প্রথম বই একজন কবির সূচনাচিহ্ন ধরে রাখে বলে কবির নতুনত্ব চেনাতে এর ভূমিকা প্রবল। এর মাঝে কোনো কোনো কবি প্রথম প্রকাশেই নিজের স্বাতন্ত্র চিনিয়ে দেন, তেমনই একজন কবি মাহবুব কবির। বাংলা কবিতার ইতিহাসে তাঁর নাম ইতোমধ্যেই তিনি সম্মানিত এক আসন অধিকার করে নিয়েছে। বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশক ছিল বিভিন্নমুখী ধারায় কবিতা লেখার সময়। কবিতার ভাষা নিয়ে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছেন অনেক কবি, এর মাঝে অনেকে করেছেন বাংলার মূলে ফেরার জন্য আত্মসমীক্ষা। মাহবুব কবির সেই সময়েরই জাতক আর এতোদিনে এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে তিনি বাংলাদেশ থেকেই বিশ্বকে ধরতে চান। তীক্ষ্ণ এবং গভীর ভাবনার দর্শনঋদ্ধ কবিতায় তিনি ইতিহাস, ধর্ম, মিথ আর পুরাণের সাথে বোঝাপড়ার ফলে সমৃদ্ধ করছেন বাংলা কবিতাকে তার সূচনাপর্ব থেকেই।
বইটি যে এখনও পূর্বের মতোই আগ্রহ জাগাতে পারছে তার কারণ এর নতুনত্ব। এবং এর ভাষা যে বর্তমানের সাথে সমানতালে নবায়িত হচ্ছে, হবেও তার প্রমাণ পাওয়া যায় কবিতাগুলো পড়তে পড়তেই
তাঁর প্রথম কবিতার বই “কৈ ও মেঘের কবিতা” প্রকাশিত হয়েছিল সেই ১৯৯৬ সালে, বইটির বিস্ময় জাগানিয়া কবিতাগুলো একইসাথে নতুন এবং ভিন্নস্বরে ঋদ্ধ। এর কোনো কপি এখন বাজারে নেই, থাকার কথাও নয়। কিন্তু পাঠকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা আছে বইটি নিয়ে, বিশেষ করে যারা নতুন পাঠক তাদের কাছে। প্রকাশের এত বছর পরেও কোনো বই পাঠকদের আকর্ষণ করে চলেছে এটা সত্যিই আনন্দদায়ক ঘটনা।
বৈতরণী সুন্দর এক উদ্যোগ নিয়েছে, “কৈ ও মেঘের কবিতা” প্রথম প্রকাশের বাইশ বছর পর আবার নতুন করে তারা একে প্রকাশ করলো ২০২২ এর বইমেলায়। এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল “ভাষাচিত্র” প্রকাশনী থেকে ২০০৮ সালে। সেটিও এখন বাজারে নেই। বৈতরণীর ক্রাউন সাইজের বইটিতে পূর্বের সব কবিতাই বজায় রাখা হয়েছে। বর্তমান সংস্করণের জন্য সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন আনিসুজ্জামান সোহেল।
বইটি যে এখনও পূর্বের মতোই আগ্রহ জাগাতে পারছে তার কারণ এর নতুনত্ব। এবং এর ভাষা যে বর্তমানের সাথে সমানতালে নবায়িত হচ্ছে, হবেও তার প্রমাণ পাওয়া যায় কবিতাগুলো পড়তে পড়তেই, যেমন:
“দিগন্তে গিয়ে দেখলাম
দিগন্ত নেই,
পড়ে আছে দুটি জমজ ছায়া”
(দিগন্ত, কৈ ও মেঘের কবিতা)
“এই পাখি বর্তাবহ
শীতের,
আর শীত পৃথিবীর ছোট বোন।”
(দূত, ঐ)
“রক্তে ভেজা চোখ মুছতেই দেখি—প্রচ্ছদ ফুটে আছে আকাশজুড়ে।
আর বাতাসে ভেসে আসে দূরাগত বৃষ্টির গান।”
(চুল, ঐ)
“পিতলের কলস ভরে গেছে,
কোথায় যেন পালিয়ে যাচ্ছিল ওরা পুকুরের
পাড়-পাহাড় বেয়ে বেয়ে।
বলেছে দাদু—
এরকমই হয়
বর্ষায় মেঘ ডেকে উঠলে।
ও খুকুমণি মেঘ, তুমি ঋতুমতী হয়ে ওঠো দ্রুত।”
(কৈ ও মেঘের কবিতা, ঐ)
প্রকাশের বছর পেরিয়ে যুগ অতিক্রম করে “কৈ ও মেঘের কবিতা”র ‘‘আজ ঈদ। আজ ছুড়ি দিবস” (হত্যামুখর দিন), এর মতো অনেক কবিতা বর্তমানে মিথের পর্যায়ে চলে গেছে। বইটির বৈতরণী সংস্করণ পাঠকদের না পাওয়ার অতৃপ্তি যে ঘুচাবে এটাই আনন্দ সংবাদ।
কৈ ও মেঘের কবিতা
লেখক : মাহবুব কবির
প্রচ্ছদ : আনিসুজ্জামান সোহেল
প্রকাশক : বৈতরণী
মুদ্রিত মূল্য: ৩০০টাকা।
বইটি কিনতে হলে :