বাহিরানা

হারুকি মুরাকামির সেরা ১০ বই


অনুবাদ: শীর্ষেন্দু ভট্টাচার্য অংশু

হারুকি মুরাকামি বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের একজন। প্রতি বছরই নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের শর্ট লিস্টে তাঁর নাম আসে। কিন্তু সাহিত্য সমালোচক ও লেখকেরা তাঁর কোন বইগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেন? ম্যাথিউ কার্ল স্ট্রেচার নিজের প্রিয় হারুকি মুরাকামির সেরা ১০ বই-এর একটি তালিকা করেছিলেন, পাবলিশার্স উইকলিতে ২০১৪ সালের ০৮আগস্টে প্রকাশিত হয়েছিল লেখাটি। তিনি মুরাকমিকে নিয়ে তিনটি বইয়ের লেখক, বইগুলো হলো, “ডান্সেস উইথ শীপ: দ্য কুয়েস্ট ফর আইডেন্টিটি ইন দ্য ফিকশন অব হারুকি মুরাকামি”, “হারুকি মুরাকামিস দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল: আ রিডার্স গাইড” এবং “দ্য ফরবিডেন ওয়ার্ল্ডস অব হারুকি মুরাকামি”। লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন শীর্ষেন্দু ভট্টাচার্য অংশু। –সাম্পাদক, সাহিত্য

হারুকি মুরাকামি একজন বিশ্ববিখ্যাত জাদুবাস্তবতাবাদী ঔপন্যাসিক। মানুষের আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রবেশ করার প্রায় জেদী এক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তার রচনাগুলি নির্মিত। তার নায়কেরা নিয়মিতই অবচেতন মনের জগৎ, স্বপ্নের রাজ্য কিংবা মৃতের দেশের মতো দার্শনিক অস্তিত্বের স্তরে প্রবেশ করে—যেখানে তারা হারানো মানুষ বা বস্তুর স্মৃতিকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে।

মুরাকামি একজন জাপানি লেখক, কিন্তু একইসাথে তিনি “বৈশ্বিক”। তার কাজে জাপানি সংস্কৃতির প্রতিফলনের চেয়ে বরং সমগ্র মানবতার প্রশ্নগুলিই প্রাধান্য পায়। ব্যক্তির স্বরূপ কী? বিশ্বায়নের যুগে “সুখ” বা “সাফল্য”-এর অর্থই বা কী? আত্মা কী, আর তা আমাদের মধ্যে আসে কীভাবে? কেন কিছু মানুষ আধুনিক সমাজের কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, এবং তাদের বিকল্প কী? মুরাকামির লেখায় এমন অসংখ্য প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, যা আমাদের সবাইকে প্রভাবিত করে।

আমার নিজের প্রিয় বইগুলো বেছে নেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ “অন্তর্গত অনুভূতি” থেকে; এই রচনাগুলো আমাকে পাঠক হিসেবে জাগিয়ে তুলেছে, আমার মনের গভীরে ইতোমধ্যেই চলতে থাকা বস্তুগুলোর সঙ্গে কথা বলেছে, হয়তো শুধুমাত্র অবচেতভাবেই। কিছু বই অত্যন্ত বিনোদনমূলক, আবার কিছু কেবলই গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সবকিছুই যেন আত্মপরিচয়ের এক চিরন্তন প্রাসঙ্গিক ধারার সঙ্গে জড়িত— এর গঠন ও এর সংরক্ষণসহ।

হারুকি মুরাকামি “অ্যা ওয়াইল্ড শিপ চেইজ” এর প্রচ্ছদ।
অ্যা ওয়াইল্ড শিপ চেইজ, ছবি: গুডরিডস

১. অ্যা ওয়াইল্ড শীপ চেইস—এই উপন্যাসের মূল শিরোনাম হলো “ভেড়া নিয়ে একটি অ্যাডভেঞ্চার”, এবং এটি এই নামের যথার্থতা রক্ষা করেছে। এতে মুরাকামির নায়ক একটি রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক-শিল্পজগতের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যাদের অর্থ ও ক্ষমতা অসীম বলে মনে হয়। আর সে এগুলো করে নিজের শর্তে। উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলির কিছু ঘটেছে হোক্কাইদোর প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যাকে কখনো নায়কের অন্তর্গত মন আর কখনো মৃতদের পৌরাণিক ভূমি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মুরাকামির অনেক উপন্যাসের মতো, এটির মূলেও রয়েছে ব্যক্তির ইচ্ছা এবং নৈর্ব্যক্তিক রাষ্ট্রের দাবির মধ্যে দ্বন্দ্বের গল্প। আর হ্যাঁ, এখানে একটি অসাধারণ, সর্বশক্তিমান ভেড়াও আছে!

হারুকি মুরাকামির “দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল” বইয়ের প্রচ্ছদ।
দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল, ছবি: গুডরিডস

২. দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল—এই উপন্যাসেও একটি “অন্য বিশ্ব”-এর উপস্থিতি রয়েছে, যেটি এখানে একটি জটিল গঠনের হোটেলের রূপ নিয়েছে। এই হোটেলে নায়কের স্ত্রী কুমিকোকে তার দুশ্চরিত্র ভাই ওয়াতায়া নোবোরু বন্দী করে রেখেছে। নায়ক, ওকাডা তোরু, একজন নম্র-স্বভাবের বেকার গৃহস্থালি-স্বামী, যাকে এই আধিভৌতিক গোলকধাঁধায় প্রবেশ করে নোবোরুর মুখোমুখি হতে হবে এবং কুমিকোকে উদ্ধার করতে হবে। এছাড়াও, তাকে সময়ের কুণ্ডলীময় স্প্রিংগুলোর শক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার সেই বিশৃঙ্খল মুহূর্তগুলোর সম্মুখীন হতে হয়, এবং যখন বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগ একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই উপন্যাসটি যৌনতা, সহিংসতা, এবং সমষ্টিগত স্মৃতি হারানো ও পুনরুদ্ধারের একটি গবেষণা।

হারুকি মুরাকামির “হার্ড-বয়েলড ওন্ডারল্যান্ড এন্ড দ্য ইন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড” বইয়ের প্রচ্ছদ।
হার্ড-বয়েলড ওন্ডারল্যান্ড অ্যান্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড, ছবি: গুডরিডস

৩. হার্ড-বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যান্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড—গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস আর এইচ. জি. ওয়েলস যদি একসাথে কোনো উপন্যাস লিখতেন, সেটা হয়তো এমনই হতো। এই উপন্যাসের দুটি সমান্তরাল আখ্যানে, একদিকে চিত্রিত হয়েছে ভবিষ্যৎঘেঁষা টোকিওর নিষ্ঠুর রাস্তাগুলো, যেখানে তথ্য যুদ্ধে প্রকৃত রক্তপাত ঘটছে; অন্যদিকে গ্রামের ফ্যান্টাসি ঘিরে গড়ে উঠা এক শহর, যার চারপাশ ঘিরে আছে এক বিশাল, নিখুঁত প্রাচীর, যেখানে বাস করে ছায়াহীন মানুষ, এক ভয়ঙ্কর দ্বাররক্ষী, আর ইউনিকর্নের দল। শেষমেশ, নায়ককে তার চিরস্থায়ী বাসভূমি বেছে নিতে হয় এই দুই জগতের মধ্যে।

হারুকি মুরাকামির “১কিউ৮৪” বইয়ের প্রচ্ছদ।
১কিউ৮৪, ছবি: গুডরিডস

৪. ১কিউ৮৪—মুরাকামি প্রথমবার ধর্মীয় সংগঠন নিয়ে লেখার ঝুঁকি নিয়েছেন এই উপন্যাসে—১৯৯৫ সালের অওম শিনরিকিও সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে জাপানের জন্য এটি এক অতিসংবেদনশীল বিষয়। কাল্পনিক ধর্মীয় গোষ্ঠী “সাকিগাকে” যখন “লিটল পিপল” নামক পৃথিবীর আত্মাদের সাথে পুনঃসংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে, তখন উপন্যাসের মূল কাহিনী এগিয়ে চলে দুই আত্মীয়-আত্মার মিলন ঘটানোর লক্ষ্যে: একজন ফিটনেস প্রশিক্ষক, যিনি গোপনে অত্যাচারী পুরুষদের গুপ্তহত্যাকারী হিসেবে কাজ করেন; আরেকজন গণিত প্রতিভা, যিনি পার্টটাইম কপিরাইটার হিসেবে জীবন কাটান। মুরাকামি’র অন্যান্য উপন্যাসের মতোই, এখানেও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শের সঙ্গে ব্যক্তির অন্তরাত্মার দ্বন্দ্বকে গভীরভাবে উন্মোচিত করা হয়েছে।

হারুকি মুরাকামির “কালারলেস সুকুরু তাজাকি” বইয়ের প্রচ্ছদ।
কালারলেস সুকুরু তাজাকি, ছবি: গুডরিডস

৫. কালারলেস সুকুরু তাজাকি অ্যান্ড হিজ ইয়ার্স অব পিলগ্রিমেজ—এই গল্পের বেশিরভাগ অংশজুড়ে সুকুরু তাজাকি বুঝতে চেষ্টা করে, হাইস্কুলের তার বন্ধুদের দলটি কেন তাকে গ্রুপ থেকে বহিষ্কার করেছিল, টোকিওতে কলেজে পড়তে নাগোয়া ছেড়ে যাওয়ার অল্প পরেই। বোঝার এই অনুসন্ধানে সে পৌঁছে যায় ফিনল্যান্ডে, যেখানে সে নিজের অন্তর্গত সত্ত্বা সম্পর্কে কিছু কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয়। এটা বিশ্বাসঘাতকতা আর ক্ষমার উপন্যাস, তবে সবচেয়ে বেশি, এটি বেড়ে ওঠার গল্প।

হারুকি মুরাকামির “কাফকা অন দ্য শোর” বইয়ের প্রচ্ছদ।
কাফকা অন দ্য শোর, ছবি: গুডরিডস

৬. কাফকা অন দ্য শোর—নিঃসন্দেহে মুরাকামির সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর উপন্যাসগুলির মধ্যে একটি। এটাতে তিনটি প্রধান চরিত্র, প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ভয়াবহ মানসিক আঘাতে ভুগছে, যা তাদেরকে পান্ডোরার বাক্সের মতো “গেটওয়ে স্টোন” উন্মোচন করে “অন্য জগতে” প্রবেশ করাতে পরিচালিত করছে। তাদের মধ্যে দুজন ফিরে আসে আধা-মানুষ হয়ে; তিনজনের মধ্যে কনিষ্ঠজন কাফকা, আধিবিদ্যক বনের গোলকধাঁধার মুখোমুখি হয়, “বিশ্বের শক্তিশালীতম পনেরো বছরের ছেলে” হওয়ার দৃঢ় সংকল্পে। উপন্যাসের মূল বার্তা মনে হয় এই যে, আমরা যদি ভাগ্য বদলানো না-ও পারি, অন্তত আমরা তাকে নিজেদের সুবিধায় কাজে লাগাতে পারি।

হারুকি মুরাকামির “হিয়ার দ্য উইন্ড সিং” বইয়ের প্রচ্ছদ।
হিয়ার দ্য উইন্ড সিং, ছবি: গুডরিডস

৭. হিয়ার দ্য উইন্ড সিং—এটি মুরাকামির প্রথম উপন্যাস, এবং এর প্লটের যা দুর্বলতা আছে সেটা সে পুষিয়ে দেয় লেখার অভিনব শৈলী দিয়ে—দ্রুতগতিসম্পন্ন, লঘুভার, অনাড়ম্বর। এর নায়ক, যাকে আমরা শুধুমাত্র “বোকু” (একবচন, প্রথম পুরুষ) নামে জানি, “র‌্যাট” নামে তার এক বেস্ট ফ্রেন্ডের কোম্পানিতে যোগ দেয় আবার বেরিয়ে যায়, এক দয়ালু চীনা বারটেন্ডার “জে.,” এবং নয় আঙুলের এক মেয়ে, যার কাঁধে এক বিশাল রাগের আছর রয়েছে, এর সাথে সময় কাটায়। সে সব সময় বুঝতে চেষ্টা করে, কীভাবে তার যৌবন আর আদর্শবাদ হারিয়ে গেল। নোট: “হিয়ার দ্য উইন্ড সিং” এবং “পিনবল, ১৯৭৩” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একসাথে “উইন্ড/পিনবল” নামে প্রকাশিত হয়েছে।

হারুকি মুরাকামির “পিনবল, ১৯৭৩” বইয়ের প্রচ্ছদ।
পিনবল, ১৯৭৩, ছবি: গুডরিডস

৮. পিনবল, ১৯৭৩ —“হিয়ার দ্য উইন্ড সিং”-এ হারিয়ে ফেলা এবং নস্টালজিয়ার থিমকে অব্যাহত রেখে, এই সিক্যুয়েলে পিছন ফিরে পর্যালোচনা করা হয় নামবিহীন নায়কের সাথে নাওকোর সম্পর্ককে, যে তার কলেজ জীবনে আত্মহত্যা করেছিল। অন্ধকার বিষয়বস্তু সত্ত্বেও, উপন্যাসটি হাস্যরস সৃষ্টি করে নামবিহীন যমজদের মাধ্যমে, যারা প্রায় শূন্য থেকেই আবির্ভূত হয় বোকুর শোক এবং একাকীত্বের অনুভূতি মোকাবিলায় সাহায্য করতে। এই কাজটি শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছায় নাওকোর সময়ের বোকুর প্রিয় পিনবল মেশিন “থ্রি-ফ্লিপার্ড স্পেসশিপ”-এর অনুসন্ধানে, এবং নাওকোর স্মৃতির সাথে একধরনের মীমাংসায়।

হারুকি মুরাকামির “নরওয়েজিয়ান উড” বইয়ের প্রচ্ছদ।
নরওয়েজিয়ান উড, ছবি: গুডরিডস

৯. নরওয়েজিয়ান উড—আরেকটি “নাওকো”—নাকি একই নাওকো?—এই উপন্যাসের কেন্দ্রে অবস্থিত, যেখানে ওয়াতানাবে তোরুর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এক তরুণীর সাথে ট্র্যাজিক সম্পর্ককে পিছন ফিরে দেখা হয়, যে “কিজুকি”-র কণ্ঠ শুনতে পায়—তার মৃত প্রেমিক ও আত্মার সঙ্গী—তাকে “অন্য জগৎ” থেকে ডাকছে। তোরু গল্পের একটি অংশজুড়ে এই কণ্ঠকে অনুসরণ করতে তাকে বাধা দিতে চেষ্টা করে, এবং অন্য অংশজুড়ে তার “মিদোরি”-র প্রতি আকাঙ্ক্ষার সাথে সংগ্রাম করে, যে উপন্যাসের অত্যুজ্জ্বল “অন্য নারী”।

হারুকি মুরাকামির “ডান্স, ডান্স, ডান্স” বইয়ের প্রচ্ছদ।
ডান্স, ডান্স, ডান্স, ছবি: গুডরিডস

১০. ড্যান্স ড্যান্স ড্যান্স—সব সমালোচক উপন্যাসটি পছন্দ করেননি; কেউ কেউ বলেছেন এটি কিছুটা ধীরগতির। আমার মতো পাঠকদের জন্য, যারা “জাপান, ইনকর্পোরেটেড”-এর অর্থনৈতিক ঘটনার সামাজিক বিশ্লেষণে আগ্রহী, এই কাজটি “উন্নত পুঁজিবাদ”-কে জেরা করে, এর প্রবণতাকে তুলে ধরে যে এটি যেকোনো কিছুকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করতে পারে—এমনকি পরিবার ও বন্ধুত্বের মতো মৌলিক মানবিক সম্পর্ককেও। যারা “এ ওয়াইল্ড শীপ চেইস”-এর এডভেঞ্চার পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই সিক্যুয়েলটি “কিকি”-র সন্ধানকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে, বোকুর শ্রবনেন্দ্রীয় মডেল প্রেমিকা, যে পূর্বের কাজের শেষের দিকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

 

(Visited 35 times, 1 visits today)

Leave a Comment