রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের এই সময়পর্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন সময়ের রাশিয়ার ফিনল্যান্ড দখলের পর দেশটির এক যোদ্ধাদলের স্বদেশের প্রতিরক্ষা ও স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের সত্য ঘটনা নিয়ে একটি দুর্ধর্ষ থ্রিলার উপন্যাস ফরাসি লেখক ওলিভিয়ের নরেকের দ্য উইন্টার ওয়ারিয়রস পড়া যেতে পারে। নামেই বোঝা যাচ্ছে উপন্যাসটিতে ইউরোপের হাড় কাঁপানো শীত ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে জীবনপণ যুদ্ধ এক সুতোয় বাঁধা পড়েছে, সেই শীতের মাত্রা গেম অব থ্রোনস-এ দেখানো উইন্টার এর ভয়াবহতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তবে পার্থক্য এই যে, এক বিস্ময়কর ও দূরদর্শী তরুণ স্নাইপার এই যুদ্ধে ভিন্ন এক সীমারেখা এঁকে দেয়। উপন্যাসটির যুদ্ধ ও এই স্নাইপার, যার নাম সিমু হায়হা—দুইই ঐতিহাসিক। বাস্তব ঘটনার উপর লেখা এই ঐতিহাসিক থ্রিলার—যা উপন্যাসটিকে অন্যদের থেকে ভিন্ন করে তুলেছে আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি অন্যরকম চিত্রও তুলে ধরেছে আমাদের সামনে। অন্যদিকে ইংরেজি ভাষার থ্রিলার-এর বাইরে ইউরোপীয় ভাষাতেও যে দারুণ থ্রিলার লেখা হয় এবং সেগুলো যে ব্যাপক জনপ্রিয়ও হয় তার মোক্ষম প্রমাণ আমাদের বর্তমানে আলোচনা করা বইটি। আর শুধু ইউরোপইবা কেন বাংলা থ্রিলারও উৎকর্ষতায় থেমে নেই। স্মর্তব্য ২০২৩ সালে প্রকাশিত মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের অগোচরা শিরোনামে বাংলা থ্রিলার উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্রও একজন স্নাইপার শুটার। সেখানে আশির দশকের ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড-এর অকথিত ইতিহাসের দেখা মেলে। দ্য উইন্টার ওয়ারিয়রস উপন্যাসটি একইসাথে ইতিহাস ও রহস্য উপন্যাসের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নতুন হয়ে উঠেছে। দ্য গার্ডিয়ান বইটিকে ২০২৫ সালের সেরা ৩টি থ্রিলারের তালিকাতেও স্থান দিয়েছে। উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন নিক কেইস্টর। তার প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য অনুবাদ উপন্যাসটির পাঠযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
দলটিকে সংখ্যায় ও যোগ্যতায় ছোট মনে হতে পারে কেননা তারা যাদের সাথে যুদ্ধ করছে সেই রেড আর্মি তখনকার সময়ের সবচেয়ে কৌশলী ও ভারী যুদ্ধ সরঞ্জাম ব্যবহারকারী বাহিনী। এই রেড আর্মিই হিটলারের নাজি বাহিনীকে হারিয়েছিল, তাই তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। তবে এই ছোট দলটির শক্তির দিকটি ভিন্ন, একদিকে তারা যুদ্ধ করছে নিজ দেশের স্বাধীনতার জন্য ও সেই অঞ্চলটি তাদের চেনা, ও অন্যটি, তাদের মধ্যে এমন একজন আছে যে তার দক্ষতায় বিশ্বসেরা, সিমু হায়হা।
ওলিভিয়ের নরেকের দ্য উইন্টার ওয়ারিয়রস উপন্যাসের আখ্যানভাগটি এরকম, ১৯৩৯ সাল, সে বছরই জোসেফ স্টালিনের শাসনামলে সোভিয়েত রাশিয়ার রেড আর্মি ফিনল্যান্ড দখল করে। আর একই বছর ফিনল্যান্ডের রাউটজারভি অঞ্চলের একটি কৃষিজীবী গ্রামে একটি যোদ্ধাদল গঠিত হয়। গ্রামের তরুণ সদস্যদের নিয়ে গঠিত মুক্তিবাহিনী, যারা আবার পরস্পর পরস্পরের খুব চেনা। তারা অনেকেই একে অন্যের শৈশব-কৌশোরের বন্ধু। ফিনল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে রাশিয়ার রেড আর্মির সঙ্গে দলটির ঐতিহাসিক যুদ্ধ—যার কেন্দ্রে রয়েছে শত্রুপক্ষের কাছ থেকে দ্য হোয়াইট ডেথ উপাধী (সাদা মৃত্যু) পাওয়া সিমু হায়হা ও তার দলের মরিয়া শত্রুনিধন ও অনেকের হত হওয়ার আনন্দ-বেদনা—এই হচ্ছে থ্রিলার উপন্যাসটির মূল আখ্যানভাগ।
দলটিকে সংখ্যায় ও যোগ্যতায় ছোট মনে হতে পারে কেননা তারা যাদের সাথে যুদ্ধ করছে সেই রেড আর্মি তখনকার সময়ের সবচেয়ে কৌশলী ও ভারী যুদ্ধ সরঞ্জাম ব্যবহারকারী বাহিনী। এই রেড আর্মিই হিটলারের নাজি বাহিনীকে হারিয়েছিল, তাই তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। তবে এই ছোট দলটির শক্তির দিকটি ভিন্ন, একদিকে তারা যুদ্ধ করছে নিজ দেশের স্বাধীনতার জন্য ও সেই অঞ্চলটি তাদের চেনা, ও অন্যটি, তাদের মধ্যে এমন একজন আছে যে তার দক্ষতায় বিশ্বসেরা, সিমু হায়হা। যার লক্ষ্য কখনও ব্যর্থ হয় না। আমরা দেখতে পাই যে, সে আবার এই হত্যাযজ্ঞ উপভোগও করে, প্রতিবার বিপক্ষ দলের একজনকে মারার পর সে উল্লাস করে। এর কারণও পরিষ্কার, এই বিপক্ষ বাহিনীও হত্যায় থেমে নেই, তারা তার বন্ধু, স্বজনদেরও হত্যা করছে। এখানেই যুদ্ধের নৈতিক দ্বন্দ্ব ও জীবনমরণ লড়াইয়ের দিকটি উন্মোচন করেন ওলিভিয়ের নরেক। এ অনেকটা এরকম যে, তুমি আমার লোক মারছ তো তোমাকে মারলে আমি উল্লসিত হবো, কারণ তোমার মৃত্যু আমার এক প্রকার ক্ষতিপূরণ। যদিও এই ক্ষতিপূরণ সাময়িক শান্তি দিলেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। যাদেরকে সিমু হায়হা হারিয়েছে তারা আর ফিরবে না কখনও।
দক্ষিণ ফিনল্যান্ডে সংঘটিত হয় যুদ্ধটি, ৬নাম্বার কোম্পানীর যুদ্ধদৃশ্যের মধ্যে পাঠকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে উপন্যাসটি। কী ঘটতে চলেছে জানা নেই কিছু, এরকম এক দৃশ্যপটে জয়-পরাজয়ের সম্ভাবনা উপস্থিত থাকে সবসময়। সিমুর দলটিতে তার জন্ম শহরের বন্ধু ও স্বজনরা রয়েছে, এদের কয়েকজনের নাম হলো, কোম্পানি প্রধান জুটিলেইনেন, তোইবু, ওন্নি, পিয়েতারি ও তার ভাই, এবং একজন নার্স লিনা। আরো অনেক নাম ঘুরেফিরে আসে। প্রত্যেকের ভূমিকাই আখ্যানকটিকে উত্তেজনাপূর্ণ করে রাখে। তাদের একজনের মৃত্যু অন্যজনকে শত্রু নিধনে আরো বেশি উদ্বুদ্ধ করে। তবে এসবই সবচেয়ে প্রকটভাবে দেখা যায় কেন্দ্রীয় চরিত্র সিমু হায়হার মধ্যে, প্রতিটি মৃত্যু তাকে জান্তব এক জিঘাংসার দিকে নিয়ে যায়। তার দক্ষতা যেমন চমকিত করে তেমনি তার মধ্যে থাকা স্বদেশপ্রীতিও যে মৌলিক তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এই রাশিয়া-ফিনল্যান্ড যুদ্ধের উপর ওলিভিয়ের নরেকের দ্য উইন্টার ওয়ারিয়রস উপন্যাসটি বর্তমান সময়য়ের রাশিয়ার গতিবিধি বুঝতেও অনেক উপাদান সরবরাহ করে। রাশিয়া মূলগতভাবে তাদের সোভিয়েত সময়পর্ব থেকে কী রেরিয়েছে—এই প্রশ্নের একটি সমীক্ষাও হতে পারে উপন্যাসটি। কিন্তু থ্রিলার হিসেবে কেমন? এক শব্দে বললে, অনবদ্য।
দ্য উইন্টার ওয়ারিয়রস
লেখক: ওলিভিয়ের নরেক
মূল ভাষা: ফরাসি
ইংরেজি অনুবাদ: নিক কেইস্টার
বিষয়: থ্রিলার
প্রকাশক: ওপেন বর্ডার প্রেস
প্রকাশকাল: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
মূল্য: ২৫ ডলার।