বেড়াল মানুষের সৃষ্টিশীল সত্তার এক মূর্তরূপ। বেড়াল অন্য পোষা প্রাণীদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ সে সঙ্গ দেয় না তাকে সঙ্গ দিতে হয়, সে তখনই কাছে আসে যখন সে চায়। তার ভালোবাসা-ঘৃণা, বন্ধুত্ব অনেকটাই মানুষের মনের মতো জটিলতায় পূর্ণ। তাই তাকে ঘিরে থাকে কৌতূহল, রহস্য আর বিস্ময়। অনেক সময় ভয় আর বিস্ময়ের যৌথরূপও, যেমন এডগার এ্যালান পো’র কালো বেড়াল, যা কীনা ইতোমধ্যে কাল্টফিগার হয়ে ওঠেছে। হারুকি মুরাকামির বিড়ালদের শহর, যেটি কীনা বিড়ালরাই পরিচালনা করে। এরকম সমগ্র বিশ্বজুড়েই এই আশ্চর্য প্রাণীটি নিয়ে লেখকেরা বহু বহু গল্প লিখেছেন, সে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়েছে উপন্যাসের, কবিতার।
এই গল্পটার কথা এখানে বলার কারণ হলো, মাঝে মাঝে আমরা বা বস্তুজগতের প্রাণীরা বাস্তবে ক্রিয়াশীল থাকলেও তারা অন্যদের মাঝে আদতে বেঁচে আছে গল্পে, ইতিহাসে, পৌরাণিক আখ্যানে।
এখানে ভিন্ন এক প্রাণী নিয়ে ইতালো কালভিনোর কথা বলা যায়, তিনি ডাইনোসর নিয়ে গল্প লিখেছিলেন। সেখানে দেখা যায়, ডাইনোসরদের সব শক্তিমত্তা, গুণ সম্বলিত এক ডাইনোসরের একাকী জীবন, তখন মানুষেরা বিবর্তনের ধারায় পৃথিবীতে এসে গেছে, তারা সারাদিন ডাইনোসর নিয়ে বিভিন্ন পুরাকাহিনী বলে, যেগুলো তারা তাদের পূর্বপুরুষের কাছ থেকে শুনেছে। কিন্তু তারা একজনও প্রাণীটিকে দেখেনি, একদিন তারা শুনতে পায় ডাইনোসরেরা আসছে, তারা বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আর যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। কিন্তু তারাসহ প্রোটাগনিস্ট ডাইনোসরটি হাড়ঝিরঝিরে কিছু প্রাণীকে দেখতে পায়, যারা বর্তমানে পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রাণীটির সর্বশেষ প্রতিনিধি। তারা সবাই হতাশ হয়, এই হচ্ছে ডাইনোসর! এ তো কিছু উচ্ছিষ্টভোগী মাত্র! তবে, পরিহাসের বিষয় হলো, তারা কখনও জানতেই পারেনি তাদের মাঝেই রয়ে গেছে সেই অমিত ক্ষমতাধর প্রাণের সর্বশেষ জীবন্ত নিদর্শন। এই গল্পটার কথা এখানে বলার কারণ হলো, মাঝে মাঝে আমরা বা বস্তুজগতের প্রাণীরা বাস্তবে ক্রিয়াশীল থাকলেও তারা অন্যদের মাঝে আদতে বেঁচে আছে গল্পে, ইতিহাসে, পৌরাণিক আখ্যানে। তাই গল্পের শেষ নেই, হতে পারে না।
তাই বেড়ালেরও শেষ নেই, প্লেটোর আদর্শবস্তুর কতরকম সাহিত্যিক রূপান্তর যে হয়েছে, তা এই বইটি পড়লে জানা যেতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে তলস্তয়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হেমিংওয়ে, কে নেই এখানে সেটাই ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আর কী কী ধরণের বেড়াল নেই তাও আশ্চর্য হয়ে দেখা দেয়। এখানে বইটির সম্পাদক কবি, শিশু সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এহসান হায়দারের কৃতিত্ব সর্বাধিক। বিনয় মজুমদারকে নিয়ে দুই বাংলার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বৃহৎ পরিসরে আর স্বচ্ছতার সাথে ‘এক আশ্চর্য ফুল: বিনয় মজুমদার’ সম্পাদনা করেই তাঁর নিষ্ঠা আর প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। এই বইয়ে আবার তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখি আমরা। বইটিতে চিরায়ত আর নতুন মিলিয়ে গল্প আছে চুরাশিটি, অনুবাদ গল্প আছে নয়টি, আর লোকগাথা থেকে নেওয়া হয়েছে চারটি গল্প।
বাংলার বেড়ালগুলো যখন আমাদের সংস্কৃতির এক ভিন্ন দরোজা খুলে দেখায়, তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বেড়ালগুলি দেখায় তাদের নিজ নিজ ভিন্নতার সংস্কৃতি। এতে এই মিল আর অমিল, বিস্ময় আর সাধারণের যে যুগসূত্রতা গড়ে ওঠে, তা আসলে এক প্রশ্নের সামনেও নিয়ে আসে আমাদের, আমরাই কি শুধুমাত্র সঠিক? নাকি যারা আমাদের মতো নয় যেমন বেড়ালেরা তারাও তাদের জায়গায় সঠিক?
বইয়ের অসাধারণ অলংকরণ করেছেন লুবনাচর্যা, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় তার অসামান্য নজির দেখতে পাই আমরা। বেড়াল নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে, কিংবা বেড়াল পুষেন তারা ছাড়াও বইটি সবধরণের পাঠকদের পাঠক্ষুধা মেটাবে এটা ভালো করে বলা যায়।
সারাদিন বেড়ালের সঙ্গে: বেড়ালের গল্প-সংকলন
সম্পাদনা: এহসান হায়দার
প্রকাশক: দ্যু প্রকাশন
দাম: ৮৫০ টাকা।
বই কিনতে হলে
সারাদিন বেড়ালের সঙ্গে: বেড়ালের গল্প-সংকলন – বাহিরানা (bahirana.com)