১৯৫১ থেকে ২০১৭ সালে এক অধ্যাপককে লেখা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের চিঠি—তাও এর মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুক্ত সম্পর্কিত চিঠি রয়েছে অনেকগুলো—সেই অধ্যাপকের ব্যক্তিগত জীবন যে দৃশ্যমান করে তাই নয়, একটি বৃহৎ সময়কেও পরিস্ফুট করে তোলে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কাছে এই দীর্ঘ সময়পর্বে লেখা চিঠিগুলোর সংকলনই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক ও সম্পাদক মতিউর রহমানের সম্পাদনায় প্রিয় আনিসুজ্জামান: তাঁকে লেখা চিঠিপত্র বইটি।
আমাদের আলোচ্য বইটিতে তার পরিবার ও সাংগঠনিক বিষয়-আশয় নিয়েও চিঠিপত্র রয়েছে। মোদ্দা কথা হলো একজন ব্যক্তি আনিসুজ্জামানকে যেমন এখানে পাওয়া যায় তেমনি সামাজিক, রাষ্ট্রিক দায়িত্বসম্পন্ন আনিসুজ্জামানকেও এই বইটিতে পাওয়া যায়। যা এক বিশেষ প্রাপ্তি বলা যায়।
আমরা জানি আনিসুজ্জামান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশিদেরসহ দেশের স্বার্থে নিরলস কাজ করেছেন। তিনি গবেষক তবু তার একটি সাংগঠনিক সত্তাও রয়েছে, বইয়ের ভূমিকায় মতিউর রহমান জানাচ্ছেন ১৯৭১ সালে কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া শিক্ষকদের নিয়ে তিনি বাংলাদেশ শিক্ষক সমিনি গঠনের মূখ্য সংগঠকদের একজন ছিলেন, “আশ্রয় নেওয়া শিক্ষকদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক শক্তি হিসেবে ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’ নামে যে সংগঠনটি গঠন করা হয়েছিল, তাতে আনিসুজ্জামানের ছিল মূখ্য ভূমিকা। শিক্ষকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, শরণার্থী ক্যাম্পে স্কুল স্থাপন, বহির্বিশ্বে প্রচারণা ও জনমতন গঠন, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অবস্থা ব্যাখ্যা করে বাংলা ও ইংরেজিতে পুস্তিকা প্রকাশের মতো কাজ ছিল এ সমিতির অন্যতম লক্ষ্য।” (প্রিয় আনিসুজ্জামান: তাঁকে লেখা চিঠিপত্র, ভূমিকা)
এর সঙ্গে প্রবাসী সরকারেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, তখন আনিসুজ্জামানের কাছে অনেকগুলো চিঠি এসেছে, চিঠিগুলো যারা লিখেছেন বাংলাদেশ ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন খবর নিতে, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বিগ্নতা ও অনেকে বিভিন্ন সমস্যার বিষয় নিয়ে লিখেছেন। এই চিঠিগুলো মুক্তিযুদ্ধকে ভিন্ন আলোকে দেখতে সাহায্য করে, নতুন তথ্যও যোগায়। আনিসুজ্জামানের কাছে লেখা চিঠির বিষয় শুধু মুক্তযুদ্ধ কেন্দ্রীক নয় অবশ্যই, চিঠিগুলোতে সাহিত্যিক, গবেষক, সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষজনসহ অনেক উল্লেখযোগ্য নাম রয়েছে, যেমন, আবুল ফজল, আশুতোষ ভট্টাচার্য, রশীদ হায়দার, শঙ্খ ঘোষ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, জাহানার ইমাম, ক্লিনটন বি সিলিসহ অনেকেই। পূর্বসূরি সাহিত্যিকদের কাজকে তিনি কীভাবে দেখতেন তা তার পূর্বগামী নামে অসাধারণ প্রবন্ধের বইটিতে দেখা যায়। সাহিত্যিকরা যে তাকে হৃদয়ঘন চিঠি লিখবেন তা বলাই বাহুল্য। আমাদের আলোচ্য বইটিতে তার পরিবার ও সাংগঠনিক বিষয়-আশয় নিয়েও চিঠিপত্র রয়েছে। মোদ্দা কথা হলো একজন ব্যক্তি আনিসুজ্জামানকে যেমন এখানে পাওয়া যায় তেমনি সামাজিক, রাষ্ট্রিক দায়িত্বসম্পন্ন আনিসুজ্জামানকেও এই বইটিতে পাওয়া যায়। যা এক বিশেষ প্রাপ্তি বলা যায়।
বইয়ে চিঠিগুলো ৭ অধ্যায়ে ভাগ করা, সময়ক্রম বিবেচনায় এটা গুরুত্বপূর্ণ কেননা পাঠকেরা বুঝতে পারবেন কোন চিঠির বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষাপট কী কী। ভাগগুলো হলো, মুক্তিযুদ্ধ (৩৪টি), সাহিত্যিক-গবেষক (৪৬), বন্ধু-স্বজন (৫৮টি), পরিবার (২৩টি), বই নিয়ে (১২টি), প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন (১৫টি)। এর সঙ্গে একটি বিশেষ সংযোজন হলো স্বয়ং আনিসুজ্জামানের লেখা চিঠি, “অপ্রকাশিত চিঠি: আনিসুজ্জামানের লেখা” (২২টি)। আর এর সঙ্গে চিঠিগুলোর প্রেরকদের পরিচিতিও রয়েছে। আনিসুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধকালে তার পিতা এ টি এম মোয়াজ্জেমকে যে চিঠি লিখেছিলেন তাও যুক্ত হয়েছে। চিঠিটি পিতা-পুত্রের সম্পর্কের এক মানবিক দিক উন্মোচন করে।
বইয়ের ভূমিকায় সম্পাদক জানাচ্ছেন আনিসুজ্জামানের মৃত্যুর পর তার সহধর্মিণী সিদ্দিকা জামান ১৪টি বাক্সে এই বইয়ে প্রকাশিত চিঠিগুলো গুছিয়ে রেখেছিলেন। তিনি চিঠিগুলো যত্ন সহকারে রেখেছিলেন বলেই তা পাঠ করার সুযোগ সৃষ্টি হলো। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ড. ব্যারি এম. মরিসনের একটি চিঠির অংশভাগ দিয়ে আলোচনা শেষ করি,
“May 18, 1971
Dear anis,
Your letter from Agartala dated May 6 arrived today.
There is no way I can convey my sense of distress at the events in dacca and Chittagong. I only hope that through it all you and your family will survive and maintain good health and spirits.
On the assumption that you have moved to Calcutta I have sent a bank draft for one thousand rupees to K. L. Mukhopadhyay,…
The funds are intented for you as an initial payment for living and research expenses in Calcutta as my research associate in the study of Bengali biographies, autobiographies and memoirs.”
Barrie M. Morrison
Dept of Asian studies
University of British Columbia
Vancouver 8, S.C
Canada
ড. আনিসুজ্জামানের কাছে আসা ১৯৭১ সালের যত চিঠি প্রিয় আনিসুজ্জামান: তাঁকে লেখা চিঠিপত্র সংকলন বইটিতে স্থান পেয়েছে তাতে এমনসব বিষয় উঠে এসেছে যা গবেষকদের নতুন তথ্যের যোগান দেবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। আর দীর্ঘ সময়ের বিবেচনায় এই চিঠিগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বৈ কিছু নয়। বইটি ছড়িয়ে যাক পাঠকদের কাছে।
প্রিয় আনিসুজ্জামান: তাঁকে লেখা চিঠিপত্র
সম্পাদনা: মতিউর রহমান
বিষয়: চিঠিপত্র
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশকাল: ২০২২
মূল্য: ৬৫০ টাকা।