একটা কুকুরের জন্য এত যুদ্ধ, এত প্রাণ ক্ষয়? এখানে আসল ঘটনাটা জন উইক চলচ্চিত্র যারা দেখেছেন আর যারা দেখেননি তাদের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যারা দেখেছেন তারা জানেন রূপকার্থে এই কুকুর জন উইকের (কিয়ানো রিভস) যাত্রা পথের প্রথম পাথর, যে পাথর আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া প্রিতমা স্ত্রী’র শেষ উপহার। এই পাথর জন উইকের হৃদয়ের শূন্যতাকে ভরাট করে রেখেছিল, যার গায়ে এতসব মানুষের প্রাণ ক্ষয়ের সাথে জনের চূড়ান্ত গন্তব্যও স্পষ্টভাবে লেখা। তাকে বলা যায় টম্বস্টোন বা সমাধি পাথর।
ঘটনাটি সংক্ষেপে এরকম প্রেমের জন্য আন্ডার ওয়ার্ল্ড থেকে সুখী বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করার পর জন উইক সবার মন থেকে প্রায় বিস্মৃত হয়ে যায় । কিন্তু সবকিছু সুন্দরভাবে চললেও একসময় তার স্ত্রী’র (ব্রিগেট ময়নাহাম) ক্যানসার ধরা পড়ে আর একদিন মারা যায় সে। তবে তাকে সমাহিত করে আসার পর জনের কাছে একটা কুরিয়ার আসে, কুরিয়ারে থাকে একটা কুকুর আর সঙ্গে একটি চিঠি। প্রথমে অদ্ভুত মনে হলেও, তার স্ত্রীর চিঠি যখন পড়ে সে তখন জানা যায় এই কুকুর তার স্ত্রীর শেষ উপহার। কিন্তু কুকুর কেন? কারণ তার স্ত্রীর ধারণা এই কুকুর জনের নি:সঙ্গতা কাটাতে সাহায্য করবে। তবে ট্র্যাজেডি হলো, এই কুকুরের মৃত্যুর কারণেই জন আবার পূর্বের এসাসিনের ভূমিকায় ‘বাবা ইয়াগা’ রূপে ফিরে আসে প্রতিশোধ নিতে।
তলোয়ার যুদ্ধের এক পর্যায়ে কেইন তাকে বলে, ‘এমনকি একজন অন্ধলোকও জেনেছে তুমি হেরে গেছ, এবার ক্ষান্ত হও’। কিন্তু সে ক্ষান্ত হয় না, মৃত্যু থেকে কোনো সামুরাই কি পালাতে পারে? পালানো তো অসম্মান। এই সিরিজের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কিয়ানো রিভসের পুরনো সহঅভিনেতা লরেন্স ফিশবোর্ন ‘বাউরি কিং’ চরিত্রে এই শেষ পর্বেও চমক দেখিয়েছেন। হাই টেবিলের সাথে যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া থ্রি মাস্কেটিয়ার্স— জন উইক, উইনস্টন, আর বাউরি কিং।
এই সিরিজের তিন নাম্বার পর্বে আমরা দেখেছিলাম হাই টেবিলের সাথে যুদ্ধ জয়ের পর বন্ধু ‘উইনস্টন’ তার সাথে প্রতারণা করে। তাকে মৃত্যুর কাছে সোপর্দ করে। কিন্তু তার বাঁচার একটা ক্ষীণ আশা রয়ে গিয়েছিল তখন। সেখান থেকেই শুরু হয়েছে সিরিজের চার নাম্বার পর্ব, যেটিকে আপাতত উপসংহার পর্ব বা শেষ পর্বও বলা যায়। এই পর্বে আমরা ‘কনসিকোয়েন্স’ নামে এক বহু ব্যবহৃত ধারণার সম্মুখিন হই, যার মানে হলো তোমাকে তোমার কর্মফল ভোগ করতে হবে। তুমি যেই হও না কেন। এই পর্যায়ে জন উইনস্টনের মাধ্যমে জানতে পারে হাই টেবিলের বর্তমান কর্ণধার কে, এবং জন উইকের এত দুর্দশার মূলে কে কলকাঠি নাড়ছে। তার নাম মারকুইস (বিল স্কারসগার্দ) ফিল্মের শুরুতেই সে উইনস্টনকে ডেকে পাঠায় এবং জন উইককে মেরে না ফেলার জন্য তাকে দোষারোপ করে, ফলাফল হচ্ছে উনস্টনকে হাই টেবিল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তার হোটেল কন্টিনেন্টাল মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয় এবং তার ম্যানেজার চ্যারনকে (ল্যান্স রিড্ডিক) মেরে ফেলা হয়। মারকুইস মনে করে ব্যক্তি জন উইক থেকেও তার হাই টেবিল ধ্বংসের ধারণা বেশি বিপজ্জ্বন্ক, তাই জন উইক যাদের সংস্পর্শে এসেছে তাদের সবাইকে মেরে ফেলতে হবে। কিন্তু কীভাবে? এখানেই কেইন চরিত্রে আবির্ভাব ঘটে ‘ইপ ম্যান’ খ্যাত ড্যানি ইয়েনের। সে একজন অন্ধ এসাসিন এবং জনের পুরনো বন্ধু, যার মেয়ে হাই টেবিলের নজরে রয়েছে। তাকে বাঁচানোর জন্য সে মারকুইসের নির্দেশ মেনে নিতে বাধ্য হয়। এবং শুরু হয় হত্যা আর অপূর্ব সব গান ফাইটিং, মার্শাল আর্ট আর তলোয়ার যুদ্ধ এবং অবশেষ ডুয়েলের মাধ্যমে কনসিকোয়েন্সের সমাপ্তির।

Image by Digital Spy
এই রক্ত আর হত্যার ম্যারাথন চলতে থাকে নিউ ইয়র্ক থেকে মরক্কো আর জাপান পর্যন্ত। জাপানের হোটেল কন্টিনেন্টালের শাখা ‘ওসাকা’র মালিক কানজু (কোজি শিমাজো) জন উইককে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। শিমাজোর অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার সাথে আমরা পূর্ব পরিচিত, ‘দ্য লাস্ট সামুরাই’য়ে অভিনয়সহ বহু হলিউড চলচ্চিত্রে দেখা গেছে তাকে। হোটেল ওসাকায় সে যখন সর্বস্বের বিনিময়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও জন উইকের পক্ষে দাঁড়ায়। তখন বন্ধুত্ব নিয়ে আমাদের ভাবনা আরো গাঢ় হয়। তলোয়ার যুদ্ধের এক পর্যায়ে কেইন তাকে বলে, ‘এমনকি একজন অন্ধলোকও জেনেছে তুমি হেরে গেছ, এবার ক্ষান্ত হও’। কিন্তু সে ক্ষান্ত হয় না, মৃত্যু থেকে কোনো সামুরাই কি পালাতে পারে? পালানো তো অসম্মান। এই সিরিজের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কিয়ানো রিভসের পুরনো সহঅভিনেতা লরেন্স ফিশবোর্ন ‘বাউরি কিং’ চরিত্রে এই শেষ পর্বেও চমক দেখিয়েছেন। হাই টেবিলের সাথে যুদ্ধের বেঁচে যাওয়া থ্রি মাস্কেটিয়ার্স— জন উইক, উইনস্টন, আর বাউরি কিং।
তবে এই অনন্ত যুদ্ধের তো একটা সমাপ্তি দরকার, আর এই সমাপ্তির পথের দিশা নিয়ে আসে সেই পুরনো চালাক বন্ধু উইনস্টন। সে জনকে বলে শুধু মারকুইসকে মারলেই হবে না, কেননা সে মরলে সাথে সাথে তার জায়গায় আরেকজন প্রতিস্থাপিত হবে। তোমাকে যা করতে হবে তা হলো তাকে সেই পুরনো নিয়মের অধীনে ডুয়েলে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। ডুয়েলের পুরস্কার হবে, তোমার সম্মান এবং পূর্ণ স্বাধীনতা। তার দেখানো পথে জন তার ফেলে আসা গোষ্ঠীর সদস্যপদ সংগ্রহ করে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, কেননা নিয়মানুযায়ী এই সদস্যপদ ছাড়া সে কাউকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানাতে পারবে না। এই সদস্যপদ সংগ্রহের শর্ত পূরণে তাকে ‘স্কট এডকিনস’ (কিলা) এর সাথে মৃত্যুমুখী লড়াই করতে হয়। স্কট এডকিনস পুরো চলচ্চিত্রে মাত্র এই একটা সিনেই ছিলেন, কিন্তু মাত্র কয়েকমিনিটের মধ্যেই তিনি অসাধারণ অভিনয় দক্ষতায় আমাদের ‘কিলা’ নামে এক ব্যতিক্রমী ভিলেন চরিত্র উপহার দিয়েছেন। আর এসব মারাত্মক বাধা-বিপত্তির মাঝেই ২০১৪ তে শুরু হওয়া চাদ স্টেলাস্কির জন উইক সিরিজ তার গন্তব্যে এগিয়ে যায়।
অসাধারণ গল্প আর নির্দেশনা, সাথে অনবদ্য ফাইটিং, স্টান্ট আর গ্রাফিক্স সিরিজের প্রথম পর্ব থেকে জনপ্রিয়তার পারদকে কখনও নামতে দেয়নি, বরং প্রতিবারই নতুন করে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে এর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কিয়ানো রিভসের ক্যারিয়ারেও এই ফিল্ম এক নতুন মোড় দিয়েছে।শেষ পর্বে যখন সবকিছুই শেষের দিকে যাচ্ছে, তখন মাত্র কয়েক বাক্যে কথা শেষ করা কিয়ানো যখন উইন্সটনকে বলে, ‘উইনস্টন তুমি আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে?’ উইনস্টন বলে, ‘অবশ্যই!’ তখন দর্শকদের মনে এর অভিঘাত পড়ে হাজার বাক্যের চেয়েও বেশি পড়ে। তখন এই বিষয়টি সত্যি করেই ধরা দেয় যে, মহত্ আর মর্যাদাবান হতে আদতে বেশি কিছু প্রয়োজন পড়ে না, শুধু প্রয়োজন বর্তমানে উপস্থিত থাকা, বেঁচে থাকা, নিজের সম্মানকে রক্ষা করা আর প্রকৃত বন্ধুদেরকে কাছে রাখা আর কখনওই অতীতকে ভুলে না যাওয়া। এই হচ্ছে জন উইক, আমাদের ট্র্যাজিক নায়ক। অবশেষে মনে হয় জনের নিঃসঙ্গতার সমাপ্তি ঘটেছে, প্রতিশোধের পথ পাড়ি দিয়ে সে বড় ক্লান্ত, এবার পুনর্মিলনের পালা প্রিয়তমা স্ত্রী’র সঙ্গে।
জন উইক: চ্যাপ্টার ৪
পরিচালক: চাদ স্টেলাস্কি
প্রকাশের সাল: ২০২৩