বাহিরানা

মানবতাবাদী সাহিত্যের বিপক্ষে মাসরুর আরেফিন: ইকতিজা আহসানের সঙ্গে আলাপ— অস্তিত্বকে দেখার এক ভিন্ন আয়না


“বলছি না যে সবকিছু খারাপ। আমি বলছি যে সবকিছু বিপজ্জনক। আর সব যখন বিপজ্জনকই, তাহলে আমাদেরও সবসময় করার মতো কিছু কাজ আছে। আমাদের রোজকার নৈতিক-রাজনৈতিক পজিশন হওয়া উচিত এইটাই ঠিক করা যে, প্রধান বিপদটা কী।”

উপন্যাস ও অনুবাদের দুই বিপরীত ধারায় নিজের অনন্য ভিত্তি প্রতিষ্ঠার পর মাসুরুর আরেফিনের সাক্ষাৎকার গ্রন্থ “মানবতাবাদী সাহিত্যের বিপক্ষে; মাসরুর আরেফিন: ইকতিজা আহসানের সঙ্গে আলাপ” প্রকাশিত হলো দুই হাজার তেইশের বইমেলায়। সাক্ষাৎকারগ্রহীতা ইকতিজা আহসান। যিনি সঠিক প্রশ্নটিকে বাছাই করার পাশাপাশি উত্তরের পরে পাল্টা প্রশ্নেও বিশেষ বিজ্ঞতার পরিচয় প্রদান করেছেন। বইটি সেই সাক্ষ্য দেয়।

আলোচিত লেখকদের মধ্যে এসেছে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম দিকপাল জেমস জয়েস, টি এস এলিয়ট, কাফকা, তলস্তয়, হোর্হে লুইস বোর্হেস থেকে শুরু করে সেসার ভাইয়্যেহোসহ আরো অনেক নাম, সেইসাথে বাংলা সাহিত্যের জীবননান্দ দাশ, কমলকুমার মজুমদার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস থেকে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ সহ উল্লেখযোগ্য বহু নাম।

বইটির বিশেষত্ব হলো, এখানে মাসরুর আরেফিন গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে সাহিত্য, সমাজ, রাষ্ট্র, ক্ষমতা এবং অর্থনীতি নিয়ে তাঁর চিন্তা, দর্শন এবং একইসাথে তিনি কিভাবে বস্তবিশ্বকে দেখেন তার রূপরেখা প্রদান করেছেন। সাহিত্য বলতে বিশ্বসাহিত্য এবং বাংলাসাহিত্যের দিকপালদের নিয়ে তার পঠন-পাঠন, চিন্তা আর অভিজ্ঞতাসঞ্জাত নতুন দিকনির্দেশকারী তীর্যক মন্তব্য— বইটির এক গহন গুণ এবং সেগুলো একইসাথে পাঠকদের নতুন বাস্ততার সম্মুখিন করে, যা একেবারেই ভিন্নভাবে দেখার ভূমি নির্মাণ করে তাদের জন্য। কবিতা, উপন্যাস রচয়িতাদের সাহিত্যকৃতি, নির্মাণদক্ষতার পাশাপাশি তাঁদের নিজস্ব দর্শন, যেখানে অবধারিতভাবে সমাজ-সংস্কৃতি যুক্ত, আর তাই মাসরুরের আলোচিত লেখকেরা এখন অবধি কে কতটা বা কেমন গ্রহণযোগ্য তার রকমফেরও মূখ্যভূমিকা নিয়ে হাজির হয়। মাসরুর আরেফিন এ সবদিকই তাঁর আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। বইয়ের নামকরণেই তা স্পষ্ট, তিনি আদর্শবাদী আর এনজিও সাহিত্যের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। যা কীনা বর্তমান সাহিত্যিসমালোচনার জন্য এক মহাকাব্যিক উদাহরণ।

আলোচিত লেখকদের মধ্যে এসেছে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম দিকপাল জেমস জয়েস, টি এস এলিয়ট, কাফকা, তলস্তয়, হোর্হে লুইস বোর্হেস থেকে শুরু করে সেসার ভাইয়্যেহোসহ আরো অনেক নাম, সেইসাথে বাংলা সাহিত্যের জীবননান্দ দাশ, কমলকুমার মজুমদার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস থেকে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ সহ উল্লেখযোগ্য বহু নাম।

লেখার প্রথমেই উল্লেখ করা বাক্যটি ‘মিশেল ফুকো’র ক্ষমতা নিয়ে করা উক্তির মাসরুরীয় উল্লেখ, তাই এই সাক্ষাৎকারে অবধারিতভাবে সাম্প্রতিক বিশ্বরাজনীতির অবস্থা, এবং বিশেষ করে ক্ষমতা কাঠামো বৃহৎ পরিসরে এসেছে। মিশেল ফুকো থেকে উত্তর ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদসহ আলোচনায় এসেছে তাত্ত্ববিশ্বের গুরুত্বপূর্ণদের নিয়ে মাসরুর আরেফিনের ভাবনা। যা এই সময়কে বুঝতে বিশেষ সাহায্য করবে। ‍এখানে মিশেল ফুকোকে নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ দেখতে পারি আমারা:

“ইকতিজা আহসান: আপনি ব্যক্তিগতভাবে মিশেল ফুকোকে কোথায় রাখেন?

মাসরুর আরেফিন: সাহিত্যে আমার কাছে চেখভ-কাফকা-বোর্হেস-রবীন্দ্রনাথ যেখানে, দর্শন ও সমাজ-রাজনীতি বিদ্যায় মিশেল ফুকো সেখানে। তিনি সবার ওপরে। প্লেটো আমার কমবেশি সবই পড়া। এই পৃথিবী প্লেটোয়ান পৃথিবী। আর মিশেল ফুকো এই পৃথিবীর অডিট ও ইন্সপেকশনের হেড।”

এই সাক্ষাৎকার গ্রন্থে মাসরুর আরেফিনের নিজের উপন্যাসগুলোর বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনা করেছেন বিভিন্ন প্রসঙ্গে। ব্যক্তি, ঔপন্যাসিক মাসরুর আরেফিনকে বুঝতেও যা প্রভূত সাহায্য করবে।

তাঁর চিন্তার ধার এবং গভীরতা বুঝার জন্য তাঁর উপন্যাস ‘আলথুসার’-এ জীবনানন্দের এক কবিতার প্রসঙ্গের তাঁর আলাপের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়,

“ইঙ্গিতটা তো আছেই। আমিও তাঁর ইঙ্গিতটুকু নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইমেজ এটাই বানিয়েছিলাম যে, এক উঁচু মিনারের একটা বিমর্ষ-দুঃখী কিনার আছে, শ্যাওলাপড়া কিংবা খটখটে কিনার। সেইটা ঘিরে উড়ছে অনেক কটা শকুন। তাদের নিচে উড়ছে ‘পৃথিবীর পাখিরা’। যেহেতু শকুনেরা নিজেরা অভিশপ্ত নরকের পাখি, তাই পৃথিবীর পাখিদের কথা আলাদা করে বলতে হল কবিকে।

অনুমান করা যায়, শকুনদের নিচে উড়ছে ছোট ছোট পাপিয়া-ছাতারে-বুলবুল-কাঠশালিক। তো, শকুনেরা হঠাৎ বুঝল, তারা এত ক্ষমতাশালী পাখি যে, ওই নগণ্য পাখিদের তুলনায় এতটাই বড় ক্ষমতার যে, তাদের আর এই পৃথিবীর আকাশে রাজত্ব করার কিছু নেই। একাকীত্বের বোধ অতএব পেয়ে বসল তাদেরকে। তারপর, তাই, মনের দুঃখ থেকে তারা উড়ে গেল আরও উপরে, যেখানে ঠাণ্ডা বেশি, যেখানে অক্সিজেন নেই। সব ক্ষমতাকে বিদায় বলে তারা উড়ে গেল তার মানে তো আত্মহত্যারই দিকে।—উপন্যাসে তখন বোধহয় ক্ষমতাশালীর একাকীত্ব বা ক্ষমতাশালীর হতাশাকে দেখানোর দরকার ছিল আমার।”

এরকম অসংখ্য বিশ্লেষণ রয়েছে বইটিতে, খুঁটিনাটিসহ এই সময়কে তার সমগ্রতাসহ বুঝার জন্য যা খুবই সহায়ক ভূমিকা নেবে।
বইটি সাহিত্য, রাজনীতি, ক্ষমতার পরিসর নিয়ে নতুন করে ভাবাবে পাঠকদের এটা দৃঢ়ভাবে বলা যায়।

মানবতাবাদী সাহিত্যের বিপক্ষে; মাসরুর আরেফিন: ইকতিজা আহসানের সঙ্গে আলাপ
মাসরুর আরেফিন
সাক্ষাত্কারগ্রহণ ও সম্পাদনা: ইকতিজা আহসান
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
দাম: ৫০০ টাকা।

বইটি কিনতে হলে :

মানবতাবাদী সাহিত্যের বিপক্ষে মাসরুর আরেফিন: ইকতিজা আহসানের সঙ্গে আলাপ – বাহিরানা

 

 

 

 

 

 

 

 

 

(Visited 23 times, 1 visits today)

Leave a Comment