বাহিরানা

উইচার: সিজন ৩


অবশেষে নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ উইচার-এর তৃতীয় সিজন চলে এসেছে। আন্দ্রেজ স্যাপকওস্কি’র উইচার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিরিজ ইতোমধ্যেই সাফল্যের সাক্ষর রেখেছে। এবারের সিজন নিয়ে সমালোচক এবং ভক্তদর্শকদের মাঝে অনেকদিন ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বিতর্কের মূল কারণ শো-এর মূল আকর্ষণ হেনরি ক্যাভিল এই সিজনেই তার গ্যারাল্ট অব রিভিয়ার সমাপ্তি টেনেছেন, পরের সিজন থেকে আর তাকে দেখা যাবে না। তার বদলে তখন থাকবেন লিয়াম হ্যামসওর্থ। তিনি দ্যা হাঙ্গার গেইম’স চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি পেয়েছিলেন। তবে দর্শকরা হেনরি ক্যাভিলের বিদায়কে সহজভাবে নিতে পারছেন না, এর কারণও আছে, কেননা উইচার সিরিজের সাফল্যের পেছনে তার অবদান অনেকখানি। ক্যাবিল না থাকলে সিরিজটি এতদূর আসতে পারত কীনা সন্দেহ। আরেকটি বিষয়ও খুবই গুরুতর, আমরা দেখতে পেয়ছি উইচার ক্রমশই তার মূল কাহিনি থেকে সরে যাচ্ছে, সিরিজ থেকে ক্যাভিলের অব্যাহতি নেওয়ারও এটাই মূল কারণ। পরে এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন তিনি।

এবারের সিজনটিকে ভালো এবং মন্দের মিশ্রণ বলা যায়। নেটফ্লিক্সে দুই পর্বে মুক্তি পাওয়া এর প্রথম অংশ পাঁচ পর্বে বিভক্ত আর দ্বিতীয় অংশে আছে তিনটি পর্ব। প্রথম অংশ আর দ্বিতীয় অংশ মুক্তি পেয়েছে যথাক্রমে ২৯ জুন আর ২৭ জুলাইয়ে। তবে গুণ আর চরিত্র বিচারে এই দুই অংশের ব্যবধান যেন আকাশ আর পাতালের। এই সিজনে উইচার সাগার দ্বিতীয় উপন্যাসকে অবলম্বন করা হয়েছে। প্রথম অংশে সিরি (ফ্রেয়া অ্যালান), ইয়েনিফার ( এ্যানা চালোত্রা) আর গ্যারাল্ট (হ্যানরি ক্যাভিল) যৌথভাবে নিজেদের রক্ষা করতে চেষ্টা করে। প্রাচীনরক্তের সিরিকে রাজাদের, এলভস আর জাদুকরদের হাত থেকে বাঁচাতে ইয়েনিফার আর গ্যারাল্ট, সাক্ষাত্ মৃত্যুর সাথে অসম লড়াইয়ে নামে যেন। যারা সবগুলো সিজন দেখেছেন তারা জানেন সিরি মানুষ আর এলভসদের যৌথবংশধর, তার শরীরে দুই গোত্রেরই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। তাই তার শক্তি অপরিসীম, কিন্তু সমস্যা হলো সেই শক্তির উপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই, আর সেই নিয়ন্ত্রণ তার হাতে এনে দিতে ইয়েনিফার আর গ্যারাল্ট নিজেদের জীবন উত্সর্গ করেছে। কেননা সে-ই একমাত্র শতশত বছর ধরে রাজা এলভস আর জাদুকরদের মাঝে চলা দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে পারে। তাই তাকে রক্ষা করতে ইয়েনিফার আর গ্যারাল্ট এক গুপ্তঘাতকপূর্ণ দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে থানেড কৌপ-এ যোগ দেয় সিরিকে নিয়ে। আর পুরো সময়েই তাদের সাথে থাকে সেই শিল্পী কবি জাসকিয়ার (জোয়ি বাটে)।

জাদুকরদের একাডেমি আরিথোজা থানেড দ্বিপে অবস্থিত, সেখানে তাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত কনক্লেভস অনুষ্টিত হচ্ছে। তাই উইচারের সব পক্ষই এই কনক্লেভস নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা সাজায়। কিন্তু এই আনন্দঘন কনক্লেভসই হঠাত করে দু:স্বপ্নে রূপান্তরিত হয়, জাদুকর এলভস আর নিলফগার্ডের সৈন্যরা, ত্রিমুখী সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যায় তারা পরস্পর। সবই ঘটে সিরিকে দখল করার জন্য। তাই গ্যারাল্ট, ইয়েনিফার আর সিরি এক অসম লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে যায়। যা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব বলে মনে হয়। বহু জাদুরক আর এলভস প্রাণ হারায়, তবে, অবশেষে বেরিয়ে আসে কে এই চক্রান্তের মূল হোতা।

প্রথম অংশের পাঁচটি পর্ব একদম টানটান উত্তেজনায় পূর্ণ, কাহিনিবিন্যাসও পারম্পর্য ধরে এগোয়। এই অংশের শেষ দুই পর্ব যেন সাহিত্যিক মান স্পর্শ করেছে, এখানে গ্যারাল্ট আর ভিলগাফোর্টজ (মহেশ জাদু)-এর মুখোমুখি এপিক যুদ্ধ ছাড়াও বহু বিস্ময়কর ঘটনা ঘটতে দেখি আমরা। বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা বিদ্যুত্চমকের মতো আছড়ে পড়ে আরিথোজায়। বিশেষ করে জাদুকরদের মা টিসায়ার (মাইএ্যান্না বোরিং) হৃদয়বিদারক পরিণতি, তার প্রতি হওয়া প্রতারণার অভিঘাত যেন উইচার-৩ এর মূল উদ্দেশ্যকেই ফুটিয়ে তোলেছে। তা হলো কেউ যত ক্ষমতাধর আর সত্-ই হোক না কেন সে অন্যের উপরে উঠার সিড়ি হতে পারে নিজের অজান্তেই, টিসায়ার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এবারও মাইএ্যান্না বরাবরের মতোই অসাধারণ হৃদয়স্পর্শী অভিনয় করেছেন।

তবে দ্বিতীয় অংশ, যেটি জুলাইতে প্রকাশিত হয়েছে তিন পর্বে, সেটি একদমই হতাশাজন্ক। এই তিনটি পর্বই মূলকাহিনিবিন্যাস থেকে সরে গেছে অনেকখানি। প্রথম পাঁচপর্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি, আর ক্লান্তিকর দীর্ঘসূত্রিতার অবতারণা করেছে বারেবারেই। বিশেষ করে সিরি’র মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়ার অংশটি, সেটি মূল কাহিনীতে নেই। এরকম আরো বহু বিষয় আছে। যার ফলে চরিত্রগুলো যেন পরস্পরের সাথে খাপ খাচ্ছে না এরকম মনে হয়। তবে আরেকটি বিষয় আছে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, তা হলো উইচার সিজন-৩ শেষ করে মনে হয় এটি অসম্পূর্ণ, এর যা করার ছিল তা যেন করতে পারেনি, মনে হয় শেষ হয়েও যেন শেষ হয়নি। কোনো কিছুরই যেন সমাধান হয়নি, সবই খাপছাড়া। এই বিষয়টি যে কোনো সিরিজের জন্যেই হতাশাজনক।

বরাবরের মতোই এই সিজনেও উইচার আমাদের অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি, অসাধারণ স্টান্ট আর মুখোমুখি যুদ্ধের নতুন নতুন দৃশ্য আর ঘটনার সম্মুখিন করেছে। একইসাথে মানবীয় অনুভূতিরও মুখোমুখি করেছে, যেমন গ্যারাল্ট অব রিভিয়া এবার আবেগশূন্যতা জলাঞ্জলী দিয়ে এক মানবিক অনুভূতিপ্রবণ মানুষ হয়ে ওঠেছে। যে কাঁদতে পারে, যে হার মেনে নিয়েও আবার নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে পারে। সর্বোপরি ভালোবাসতে পারে।

আরেকটি ইঙ্গিতপূর্ণ মোড় হলো, গ্যারাল্ট যে প্রথম থেকেই বলে আসছিল সে রাজনৈতিক ঘটনাতে জড়াবে না, নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবে। এই সিজনে সেই প্রতিজ্ঞা থেকে সে সরে এসেছে। তাই চতুর্থ সিজনে বাস্তবিকই অন্য এক গ্যারাল্ট লিয়াম হ্যামসওর্থের মুখোমুখি তো আমরা হবোই তবে তার চরিত্রও বদলে যাবে পুরোপুরি। আশা থাকবে সিজন-৩ এর দূর্বলতাগুলো চতু্র্থ সিজনে কাটিয়ে উঠবে তারা। তবে সেটি অনেকখানিই অজানা। ভবিষ্যতই ভালো বলতে পারবে। আর লিয়াম কিভাবে ক্যাভিলের বর্তমান পরিস্থিতিতে উপস্থাপিত হবেন সেটি এখনও উইচার প্রোডাকশন হাউজ থেকে জানানো হয়নি।  তাই ভালোমন্দ মিলিয়ে এবারের উইচার দেখে ফেলাটাই হবে সবচে প্রয়োজনীয় কাজ। অন্তত এটা তো এখন নিশ্চিত যে ক্যাভিলকে আমরা আর কখনওই গ্যারাল্ট অব রিভিয়া হিসেবে দেখতে পাব না। তাকে ছাড়া সিরিজটি আর টিকে থাকতে পারবে কীনা বা কেমন হবে আপাতত সেটিও অনিশ্চিত।

উইচার: সিজন ৩

পরিচালক: লরেন স্মিট রিচ

প্রকাশকাল: ২০২৩

(Visited 12 times, 1 visits today)

Leave a Comment