বাহিরানা

কোরিয়ার কবিতা— ছন্দা মাহবুব— শব্দের সমজাতীয়তাকে অতিক্রম করে


কবিতা থেকে তার ভাষা বদল করে ফেললে সেটা আর কবিতা থাকে না। অনুবাদে ঠিক এই কাজটাই করা হয়, কবির মূল ভাষাকে বদলে অন্য একটি ভাষায় কবিতাটিকে স্থানান্তর করা হয়। তাই অনুবাদে কবিতা হারিয়ে যায়। কিন্তু ফ্রয়েড থেকে উৎসারিত যে মন:সমীক্ষণজাত সাহিত্যতত্ত্ব আমরা পাই সেখানে স্বয়ং লেখকের সাথে সমালোচকের যোগাযোগ ঘটে, শুধু লেখার সাথে নয়। বাকিসব সাহিত্যসমালোচনা তত্ত্বের সাথে এই জায়গায় এর ফারাক। কথাটা বলার উদ্দেশ্য হলো, অনুবাদে যদি কবিতা হারিয়ে যায় তাহলে এত এত অনুবাদ আমরা পড়ি কেন, কারণ এর মধ্যে কিছু অনুবাদ পুন:সৃষ্টি হয়, অনুবাদক লেখকের মনোজগতে নিজেকে স্থাপন করেন, লেখকের সংস্কৃতি থেকে উত্সারিত ভাষা তখন অনুবাদকের সংস্কৃতি থেকে জন্ম নেওয়া ভাষায় প্রবিষ্ট হয়। এভাবে মূল কবিতা আরেকটি ভাষায় হয়ে ওঠে। উজান থেকে এ বছরে প্রকাশিত অনুবাদ কবিতার বই ‘কোরিয়ার কবিতা’র অনুবাদক ছন্দা মাহবুবের মাঝে উপরিউক্ত গুণটি আমরা দেখতে পাই। তিনি বইটিতে কোরিয়াকে বাংলা ভাষায় জীবিত করেছেন বলা যায়।

কো-উনের দেশের কবিতার এক সম্মৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে, তাদের নিজস্ব ইতিহাস, কৃষ্টি এবং সর্বোপরি তাদের জীবনদৃষ্টি তাদের কবিতায় প্রভাববিস্তার করে। যেখানে বাংলাদেশীরা নিজেদের দেশকে ‘মাতৃভূমি’ মানেন সেখানে কো-উন তার দেশকে মানেন ‘পিতৃভূমি’ বলে। কোরিয়ার কবিতা তাই আলাদা, তাই কি হবার নয়? কবিতা মাত্রই আলাদা।

তাঁর অনুবাদকৃত কয়েকটি কবিতার পঙক্তি দেখা যেতে পারে:

“দীর্ঘ সারা রাত জুড়ে আমাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরেছে,
আমাদের পিতৃভূমি
নক্ষত্র আর আমাদের প্রত্যেকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক আনন্দধারা।
নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে চলো যৌবনোচ্ছল থাকি!
আমাদের পিতৃভূমি জ্বলন্ত নক্ষত্র
কখনই নিন্দিত হতে পারে না,”

(দেশের নক্ষত্র, কো-উন, কোরিয়ার কবিতা)

“যেভাবে এই শহরে একটা বেড়ালকে বাঁচতে হয়-
অপেক্ষার মাধ্যমে
এমনকি যখন দেয়ালের উপর শুধুমাত্র একটা ফুল;
তোমাকে শুধু স্থির হয়ে বসে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হবে”

(শহরের বেড়াল, ইয়ন চায়েচল, ঐ)

“সূর্য ডুবে যাচ্ছে,
যে পাখিরা গান গাইছিল, থেমে গেছে।
বাতাস বইছে খাড়া উপরের দিকে,
নক্ষত্ররা আমার পায়ের নিচে।
অতীতের সব রাস্তা পার হয়ে একটা সীমায় পৌঁছাতে হবে
সেই নিয়মই শাসন করছে চলার পথ, যখন তুমি কোন পথ ধরে চলছ।
আহ, আমি এখন আমার সীমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।”

(সীমা, পাক মু-সান, ঐ)

“শীতের অরণ্যের দিকে তাকিয়ে, পোষাক খোলা নগ্ন গাছের দিকে তাকিয়ে,
আমি আরও এক স্তর পাপের পোষাক গায়ে চাপিয়ে নিই।
কারণ মানুষ আমি।
শীতের মাঠে বাহিরে দাঁড়িয়ে
আরও এক স্তর পাপ বিনিয়োগ করি,
আমি বসে আছি এক ঝাঁক ঝিল্লির মধ্যে
সারাদিন তারা ঢেউ তুলছে, বলছে পাপ, পাপ, পাপ।”

(ও-কিয়ু-ওয়ান, ঐ)

কবিতাগুলোয় জীবনকে জানার দার্শনিক অবস্থান আছে, যা আছে তার মধ্য দিয়ে যা নেই বা হতে পারে তাকে জানার একটা প্রক্রিয়া কবিদের মধ্যে পাওয়া যায়। কবিতার এই দার্শনিকতাকে অনুবাদ করা দুরূহ কাজ, অনুবাদক সেই কাজটাও ভালোভাবে করেছেন। একটা কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের ‘অবশ্যম্ভাবীতা’ আছে, কবিতায় যা ব্যবহৃত হয় তা অমোঘ। ভিন্ন ভাষায় সেই অমোঘতার রূপান্তর সহজসাধ্য নয়, ছন্দা মাহবুব সেই কাজটি খুব সুন্দরভাবে করেছেন।

কোনো কিছুকে জানার জন্য একটা ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সাহিত্যের ক্ষেত্রেও সেটা সত্য, নাহলে নতুন কবিতাকে আমরা কীভাবে চিনব? প্রতিটি কবিতাই তার আগের যুগ থেকে ভিন্ন। তাই একটি দেশের কবিতার একটা সামগ্রিক ধারণা তৈরির জন্য গুরুত্ব এবং সময় বিচারে কবিদের একটা ধারাক্রম থাকলে ভালো হয়। এতে গতিশীলতার সাথে পূর্ণতার একটা অনুভূতি তৈরি হয়। এই বইটিতে আমরা দেখতে পাই অনুবাদক সেদিকে দৃষ্টি দিয়েছেন ভালোভাবেই, কোরিয়ার কবিতার আধুনিকতার একটা ধারণা দিয়েছেন তিনি আমাদের। কো-উন-এর আগের সময়ের কবি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের কবিদের উপস্থিতি নিশ্চত করার মাধ্যমে।

কো-উনের দেশের কবিতার এক সম্মৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে, তাদের নিজস্ব ইতিহাস, কৃষ্টি এবং সর্বোপরি তাদের জীবনদৃষ্টি তাদের কবিতায় প্রভাববিস্তার করে। যেখানে বাংলাদেশীরা নিজেদের দেশকে ‘মাতৃভূমি’ মানেন সেখানে কো-উন তার দেশকে মানেন ‘পিতৃভূমি’ বলে। কোরিয়ার কবিতা তাই আলাদা, তাই কি হবার নয়? কবিতা মাত্রই আলাদা। ছন্দা মাহমুদ সেই অন্যরকম কবিতাকে বাংলা ভাষায় নতুন করে জীবন দিয়েছেন। বইটিতে থাকা কিম নাম-জু-এর একটি কবিতাংশ দিয়ে আলোচনা শেষ করা যাক, যে সোনার কুঠারের কথা পাঠকরাও জানতে উদগ্রীব, কবি সেটার খবর কীভাবে জেনেছিলেন? সেটি কবিতাই জানে তার রহস্যের অবতলে।

“আমাকে সম্বোধন করল ‘ওহে ডাকাত কবি,’
এবং এভাবেও ‘আরে কবি ডাকাত’,
হাসছিল উল্লসিতভাবে তাদের নিজেদের কাণ্ডে।
আমি তাদের যা খুশি করতে দিয়েছিলাম।
এরপর এমন এক রাত এলো, গম্ভীর হয়ে গেলো তারা খুব,
আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করল, আর বেঁধে ফেলল মাংস কাটার তক্তার সাথে,
আমার চামড়া খুলে ফেলল, চামুচে তুলে ফেলল মাংস,
আমার হাড় টেনে বের করল, জিজ্ঞেস করল:

তুমি কীভাবে জানতে ওই বাড়িতে সোনার কুঠার আছে?”

(কবি মহাশয়ের কথা, কিম নাম-জু, ঐ)

কোরিয়ার কবিতা
অনুবাদ: ছন্দা মাহবুব
প্রকাশক: উজান প্রকাশন
প্রকাশকাল: ২০২৩
দাম: ৪৫০ টাকা

বইটি কিনতে হলে:

কোরিয়ার কবিতা – বাহিরানা (bahirana.com)

 

(Visited 35 times, 1 visits today)

Leave a Comment