গল্পের মধ্যে গল্প, এরকমই বলা যায় হেনা সুলতানার নতুন কিশোর গল্পের বই ‘সাধু নরসুন্দর’কে। সহজ এক আকাশ নির্মাণ করে তার মধ্যে কৌশলে ঘনীভূত মেঘমালা সৃষ্টি করে পাঠকদের তিনি এমন এক পৃথিবীতে পৌঁছে দেন যেখানে আনন্দ, শিল্প আর জ্ঞান হাত ধরে হাঁটে। আর সাহিত্যে সহজ সংঘটন কার্যতই বড় প্রতিভার দাবী করে, কেননা সহজ করে কোনোকিছু বলা অসম্ভব কঠিন এক কাজ।
কেন্দ্রীয় চরিত্র নরসুন্দর বহুঅর্থবোধক একজন মানুষ, যাকে একটি পরিচয়ে বাঁধা যায় না, যে একজন কুশলী কথাশিল্পী কিন্তু তাকে আবার একজন শিক্ষকও বলা যায়, যে গল্পের ছলে মানুষকে নিজেকে জানার পথ বাৎলে দেয়। যার মন সর্বাবস্থায় স্থির, এর পরিচয় পাওয়া যায় যখন আমরা জানতে পারি— সে গ্রামের কে কেমন সেটা আগে থেকে জেনেই তাদের উপযোগী গল্প তৈরি করে।
বইটির মূল আখ্যানভাগ এরকম, কেন্দ্রীয় চরিত্র সাধু নরসুন্দর চুল কাটার পাশাপাশি গল্প বলাতেও দারুণ দক্ষ। সে শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ যাদেরই চুল কাটে তাদেরকে তখন গল্প শোনায়, চুল কাটা যখন শেষ গল্পও তখন শেষ। তার এই বিশেষ গুণ গ্রাম থেকে শহর ছাড়িয়ে গিয়ে শোনা যায় তার গল্প শুনতে একবার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে এসে তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন চুল কাটাবার ছল করে। তো এই পর্যায়ে গল্পের কথক আমাদের জানায় তাদের ঝন্টু মামা এ-গ্রেড নরসুন্দর ছাড়া কখনওই কাউকে নিজের চুলে হাত দিতে দেন না। এরপর নামহীন কথক বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে ঝন্টু মামাকে সাধু নরসুন্দরের কাছে চুল কাটাতে রাজী করায়। গল্প শোনার জন্যেই আদতে তিনি সম্মতি দেন, আর তার চুল কাটতে কাটতে সাধু শুরু করেন এক আশ্চর্য গল্প। তখন ঝন্টু মামার সাথে পাঠকরাও ঢুকে পড়েন সেই গল্পে। যে জাদুময় আখ্যানে চরিত্র হিসেবে আসে নিজেকে জানার জন্য এক অদ্ভুত রূপান্তরের মাঝ দিয়ে যাওয়া কাঠুরে সুখাই। বিশ্ব-মহাকাশের মাঝে বিভিন্ন রূপে নিজেকে পেয়ে একসময় সে নিজেকে জানতে পারে। আর এসব ঘটনা পরম্পরায় আমরাও চলতে শুরু করি।
কেন্দ্রীয় চরিত্র নরসুন্দর বহুঅর্থবোধক একজন মানুষ, যাকে একটি পরিচয়ে বাঁধা যায় না, যে একজন কুশলী কথাশিল্পী কিন্তু তাকে আবার একজন শিক্ষকও বলা যায়, যে গল্পের ছলে মানুষকে নিজেকে জানার পথ বাৎলে দেয়। যার মন সর্বাবস্থায় স্থির, এর পরিচয় পাওয়া যায় যখন আমরা জানতে পারি— সে গ্রামের কে কেমন সেটা আগে থেকে জেনেই তাদের উপযোগী গল্প তৈরি করে।
বইটির গল্পের গাঁথুনি এমন যে এতে সব জটিলতাই শিল্পের সহজ স্পর্শে ঐকতান গড়ে তুলেছে। বিচিত্র সব বিষয়কে আশ্চর্য প্রতিভায় লেখক এক সুতোয় গেঁথেছেন। ফলে পড়া শেষ না করে উঠা দু:সাধ্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে এর সাথে যুক্ত করা যায়, গল্পটি এক অন্তহীন সম্ভাবনাকে তার ভেতর ধরে আছে। শেষ করার পর মনে হয় সাধু নরসুন্দর যেন আরেকটি গল্প বলবে, তখন পাঠকদের নিজের মনেই সেই গল্প বলা শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় বাস্তবে লেখক পাঠকদেরই সৃষ্টশীল করে তোলেন, তারাই হয়ে ওঠে নিজেদের সাধু নরসুন্দর। দুই ভিন্ন দিক থেকে মহাভারতের আখ্যান বর্ণনার কৌশল আর সহস্র এক আরব্যরজনীর শেহেরজাদীর বুনন কৌশল ঐতিহ্যের পরম্পরায় বহন করছে বইটি। এতে এর মাঝে বৈচিত্র এবং গভীরতা শিল্পের সংশ্লেষণে নতুনত্ব যুক্ত করেছে। পাঠকদের ভালো লাগবে বইটি।
সাধু নরসুন্দর
হেনা সুলতানা
প্রকাশকাল: মার্চ, ২০২৩
প্রকাশক : আশ্রয় প্রকাশন
দাম : ১২০ টাকা।
বইটি কিনতে:
সাধু নরসুন্দর – বাহিরানা (bahirana.com)