লেখ্য ভাষার সূচনার আগে থেকেই মানুষ পরস্পরকে বিভিন্ন গল্প বলে আসছে। এই গল্পগুলোতে যেমন আছে সহজ জীবনের বিভিন্ন নির্দেশনা, তেমনি আছে সাহিত্যরস। প্রায়ই গল্পগুলো সমাজের কিছু মানুষের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, যেগুলো অন্যদেরও কাজে লাগে, এর ফলে ধীরে ধীরে সেসব ছড়িয়ে পড়েছে লোকমুখে। এভাবে বর্তমানকাল পর্যন্ত যে গল্পগুলো টিকে আছে, ধরে নিতে হবে সেগুলো মানুষের কঠিন জীবনবাস্তবতাকে কিছুটা হলেও সহজ করেছিল, করছে, তাই তারা সেগুলোকে বংশপরম্পরায় মুখে মুখে সংরক্ষণ করে আসছে। আবার বিভিন্ন পুরাণ, বৌদ্ধমত থেকে উদ্ভুত গল্প, বাংলার সহজিয়া, নাথপন্থীদের গাঁথা, শ্রীকৃষ্ণকথামৃত, জেনগল্প, সুফী বা বাংলার মরমী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত অমূল্য সব কাহিনী বা ঘটনা— এ সবই মানুষের সমাজে হীরকখণ্ডের সমান মূল্যবান হয়ে টিকে আছে।
আবার ‘তারামাছ’, ‘সরহপা’, ‘শকটারোহী রৈক্ক’, ‘সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী’সহ অংসখ্য গল্পের যে বৈপরীত্য এবং জীবনের গভীর অর্থ অনুসন্ধান—সেগুলো পাঠকদের চিন্তাকে আরো স্বচ্ছ আর বাধাহীন করবে বলা যায়। বইটির ২১০টি গল্পই, মানুষ, প্রকৃতি, পশুপাখি, রূপকথার চরিত্র, ধর্ম-দর্শনের পরস্পরের গভীর তদন্ত নিয়েই গ্রথিত যেন, যেখানে তারা নতুন কিছুর সন্ধান করছে।
রায়হান রাইন এই গল্পগুলোকেই কথাপুষ্প: প্রজ্ঞাবানদের বলা গল্প নামক বইয়ে সংকলিত করেছেন। গল্পগুলোর অনুবাদ প্রাঞ্জল, ছোট ছোট আখ্যানগুলোতে প্রতীকী ভাষার চারিত্রও পুরোপুরি অক্ষুণ্ন রেখেছেন তিনি, যা কিনা খুবই দু:সাধ্য এক কাজ। যারা বৌদ্ধ জেন গল্পের সাথে পরিচিত তারা জানেন, জেন গল্প তীর্যক ভাষায় বলা, বস্তুর ধারাক্রম উল্টো হয়ে থাকে সেখানে। জেনগুরুদের অভিজ্ঞতাকেই যেন রায়হান রাইন বহুশতবর্ষ দূরের বদলে যাওয়া মানব সমাজে পুনরায় জাগিয়ে তুলেছেন, বইটি পড়তে পড়তে এমন মনে হয়। আবার সুফিদের গুহ্যকথা, উপনিষদের খণ্ড খণ্ড আখ্যান, পুরাণ, নীতিকথা— একটিমাত্র বইয়ে সব একাকার হয়ে গেছে।
বইটিতে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়, বৈশ্বিকতা বলে যে ধারণা সাহিত্যজগতে প্রচলিত আছে সেটিরও খানিকটা গঠনকাঠামো মিলতে পারে এই বইয়ে। বাংলা ভাষার একজন পাঠক যখন বইয়ের ‘কফি ও অন্যান্য’ শিরোনামে গল্পটি পড়েন তখন তিনি কফি নামক একটি ভীনদেশি পানীয়বীজের সাথে পরিচিত হন, যেটি কীনা তাদের নানি-দাদীরা খেতেন না। কিন্তু গল্পের দাদীমা এই কফিবীজের সাহায্যে তার যে দর্শনটি ব্যক্ত করেন সেটি পাঠকরা সহজেই গ্রহণ করতে পারেন, উপলব্ধিও করতে পারেন।
আবার ‘তারামাছ’, ‘সরহপা’, ‘শকটারোহী রৈক্ক’, ‘সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী’সহ অংসখ্য গল্পের যে বৈপরীত্য এবং জীবনের গভীর অর্থ অনুসন্ধান—সেগুলো পাঠকদের চিন্তাকে আরো স্বচ্ছ আর বাধাহীন করবে বলা যায়। বইটির ২১০টি গল্পই, মানুষ, প্রকৃতি, পশুপাখি, রূপকথার চরিত্র, ধর্ম-দর্শনের পরস্পরের গভীর তদন্ত নিয়েই গ্রথিত যেন, যেখানে তারা নতুন কিছুর সন্ধান করছে। যেভাবে চিরায়ত সাহিত্য নতুন হয়ে পরিবর্তীত সময়ের নবীনদের কর্মপ্রয়াসের সাথে সমানভাবে পাল্লা দেয়, সেরকম।
যদিও প্রজ্ঞাবানদের বলা গল্পে সবধরণের দার্শনিক ঘরানাকেই তিনি স্থান দিয়েছেন, তবু একটা জায়গায় সব গল্পই এক— তারা মানুষের কথা বলে, প্রকৃতির কথা, পশুপাখিদের কথা বলে। যেমন, গুরুর কাছে যখন শিষ্য নির্বাণের পথ জানতে চায় তখন গুরু তাকে ধান পেষার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে বলেন। আর, এতেই একদিন তার নির্বাণপ্রাপ্তি হয়। যেকোনো কর্মেই রয়েছে বিশ্বাস আর ক্রিয়ার যৌথতা, যা কিনা মানবসভ্যতাকেই এতদূর নিয়ে এসেছে। বইটিতে কবিতার মতো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠেছে প্রাজ্ঞজনদের অভিজ্ঞতা। বাংলাভাষায় রায়হান রাইন হাজার বছরের সঞ্চিত ইতিহাসের মাঝে জমা বৈশ্বিক জ্ঞানের সংযোজন করেছেন, সে কথা জোর দিয়ে বলা যায়।
কথাপুষ্প: প্রজ্ঞাবানদের বলা গল্প
রায়হান রাইন
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশসাল: ২০২২
দাম: ৪০০ টাকা।
বইটি কিনতে হলে :
কথাপুষ্প : প্রজ্ঞাবানদের বলা গল্প – বাহিরানা