বাহিরানা

ছুরত— গোলাম রাব্বানী— অজস্র মুখোশের আড়ালে স্বরূপের সন্ধানাকাঙ্ক্ষা


তরুণ ও মেধাবী চলচ্চিত্র নির্মাতা গোলাম রাব্বানী নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ছুরত’। সম্প্রতি কয়েকটি উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। ১৫ জনু শিল্পকলা একাডেমির বিশেষ চিত্রশালায়ও প্রদর্শিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। আমরা যেহেতু সকল রকম শিল্পকর্মের রসাস্বাদনে আকাঙ্ক্ষী, তাই এক সুযোগে ‘ছুরত’ দর্শন সম্ভব হল। নইলে মানুষের চেহারায় তো তাকানোই যায় শুধু, ছুরতে নজর করা কি সহজ কথা!

একটি সওদাগরি আপিস— যেটাকে আধুনিক ধরতাই অনুযায়ী বলা হয় ‘কর্পোরেট হাউজ’, তেমনই একটি হাউজের মাঝারি পর্যায়ের পেশাজীবী হচ্ছেন আমাদের আলোচ্য চলচ্চিত্রটির মাঝখানে থাকা পুরুষ চরিত্র । তারই পুরো একদিনের কর্মকাণ্ড আরও খোলাশা করে বললে ঘুম থেকে জেগে ঘরের বার হওয়া, আবার রাতে ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত ‘ছুরত’-এর কাহিনি। অবশ্য কাহিনি বলে যদি একে সংজ্ঞায়িত করা যায় আর কি।

এই নগর আর তাবৎ সভ্যতার অনুভূতিহীন শিবের বুকে টিকে থাকার আর টিকিয়ে রাখার দৌড়ে দাঁত-মুখ খিঁচানো কালী-নৃত্যের পাকেচক্রে পড়ে আমরা সকলেই মুখোশধারী। স্থান-কাল-পাত্রভেদে শুধু বদলায় মুখোশ। কে তবে টিকে থাকতে চায়? আর কাকেই বা টিকিয়ে রাখতে চায় সে? সে যেমন ব্যক্তি নিজে টিকে থাকতে চায়, আর টিকিয়ে রাখতে চায় চলমান ব্যবস্থাকে আর সাথে সাথে ক্ষমতাকাঠামোকেও।

তো সেই কেন্দ্রীয় চরিত্রটির পুরো দিনের অভিজ্ঞতাগুলো কেমন? ছবির শুরুতেই দেখা যায়, ভোরের আজানের ধ্বনির পর ধীরে ধীরে আলো ফুটে উঠছে। জেগে উঠছে মহানগরী। পোল্ট্রির খাঁচায় বদ্ধ মোরগ-মুরগি ডাকে না সেই ঘুম জাগানিয়া চির পরিচিত ডাক। একই ছাদের তলায় দুই সংসারসঙ্গী , ঘরের দুই প্রান্তে বসে প্রাতরাশে ব্যস্ত, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতোই যাদের অবস্থান। ঘরের দেয়ালে ঝুলন্ত চিত্রমালা, ভীষণ প্রতীকাশ্রয়ী। তারপর দৈনন্দিনতার নিত্যসঙ্গী থলেটা কাঁধে ঝুলিয়ে রাস্তায় নেমে পড়া। বাইরের জগতটা কীভাবে ধরা দেয় তার কাছে? সে এক পরাকুহকী দৃষ্টিতে দেখা মারফতি চিত্রায়ন অথবা মারফতি দৃষ্টিতে দেখা পরাকুহকী চিত্রায়ন। রাস্তার আর চারপাশের প্রতিটি মানুষ মুখোশধারী। সে নিজেও। মুখোশের আড়াল থেকে একজন আরেকজনের পানে তাকিয়ে কৌতুক নাকি বিপন্নতা অনুভব করে, আবার পাশ কাটিয়ে চলেও যায়। বাসের ভেতরে বসা প্রতিটি যাত্রী মুখোশধারী, শুধুমাত্র শিশুরা বাদে। কারণ শিশুরা তো মুখোশধারণবিদ্যা এখনও শেখেনি।

নেদারল্যান্ডসে অন্য গুরত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের সাথে ‘ছুরত’ এর প্রদর্শনীর পোস্টার

আপিসের বড়কর্তা ব্যাঘ্রমুখোশধারী, টেবিলের ওপাশে বসা শৃগালমুখোশ, তার সমুদয় ধূর্তামিসহ আর সে নিজে— সেই প্রধান চরিত্র বড়কর্তার সমুখে ইঁদুর কিংবা বিড়ালের ভাঁড়মুখোশ নিয়ে মিঁউমিঁউ।

ছবির অন্যতম নারী চরিত্র মধ্য-অর্থনৈতিক আর রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এক আপিসে কর্মরত। আনমনে বসে থাকার ক্ষণে মুখোশহীন কিন্তু সেবা গ্রহীতাদের সামনে মুহূর্তেই মুখোশ পরিহিতা।

পড়ন্ত বিকেলে নগরবেষ্টিত কোনও এক ঝিলের কিনারে দুই নর-নারী চরিত্র প্রেমালাপে মগ্ন। তখনও উভয়ে মুখোশধারী। কিন্তু তাদের কল্পনায় মানস সরোবরের শ্বেত হংসমিথুন। মুখোশ খসে যায় রিরংসা চরিতার্থের অন্ধকার সমাচ্ছন্ন সময়ে, সরোবরে ডুবে যাওয়ার কালে, যখন উভয়েই কর্দমাক্ত দেহ।

তারপর? তারপর ‘ক্লান্ত প্রাণ এক’ চতুষ্পদ জন্তুর চরণে হেঁটে হেঁটে ডেরায় ফেরা। একইরকম, গতানুগতিক আরেকটা ভোরের অপেক্ষায়। নিজেকেই নিজে ভেংচি কেটে।

আর হ্যাঁ, পুরো ছবিতে একটি চরিত্রই মুখোশহীন, এক ঝলক মাত্র দেখা দেয়। সে এক নাগরিক সন্ত, যেন বা সমস্ত জগতকে ব্যাঙ্গ করছে আয়নায় তাকিয়ে আপন ছুরত দেখে নিয়ে। যেন বা সে এক স্বরূপ-সন্ধানী সৃজন-মগ্ন মানব। যেন বা সে হুমায়ূন আহমেদের ‘হিমু’ এক।

এই নগর আর তাবৎ সভ্যতার অনুভূতিহীন শিবের বুকে টিকে থাকার আর টিকিয়ে রাখার দৌড়ে দাঁত-মুখ খিঁচানো কালী-নৃত্যের পাকেচক্রে পড়ে আমরা সকলেই মুখোশধারী। স্থান-কাল-পাত্রভেদে শুধু বদলায় মুখোশ। কে তবে টিকে থাকতে চায়? আর কাকেই বা টিকিয়ে রাখতে চায় সে? সে যেমন ব্যক্তি নিজে টিকে থাকতে চায়, আর টিকিয়ে রাখতে চায় চলমান ব্যবস্থাকে আর সাথে সাথে ক্ষমতাকাঠামোকেও।

ছবির শেষে যে সুখশ্রাব্য সংগীতটি শুনানো হল, সেটিতেও অজস্র মুখোশের আড়ালে মানবের স্বরূপ সন্ধানের আকাঙ্ক্ষার কথাই উচ্চারিত হয়েছে।

তবে ছবিটি দেখা শেষ হলে একটি দার্শনিক প্রশ্ন কারও মনে জাগতে পারে, যে বিষয়টিতে আলো ফেললে ভালো হতো মনে হয়। সেটি হচ্ছে, এমন একটা গানের কলি আছে না, “খোদায় সৃজিলেন মানব আপনও ছুরতে”… আসলে ‘আপন ছুরত’ বলতে আদৌ কি কিছু আছে? আছে কি অন্বিষ্ট ‘স্বরূপ’ বলতে যা বোঝায়, সেটি?

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র : ছুরত

পরিচালনা : গোলাম রাব্বানী

ব্যাপ্তিকাল : ১৫ মিনিট।

চিত্রগ্রহণ : রায় সন্দ্বীপ

সম্পাদনা : ইসতিয়াক আহমেদ মাসুদ

সংগীত : মুনতাসীর তুষার
জিসান আহমেদ

অভিনয় :
নওশাবা
মিজানুর রহমান
মানিক শাহ
সুকান্ত হালদার
অন্যান্য

(Visited 10 times, 1 visits today)

Leave a Comment