বাহিরানা

বদরুদ্দীন উমরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক: বাংলাদেশের রাজনীতিতে কৃষকদের ভূমিকা

বদরুদ্দীন উমরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক বই রিভিউয়ের প্রচ্ছদ

বদরুদ্দীন উমরের পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (প্রথম খণ্ড) যুদ্ধপূর্ব বাঙলাদেশ বই দুটিতে ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কৃষকশ্রেণী ও তেভাগা আন্দোলনের ভূমিকার বিষয়ে বিশেষ আলোকপাত ছিল। বুর্জোয়া রাজনীতি ক্ষণে ক্ষণে কিভাবে কৃষকদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, নিজেদের শ্রেণীস্বার্থে কিভাবে কৃষকদের ব্যবহার করেছে তার নজির তার লেখায় পাওয়া যায়। আমরা নিজেরা যদি দেখি, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটব্যাংক কোথায় থাকে? আর ফেসবুক, পত্রিকা, বুদ্ধিজীবীদের দেশ, অর্থনীতি নিয়ে শত আলাপ—কোনো কিছুই সেই ভোট ব্যাংক নষ্ট করতে পারে না কেন? উত্তরটি লুকিয়ে আছে একটি শ্রেণীর কাছে, সেই শ্রেণীটি বাংলাদেশের কৃষকশ্রেণী। কারণ এই ভোটব্যাংক থাকে বাংলাদেশের গ্রামগুলোয়, বাংলাদেশের ভোটের সবচেয়ে বড় অংশ এই কৃষকশ্রেণী। যাদের শ্রেণীস্বার্থ, বিচার-বিবেচনা, বিশ্বাস—এসব যে দলগুলোর সাথে যায় তাদেরকেই তারা ভোট দেয়, অন্য কোনো দিকে প্রভাবিত না হয়ে। আরেকটি বিষয় হলো সামন্ত ব্যবস্থায় যেমন কর্মব্যবস্থা ছিল স্থির নির্দিষ্ট—যেমন কৃষক, কামার, কুমার, ব্যবসায়ী—বর্তমান সময়েও কৃষকরা সেই একই কর্মব্যবস্থায় বাস করছে। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় পরিবারের কর্তার পছন্দের দলকেই পুরো পরিবার ভোট দেয়। এও এক সামন্ত ব্যবস্থার অবশেষ, যা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের রাজনৈতিক দল পছন্দের ক্ষেত্রে দেখা যায়, আবার দলগুলোর পরিবারতন্ত্রও বহুল আলোচিত, এও সামন্ত ব্যবস্থার জমিদার প্রথার বিশেষ করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার অবশেষ। বাংলাদেশে যদিও একই পরিবারে আওয়ামি-বিপনপির সমর্থক দেখা গেছে অতীতে। কিন্তু শেখ হাসিনা ভোট ব্যবস্থাটাকেই ক্ষতিগ্রস্থ করায় বর্তমানে কী পরিস্থিতি চলছে গ্রামে, বিশেষ করে ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্বের আগের-পরের ব্যক্তিপছন্দের রাজনৈতিক সহবস্থানের অবস্থাটি নিয়ে সম্পূর্ণ তথ্য এখনও আমাদের হাতে নেই।

১৯৪৬ সালে বাংলাদেশের ১৯টি জেলায় হয়েছিল তেভাগার আন্দোলন, এই আন্দোলন বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের পথচলাটিই। কারণ আন্দোলনটিতে ১৭৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ-এর ভুল ত্রুটিগুলো কাটিয়ে সফল এক সংগ্রামের নিশানা ছিল, যারা রেশ বাংলাদেশের পরবর্তী সব আন্দোলনে লেগেছিল, তাই তেভাগার গভীর পাঠ প্রয়োজন।

তবে, বাংলাদেশের রাজনীতিকে বুঝতে হলে বদরুদ্দীন উমরের কাছে ফিরতে হয় বারেবারে। এই যে, এই দলগুলোর নেতাদের শ্রেণীস্বার্থ ও কৃষকদের শ্রেণীস্বার্থ কী এক? না এক নয়, এ মার্ক্সীয় মতই, তবে বদরুদ্দীন উমর কৌশলে আমাদের দেখান, যে দল কৃষকদের মনের যত গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছে, বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি করতে পেরেছে তারাই কৃষকদের সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন হয়ে ক্ষমতায় বসেছে। যদিও বদরুদ্দীন উমরের মতে কৃষকদের শ্রেণীস্বার্থ পুরোপুরি দেখতে পারবে এরকম দল বাংলাদেশে নেই, বামপন্থীরা দেশভাগের পূর্বে কৃষকসভা দিয়ে যেভাবে সামন্ত জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সচেতন করে নিজেদের শ্রেণীস্বার্থের অনুকূল করেছিল, সেই কৃষকসভা ৪৭ পরবর্তী সময়ে সেরকম পারেনি। তবু বাংলাদেশের কৃষকদের সবচে বড় ও ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে বামপন্থীদের অবদান অনস্বীকার্য। এই তেভাগা আন্দোলন ১৯৭১ এর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকেও সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের কৃষকদের ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বিবেচনার পরই কেবল বাংলাদেশের উন্নতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংবাদ মাধ্যম, মধ্যবিত্ত শ্রেণী, পুঁজিপতি শ্রেণীর হালচাল অনুধাবন ও এরপর দেশের অগ্রগতির বিষয়ে কোনো ফলপ্রসূ পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে। এ ঐতিহাসিক সত্য। বদরুদ্দীন উমরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক (১৯৭২) বইটি কৃষকদের সেই ঐতিহাসিক পরিস্থিতিরই আদ্যোপান্ত তুলে ধরে। বইটি আমাদের সামনে বৃটিশ আমল ও সাম্প্রতিক বাংলাদেশের মাঝে একটি সেতুবন্ধ তৈরি করে দেয়, যা দিয়ে অতীতকে বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।

কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কী? এটা না বুঝলে কৃষকদের প্রকৃত ইতিহাস বোঝা অসম্ভব। বইটিতে বদরুদ্দীন উমর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিষয়টি বোঝাতে বলেছেন,

“পূর্ববর্তী ব্যবস্থা অনুযায়ী জমিদাররা ছিলো সরকারের এবং কোম্পানীর রাজস্ব আদায়কারী এজেন্ট। জমিতে তাদের কোন দখলীস্বত্ব ছিলো না। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে তাদেরকে জমির মালিক ও স্বত্বাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এজেন্ট হিসেবে পূর্বে তারা স্বাধীন কৃষকদের থেকে রাজস্ব আদায় করতো। কিন্তু এরপর তারা অধীনস্থ প্রজাদের থেকে কর আদায়ের অধিকারী হলো।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনুযায়ী স্থির হয় যে, জমিদাররা আদায়কৃত রাজস্বের নয়-দশমাংশ কোম্পানীর কাছে হস্তান্তরিত করবে। এই হিসাব মতো একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক জমিদারদের দেয় রূপে নির্দিষ্ট রাজস্ব কোম্পানীর ঘরে জমা দিলে বংশানুক্রমে জমিদাররা জমির স্বত্বাধিকারী থাকবেন এবং ভবিষ্যতে জমির মূল্য যাই হোক তাতে তাঁদের সাথে কোম্পানীর বন্দোবস্তের কোন পরিবর্তন হবে না। সে বন্দোবস্ত অপরিবর্তনীয় এবং চিরস্থায়ী।” (চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক, বদরুদ্দীন উমর)

এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থাই কিন্তু সরাসরি তেভাগা আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। এই বন্দোবস্তে কৃষকরা এমন এক ব্যবস্থার ফাঁদে পড়েছিল যে, তখন তাদের একদিকে জমিদারের অত্যধিক শোষণ—যার ফলে মহাজনের ঋণ ও তা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে জমি হারানো—দেখা গেছে এই মহাজন ও জোতদার একই ব্যক্তি—অন্যদিকে জমিদার-জোতদারদের থেকে তার পালানোর বা বাঁচারও কোনো উপায় ছিল না, কারণ কৃষকদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ভোট দানের ক্ষমতাই ছিল না। কারণ ১৯৩৫ সালে ম্যাকডোনাল্ডের ভারত শাসন আইনের হাত ধরে ৬ আনা কর দেওয়া কৃষকদের ভোটদানের অধিকার আসার আগ পর্যন্ত কৃষকরা ভোট দিতে পারত না। পরে সংবিধানে সব প্রাপ্তবয়স্ক কৃষকদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। ফলে এর আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের নিয়ে নিস্পৃহ ছিল। বদরুদ্দীন উমর তথ্য দিচ্ছেন যে, তেভাগা আন্দোলনের সময় বাংলা প্রদেশে জমিদারদের সংখ্যা ছিল ২০০০ হাজার ও জোতদারদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লক্ষ। কৃষকদের মধ্যে ছিল স্বল্পজমির অল্পসংখ্যক কিছু কৃষক ও বাকি সবাই ভাগচাষী ও ভূমিদাস পর্যায়ের। এ এক নারকীয় পরিস্থিতি ছিল বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য।

কিন্তু কৃষকদের এই নারকীয় অবস্থার পরিবর্তন—তেভাগা আন্দোলনের কারণে—যার ফলে শুধু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তই নয় বরং চিরতরে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ হয়। তবে এই ঐতিহাসিক পর্বটি বুঝতে তখনকার রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, বিশেষ করে জমিদার ও কৃষকদের পক্ষে-বিপক্ষে তাদের কী অবস্থান ছিল তা বোঝা জরুরী। আবার রাজনৈতিকা দল মুসলিম লীগের সামন্তবাদী অংশ ও প্রগতিশীল অংশেষ ভূমিকা বোঝাও দরকারী, এর সঙ্গে এ কে ফজলুল হক, মৌলানা ভাসানীর ভূমিকাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরস্পর সম্পর্কিত পক্ষগুলোর ভূমিকা বুঝতে বদরুদ্দীন উমরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক বইটি থেকে একটি সংক্ষিপ্তসার তৈরি করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথমে অধ্যায়গুলোর নাম দেখে নেওয়া কাজের হবে, তিনটি মূল অধ্যায়ে বইটি অবয়ব পেয়েছে, যথা, “প্রথম পরিচ্ছেদ: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত”, “দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: তেভাগার লড়াই”, “তৃতীয় পরিচ্ছেদ: মুসলিম লীগ সরকারের জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ বিল”, “পরিশিষ্ট” ও “তথ্যনির্দেশ”। এই হলো সামগ্রিক ইতিহাসের দুইমলাটের ভেতর গ্রন্থনা শিরোনাম।

তো এবার দেখা যাক সংক্ষিপ্তসারটি, প্রথমে নবাবী আমল যখন কৃষকদের উপর জমিদারদের অত্যাচার ছিল না, কারণ তাদের জমির দখলি স্বত্ব ছিল না, তারা শুধু সরকারের হয়ে খাজনা আদায় করত, জমি ছিল কৃষকের হাতে। এরপর কৃষকনিগ্রহের যুগ ও নতুন সামন্ত ব্যবস্থা যা ব্রিটিশ সময়পর্বে তৈরি হয়, তখনই জমির মালিকানা কোম্পানি কর্তৃক জমিদারদের হতে চলে যায়, যার নাম হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এবং ব্রিটিশদের দেওয়ানি প্রাপ্তির শুরুতেই কোম্পানির ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির ফলে হয় ছিয়াত্তরের ভয়াবহ মনন্তর বা দুর্ভিক্ষ। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে একসময় এই কৃষকনিগ্রহ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে গ্রামের বেশির ভাগ কৃষক শুধুমাত্র ভূমিদাসে পরিণত হয়। কারণ জমিদার ও জোতদাররা ফসলের কোনো ব্যয় বহন না করেই দুই ভাগ ফসল নিয়ে যেত, বিপরীতে ফসলের যাবতীয় খরচ কৃষক বহন করেও পেত মাত্র একভাগ ফসল। এবং তারই ফলে একসময় ফসলের তিনভাগের দাবীতে হয় জমিদার, জোতদারদের বিরুদ্ধে তেভাগা আন্দোলন। তাই এই সমান্তদের সঙ্গে কৃষকদের সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে হবে, এরপর আসবে কৃষকদের সঙ্গে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সম্পর্ক।

বাংলাদেশের সামন্তদের মানে জমিদারদের অধিকাংশই বর্ণহিন্দু ও প্রজা কৃষকদের অধিকাংশই মুসলমান, আর এই বর্ণহিন্দুদের সমর্থনপ্রাপ্ত দল কংগেস, যারা তাই শ্রেণীস্বার্থের কারণেই কৃষকদের চেয়ে জমিদারদের পক্ষ নিয়েছে বেশি। আর অন্যদিকে মুসলিম লীগ, যে দলে সামন্তদের সংখ্যাও কম নয়। তবে মুসলিম লীগের একটি প্রগতিশীল অংশও ছিল সেখানে আবুল মনসুর আহমদের মতো কৃষকদের প্রতি মমত্বপ্রবণ রাজনীতিকও ছিলেন, তেভাগা আন্দোলনের এক পর্যায়ে মুসলিম লীগ যখন জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের সময় ফ্লাউড কমিশনের জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করে তখন মুসলিম লীগের জমিদারপ্রীতি নিয়ে তখনকার মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ মিল্লাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা লেখেন। সম্পাদকীয় রচনাসহ মুসলিম লীগের ‘জমিদারী ও প্রজাস্বত্ব বিল’ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখা প্রকাশে মিল্লাত পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বই থেকে তুলে ধরছি,

“১০ই জানুয়ারী, ১৯৪৭ ‘জনগণের দাবী’ নামে মিল্লাত-এর অন্য একটি সম্পাদকীয়তে জমিদারদের প্রতি মুসলিম লীগ সরকারের পক্ষপাতিত্ব সম্পর্কে বলা হয়:

সুতরাং খেসারত দেওয়া সম্পর্কে আজ আর নূতন কিছু না বলিয়া শুধু এই কথাটা বলিতে চাই যে, খেসারত দিয়া সরকার জমিদারগণকে শিল্পপতিতে রূপান্তরিত করার যে মতলব করিতেছেন দেশবাসী তাহা কিছুতেই সমর্থনযোগ্য বলিয়া মনে করে না।

পরবর্তী ৩রা ফেব্রুয়ারীতে যে বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা সেই অধিবেশনেই জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ বিলকে আইনে পরিণত না করে সেটিকে পরীক্ষার জন্যে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর সম্ভাব্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও সম্পাদকীয়টিতে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

শুধু সম্পাদকীয় স্তম্ভেই নয়, মিল্লাত-এ প্রকাশিত অন্যান্য প্রবন্ধের মাধ্যমেও বিনা খেসারতে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের যৌক্তিকতা দিয়ে নানা বক্তব্য উপস্থিত করা হয়। এই সমস্ত প্ৰবন্ধ লেখকদের মধ্যে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের তৎকালীন প্রচার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ অন্যতম।

‘জমিদারী প্রথা তুলিয়া দিতে আবার ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন কেন?’ নামক প্রবন্ধে খেসারতের অযৌক্তিকতা সম্পর্কে তিনি একটা তথ্যপূর্ণ আলোচনা করেন।” (ঐ)

ফ্লাউড কমিশনের প্রস্তাব মেনে মুসলিম লীগ জমিদারদের কাছ থেকে ‍জমিদারি ক্রয় করার বিল পেশ করেছিল, তাও বহু চড়া দামে। এই জমিদাররা যেন ক্ষতিপূরণে প্রাপ্ত অর্থ শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ করে তার জন্যই এই ক্রয়, এই যুক্তি দিয়েছিল মুসলিম লীগ। কিন্তু আবুল মনসুর আহমদসহ অন্যরা সেই ক্রয়ের অসারতা ও অযৌক্তিকতা নিয়ে লিখেছিলেন। তাদের কথা হলো যেখানে উচ্ছেদ করা উচিৎ সেখানে ক্ষতিপূরণসহ ক্রয় কেন? এ প্রশ্ন শুধু তাদেরই না আদতে সবারই।
তেভাগা আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিক ঐক্য যেমন হয়েছিল তেমনি কৃষকদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরিরও চেষ্টা করা হয়েছে, যেন কৃষকদের ঐক্য ভেঙে পড়ে।

“তেভাগার লড়াই ছিলো হিন্দু-মুসলমান জমিদার-জোতদারের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান ভাগচাষী এবং অন্যান্য নিপীড়িত কৃষকদের মিলিত সংগ্রাম। কিন্তু কৃষকদের এই মিলিত সংগ্রামের যারা শত্রু সেই জমিদার-জোতদাররা কৃষকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির নানা চক্রান্তের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতাকে একটা প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছিলো। বাঙলাদেশে কৃষক সমাজের সামাজিক বিন্যাসই জমিদার, জোতদার, পুলিশ, আমলা প্রভৃতিকে এই অস্ত্র ব্যবহারের অনেকখানি সুযোগ করে দিয়েছিলো।” (তেভাগার লড়াইয়ে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক)

উমরের এই বক্তব্যের সত্যতা কী এখনও ভারত ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে না?

১৯৪৬ সালে বাংলাদেশের ১৯টি জেলায় হয়েছিল তেভাগার আন্দোলন, এই আন্দোলন বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের পথচলাটিই। কারণ আন্দোলনটিতে ১৭৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ-এর ভুল ত্রুটিগুলো কাটিয়ে সফল এক সংগ্রামের নিশানা ছিল, যারা রেশ বাংলাদেশের পরবর্তী সব আন্দোলনে লেগেছিল, তাই তেভাগার গভীর পাঠ প্রয়োজন। আমাদের আলোচনাটিতে তেভাগা আন্দোলন নিয়ে একটু বেশি বলা হয়েছে অন্যসব বিষয়ের তুলনায়, কিন্তু একটু গভীরে গেলেই দেখবেন নবাবী আমলের উন্নত অবস্থা থেকে কৃষকরা যখনই ব্রিটিশ আমলের মনুফাখেকো মনোবৃত্তির জালে বন্দী হলো এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কবলে পড়লো তার উত্তরণ ঘটলো এই আপোষহীন তেভাগা আন্দোলনে। তাই আন্দোলনটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি মধ্যবিন্দু, যার পূর্বে ও পরে—ইতিহাস আর একইরকম থাকেনি।

কংগ্রেস জমিদারদের পক্ষ নিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস থেকে, মুসলিম লীগের জমিদার প্রীতিও স্পষ্ট হয়েছিল ক্ষতিপূরণ দিয়ে জমি ক্রয়ে, যদিও তারা কৃষকদের দুর্দশার কথা বলেই ভোট পেয়েছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে জমিদারদেরই লাভ দিয়েছিল তারা। এখানে আসবে মুসলিম লীগের আগে কৃষকদের দুর্দশার কথা বলে কৃষক প্রজা পার্টি করে কৃষকদের ভোটে পাশ করে তাদের কোনো উপকার না করা একে ফজলুল হকের কথাও। আবার আসবে কৃষক বান্ধব রাজনীতি করা মৌলানা ভাসানীর কথা, যার সততা ও কৃষকদের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ব প্রবাদসিদ্ধ। মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের কথাও বাদ দেওয়া যাবে না কারণ তারা জমিদারদের প্রতিভাজনদের বিপরীত অবস্থান নিয়েছিলেন। মুসলিম লীগের একটি অংশই আওয়ামি লীগ (Awami League) গঠন করে। আবার বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি (BNP)র সব ভোটবাক্সের অধিকাংশই কিন্তু পূর্ণ করে এই কৃষকরাই।

তো একটি বিষয় কী দেখা যাচ্ছে? যে, কৃষকরাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভাগ্যনিয়ন্তা, কৃষকরা যেদিকে বাংলাদেশও সেদিকে হেলে থাকে। বদরুদ্দীন উমরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক আমাদের এই বিষয়টিই ধরিয়ে দেয় ইতিহাসের সুতোয়। আমাদের চিন্তার ধারাক্রমের কুয়াশা সরিয়ে প্রকৃত বাংলাদেশকে দেখতে সাহায্য করে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক
লেখক: বদরুদ্দীন উমর
প্রথম প্রকাশ: ১৯৭২ সাল।


মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত লেখাগুলো

বাহিরানায় জনপ্রিয়

বাহিরানায় বিভাগসমূহ