বাহিরানা

পুষ্পদাহকাল— এহসান হাবীব— বর্তমান আর স্মৃতি-বিস্তৃতিতে ডানা মেলেছে যে কবিতা


এহসান হাবীব তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘শাদা প্রজাপতি’ (২০০৯)তেই পাঠক-সমালোচকদের কাছে নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছিলেন। তাঁর কবিতা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে প্রায়শই সমাজ-রাজনীতির গভীর অর্থ আর অনর্থবোধকতায় চলে যায়, আবার উল্টোভাবে বাহিরের ঘটনাগুলোকে ব্যক্তিগততে নিয়ে আসে। ফলে বহুস্বর তৈরি হয়, অন্যরকম অভিব্যক্তির কবিতার শব্দ আর বাক্যগুলো নিজেদের চেনা পরিসর পাল্টে ফেলে পাঠকদেরও অভিজ্ঞতায় আরোহণ করে। ইতিহাসও, বিশেষ করে প্রাগৈতিহাসিক স্তর থেকে মানুষের দু:খবোধগুলো ইতিহাস চেতনার মধ্য দিয়ে ধরা দেয় তার কাছে। অন্যদিকে তাঁর কবিতায় এক গভীর হাহাকার দেখা যায়, অস্তিত্বের গভীর থেকে উঠে আসা অতৃপ্তি সেই হাহাকারের কারণ, সেখানে বাহ্যিকভাবে বাস্তবতার অতৃপ্তিগুলো যুক্ত হয়ে এক ভাষায় রূপ নেয়। সেখানে এসে মেশে প্রেম, পাওয়া, না-পাওয়া, ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র। দ্বিতীয় কবিতার বই ‘টীকাভাষ্য’ (২০১৫)য়েও এই বিষয়গুলোর ক্রমবিস্তৃতি চোখে পড়ে।

তাঁর তৃতীয় কবিতার বই ‘পুষ্পদাহকাল’-এ আমরা দেখতে পাই তিনি নিজেকে আরো বেশি রক্ত-মাংস আর শূন্যতার কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। আর বিশেষ করে, রাজনীতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, বিশৃঙ্খলার মাঝে শূন্যতার অবসানের একটা ভাষ্য নির্মাণ চোখে পড়ে।‌ ‘বর্তমানের পরাবাস্তব ভাষ্য নির্মাণ’, এই অভিধাটাই মনে হয় যুক্তিযুক্ত। তবে অসহনীয় এক বর্তমান থেকে পাঠকদের চোখ সরতে দিতে চায় না এই বইয়ের কবিতাগুলো।

বইটিতে ‘শালুক ও শালগম’ শিরোনামে একটা সিরিজ কবিতা আছে। পড়তে পড়তে মনে হয় ‘শালুক ও শালগম’ যেন এখানে কবির এক অপর সত্তা, একটা মনোলগের অংশ, যে কবির বিপরীত, যে মানুষের সাথে দূরত্ব বজায় রাখে। একদম অন্যরকম এই কবিতাগুলো।

তৃতীয় মানে শুধু একটা সংখ্যা নয়, একজন কবির কাব্যপরিক্রমা হিসেবে এটাকে একটা সম্পূর্ণ চক্র পূর্ণ করাও বুঝাতে পারে। যেমন, জীবনের তিন কাল, তিনটা সময়। এহসান হাবীব কবিতায় নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করেছেন, সেটা তাঁর তিনটা বইয়ে সম্পূর্ণতা লাভ করেছে বলে মনে হয়।
‘পুষ্পদাহকাল’ থেকে কিছু কবিতাংশ দেখা যাক:

“আরও বহু দিন, এই রঙিন মাছের শহরে আছি
মৃত এক কল্পপুরী, কফিনের ভেতর ঘুরছি
নির্বিকার!
আমাদের সম্মিলিত ক্রোধের ভেতর রঙিন,
লাল-নীল মাছেরা কফিনের ভেতর
আশ্চর্য অ্যাকুয়ারিয়ামে যুথবদ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, খেলা করছে
নির্বিবাদ।”

(রঙিন মাছের শহর, পুষ্পদাহকাল)

“আমাদের উৎসুক ঠোঁটের ওপর বসে থাকে এক জোড়া জুতো
শক্ত, পলিশ করা জুতোর ওপর উর্দি ছড়িয়ে থাকে ।
দুপুরের রোদে আমাদের আর দেখা হয় না
আমাদের সন্ত্রস্ত করে রাখে সময়,
হাতুড়ি হেলমেট
সাইরেন
মধ্যরাতের কালো গাড়ি।”

(আমাদের দেখা হোক, ঐ)

“এইভাবে অনেকগুলো আপনি অনেকগুলো তুমি মিলে
সারা রাত একটা আমির সঙ্গে খেলা করে। গান গায়। কান্না করে।
অনেকগুলো আপনি তুমির সঙ্গে একটা আমি সারা রাত খেলা করে
ভোরবেলা চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকে। ক্রসফায়ারের লাশের সাথে।”

(ক্রসফায়ার, ঐ)

“এমন আকাশে
খেলা করছে
ডিগবাজি খাচ্ছে
পাখা ঝাপটাচ্ছে
দুটো চিল।

খেলা করে করে শেষ বিকেলে
উড়ে উড়ে দূরে চলে গেল
চিল দুটো।

যার যার নিজেদের দিকে।”

(প্রণয়সঙ্গী, ঐ)

তবু অজস্র জন্ম ধরে আমি কথা বলছি তোমার দিকে
তুমি ভাষাহীন একটা শাদা ফুল।

অন্তত নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার আগে
কথা বলো, জানিয়ো—
তুমি
কেমন আছো?”

(পুষ্পদাহকাল, ঐ)

মনুষ্য শূন্যতা বা নাগরিক বিষণ্নতায় জন্ম নেওয়া ফাঁকা যুথবদ্ধতার মাঝে জন্ম হওয়া পরাবাস্তবতাকে ভাষাবন্দী করে কবিতার এই পঙ্‌ক্তিগুলো। চমৎকার চিত্রকল্পে তারা যে দৃশ্যের জন্ম দেয় সেগুলো নিখাঁদ কবিতারই স্বত্ব। হাহাকার আর দূরত্বের কোনো সহনীয় মাত্রা নেই, হয় তাকে অতিক্রম করতে হয় মেনে নিয়ে, কিংবা তাকে বদলে ফেলতে হয়। কিন্তু ব্যক্তিত্বের নিগড়ে বন্দী দুটো চিল কী সেই দূরত্ব ঘুচাতে পারবে? মনে হয় না। কিন্তু সেই হাহাকার আর দূরত্বকে কবি চিহ্নিত করেন।

বইটিতে ‘শালুক ও শালগম’ শিরোনামে একটা সিরিজ কবিতা আছে। পড়তে পড়তে মনে হয় ‘শালুক ও শালগম’ যেন এখানে কবির এক অপর সত্তা, একটা মনোলগের অংশ, যে কবির বিপরীত, যে মানুষের সাথে দূরত্ব বজায় রাখে। একদম অন্যরকম এই কবিতাগুলো।

“প্রতিদিন যা যা কথা হয় শালগমের সাথে, তার প্রায় সময়েই কোনো অর্থ হয়
না। নানা কৌতুকহাস্যে আমরা উদ্ভিজ সমাজের কথা বলি। জানি তো,
শালগম মনুষ্যসমাজের গল্প শুনতে পছন্দ করে না।”

(শালুক ও শালগম: দুই, ঐ)

“আজো মাঝে মাঝে শালগম কেঁদে উঠলে টের পাই তার গোধূলির
চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পরে আমারই চোখের জল। আহা
শালগম, আপনি জানলেন না!”

(শালুক ও শালগম, ঐ)

‘পুষ্পদাহকাল’-এ এহসান হাবীব এক অন্য জগত্ নির্মাণ করেছেন। নতুন কবিতায় তৈরি করেছেন সেই পৃথিবীর বস্তুদের অন্যতর অর্থ আর অনর্থ। অন্যদিকে, তারা আমাদেরকে বর্তমান বাস্তবতার অসনীয়তাকে দেখিয়ে চমকিত করে, বিস্মিত করে, বাকরুদ্ধও করে। আবার বারবার আকর্ষণ করে তাদের দিকে। তার প্রেম আমাদের দূরত্বের হাহাকারকে অনুভব করায়, তিনি বলেন—

“যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা
দুটো হৃদ্‌পিণ্ড

কাঁপতে কাঁপতে
সরে যাচ্ছে দূরে।

তাদের নিজেদের অজান্তে!”

(দূরত্ব, ঐ)

সবশেষে, বইটি পাঠকদের নিজেদের হৃদয়ের গভীরতর ‘অদ্ভুত সোনালি রোদে’ যাক।

পুষ্পদাহকাল
এহসান হাবীব
প্রকাশক: উজান প্রকাশন
প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২২
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৮
দাম: ১৭৫ টাকা।

বইটি কিনতে:

পুষ্পদাহকাল – বাহিরানা (bahirana.com)

 

 

 

(Visited 76 times, 1 visits today)

Leave a Comment