রাজিয়া সুলতানা ইতোমধ্যে কবিতায় তাঁর স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করেছেন পাঠক ও বোদ্ধা মহলে। তাঁর কবিতায় জীবন ও জগৎ ভিন্নদিশায় নিজেকে স্পষ্ট করে মেলে ধরে, বস্তু জগতের সাথে ঘনিষ্ঠতা অনবদ্য সব চিত্রকল্পে হাজির করেন তিনি। প্রথম কবিতার বই, ‘ভালোবেসে ভালো নেই’ (২০১৫), থেকে দ্বিতীয় কবিতার বই ‘হারপুনে গেঁথেছি চাঁদ’ (২০১৬)-এ ক্রমান্বয়ে নিজের ভাষাব্যবহারকে ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি। এরই ধারবাহিকতায় দীর্ঘ বিরতির পর তৃতীয় কবিতার বই ‘হৈলদা পাতার গান’ (২০২৩) প্রকাশিত হয়েছে এ বছর। এই বইয়ের একটা বাড়তি বিশেষত্ব হলো এর সবগুলো কবিতাই অপ্রমিত আর আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত। বইটি থেকে কয়েকটি কবিতার পঙ্ক্তি দেখা যেতে পারে :
“এক রাইতে তোমার দেউড়ি থাইকা বাইর হয়া
উঁকি দিতে গেছিলাম অন্য এক দহলিজে
সেইখানে হঠাৎ ভোরের বাঁস
যে আলো পুব আসমানে
তার সন্ধানে নাইমা আমি হাজির তোমার ছায়ার কাছে।’’
(খোয়াব, হৈলদা পাতার গান)
“কথারা ফুইটা আছে কথার পাপড়িতে
বুকের ভিতরে কোনোখানে বাত্তি নিভতেছে।
ধুলার চাদরে কিছু চিন পুরানা হাঁটাহাঁটির
তবু স্মৃতি জাগে না আর
তখন অন্যমন
তখন অন্য আন্ধাইরে সারারাত
ডাহুক-বিরহে কান্দে উরের শূন্যতা।’’
(দুঃখ ফুইটা আছে, ঐ)
“শিমুলের তুলা, ফুল-জন্মের কথা
যে গল্প লেখা থাকে বীজেরও আগে
বাতিনে রাখা আছে তার কিসসা
জাহিরে তোমার সামনে
তারে তুমি ক্যান ভয় পাও?”
(তোমার আনচিনা বসন্তে, ঐ)
“কিছু স্বর ছায়ার পিছে ঘোরে
কিছু দৃশ্য বোবা শব্দের উরে
কিছু সুর নিরাকের দোতারা”
(কিছু স্বর, ঐ)
শব্দের মোক্ষম প্রয়োগে রাজিয়া সুলতানা সিদ্ধহস্ত, এই পঙ্ক্তিগুলোসহ পুরো বইতেই তার প্রমাণ রয়েছে। তাঁর কবিতায় একটা প্রচ্ছন্ন গল্প থাকে, ফলে পাঠকদের হোঁচট খেতে হয় না। আবার অন্যদিকে কবিতাগুলোর ভাষা সহজ হলেও এগুলোর ভেতর চিন্তার জটিলতা ভালোভাবেই বিদ্যমান, তাই এগুলো সরল হয়ে ওঠে না, একটা অকথিত বাস্তবতার রহস্য ধরে থাকে নিজের ভেতর। যেমন তিনি বলেন, “যেন কার জাগনার মধ্যে ঘুমায়া পড়তেছি” (যদি জানত, ঐ), এই বাক্যটি যত অনায়াসে বলা হয়েছে, ততটাই জটিল এর অন্তকাঠামো।
একজন কবি শব্দকে নতুন করে জীবনদান করেন, তিনি যেমন প্রচল শব্দকে কবিতায় নিয়ে আসেন তেমনি অপ্রচল বা অচেনা শব্দকেও । বইটি পড়তে পড়তে রাজিয়া সুলতানা’র শব্দ ব্যবহারের দক্ষতা বিস্ময় জাগায়, শব্দ যেন তাঁর কাছে মার্বেল, তিনি ইচ্ছেমতন তাকে পরিচালিত করছেন খেলার ছলে। সেখানে আঞ্চলিক এক শব্দের পাশে জড়তাহীনভাবে এসে যায় আরবি, ফারসি, ইংরেজি শব্দ। প্রমথ চৌধুরী’র ‘সাহিত্যে খেলা’র উদাহরণ মনে পড়ে যেতে পারে এখানে। তিনি অনেক অপ্রচলিত আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন বইটিতে, যে শব্দগুলোর সাহিত্যস্মৃতি নেই। ফলে এগুলোর ব্যবহারও অনেক প্রতিভার দাবী করে। যেমন, ‘উঁসারা’ ‘কানাওলি’ ‘বেবান’ ‘উঁশ’ ‘ছ্যাঁওড়া ধুলা’, এরকম আরো অনেক শব্দ আছে। পুরো বইটিই উপমা, চিত্রকল্পের নতুনত্বে ভাস্বর হয়ে আছে, সেইসাথে জীবনের দার্শনিক জিজ্ঞাসা, প্রেম অন্যতর আবহে ধরা দিয়েছে কবিতাগুলোয়, তারা শূন্যতার মাঝে ’ঝিঁঝিঁদের শোক’ গেঁথে রাখে। বইটি পাঠকদের কবিতার ভরকেন্দ্রে টেনে নিক, আলোচনা শেষ করি রাজিয়া সুলতানার ছোট একটি সম্পূর্ণ কবিতা দিয়ে :
ভাবতে ভাবতে শূন্যতাও ভইরা ওঠে নিরাকের গানে
ঝিঁঝিঁদের শোক যেমন
সন্ধ্যার নিরাবেলি সিনক্রোনাইজ জমায়া ফেলে
বিলাপের কানে।
(শূন্যতাও ভইরা উঠে, ঐ)
হৈলদা পাতার গান
রাজিয়া সুলতানা
প্রকাশক : ভূমি প্রকাশ
দাম : ২৫০ টাকা।