকতে হলে সে নিজে ছাড়া আর কেউই তাকে সাহায্য করতে পারবে না। তখনই লছমি নামে এক মাছওয়ালীর সাথে তার সখ্যতা হয় আর মেয়েটি তার মাঝে বেঁচে থাকার অন্য এক দর্শনের জন্ম দেয়। আর তার উদ্যোগেই ইন্দুবালার হাতে ছেনু মিত্তির লেনে ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেলটির’ জন্ম হয়।যেটিতে সারাক্ষণ ভিড় লেগে থাকে, জানালার কাছে সারি সারি বয়ামে কতবেল, পাকা তেঁতুল, জলাপাইসহ আরও বহুবিধ অপূর্ব স্বাদ-গন্ধের সব আচার আর বাংলাদেশের বিধবা ইন্দুবালার আশ্চর্য রান্নার হাত— এসবই খাদ্যরসিকদের টেনে আনে। আসেন কালেক্টর অফিসের বড়বাবু, যার অবদানে নামহীন হোটেলটি নাম পায়, ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’ আর পৌরসভার লাইসেন্স। যে গল্পে নিজ থেকেই এসে জুড়ে যায় ধনঞ্জয়, যে ইন্দুবালার কাজ সামলাতে সাহায্য করে।

উপন্যাসটির এক বাঁকে দেখা যায় তার ছেলেমেয়ে বিয়ে করে নিজেদের মতো চলে গেছে যে যার মতো, তবু ভাতের হোটেলটি নিয়ে একা পড়ে আছে ইন্দুবালা। অচরিতার্থ সুখ, সংসার এবং স্বার্থান্ধ মানুষদের ভিড়ে আজ সে সঠিকভাবে মনে করতে পারে না কবে এসেছিল সে এদেশে, কখনইবা সে খুলেছিল এই ভাতের হোটেল।

সময়ের বহমান ঢেউয়ের মাঝেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও হয়ে যায়, তারও আঁচ পড়ে ভাতের হোটেলটিতে আর ইন্দুবালার জীবনে। যুদ্ধে সে মা-ভাইকে হারিয়েছে, পাক সেনারা পুড়িয়ে দিয়েছে ঘরবাড়ি। বাংলাদেশে তার আর কিছুই নেই। মনে ভিড় করে কত স্মৃতি আর পূর্বপুরুষের ভিটের টান, এসব তাকে প্রাজ্ঞতা আর বিস্মৃতির দিকেও নিয়ে যায়।

উপন্যাসটির এক বাঁকে দেখা যায় তার ছেলেমেয়ে বিয়ে করে নিজেদের মতো চলে গেছে যে যার মতো, তবু ভাতের হোটেলটি নিয়ে একা পড়ে আছে ইন্দুবালা। অচরিতার্থ সুখ, সংসার এবং স্বার্থান্ধ মানুষদের ভিড়ে আজ সে সঠিকভাবে মনে করতে পারে না কবে এসেছিল সে এদেশে, কখনইবা সে খুলেছিল এই ভাতের হোটেল।

এই হোটেলটিকে ঘিরেই পাঠকরা এক সংগ্রামী নারীর মাঝে দুইটি দেশকে দেখতে পান। সব হারানো যে নারী অসাধারণ সাহস আর স্থিরতার মাঝে অস্তিত্বের শূন্যতাকে উদযাপন করে। তার মাঝে যেমন জেগে থাকে ফেলে আসা খুলনার কলাপোতা গ্রাম সেইসাথে সে নগর কলকাতাকেও  গ্রহণ করে নিজের মতো করে। উপন্যাসটির অসাধারণ ভাষাসৌকর্য পাঠকদের টেনে নিয়ে যায় দেশকাল আর এক নারীর জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে। প্রাঞ্জল এবং সহজ বর্ণনায় আর মায়াময় সব চরিত্র নির্মাণে কল্লোল লাহিড়ী অসাধারণ এক গল্পে পাঠকদের নিবিষ্ট করে রাখেন এই উপন্যাসে।

‘গোরা নকশাল’ এবং ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’ উপন্যাস দু’টির জন্য লেখক ভূমধ্যসাগর পত্রিকার কতৃক ‘শ্রীমতী সাধনা সেন সম্মান’-এ ভূষিত হয়েছেন। এই বইটি নিয়ে একই নামে একটি ওয়েব সিরিজও নির্মিত হয়েছে।

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল
লেখক : কল্লোল লাহিড়ী
প্রকাশক : বাতিঘর
প্রকাশকাল : ২০২২
মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা।

বইটি কিনতে হলে :

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল – বাহিরানা

 

(Visited 11 times, 1 visits today)

Leave a Comment