মহারাজ হর্ষবর্ধন উত্তরাপথের সম্রাট হয়েছিলেন। উত্তরাপথ হচ্ছে ভারতের সমতলভূমি, পাহাড়হীন পঞ্চনদীর দেশ, যার মাঝে রয়েছে বর্তমান পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও এর আশেপাশের নগরগুলো, মানে উত্তর ভারত। ভারতভূভাগের অধিবাসীরা নিজেদের ইতিহাস না লেখার জন্য বিখ্যাত, ইউরোপ যেমন তাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইতিহাস লিখে রেখেছে, আরব সভ্যতায় যেমন ইবনে খালদুনের মতো জগৎখ্যাত ইতিহাসবিদ রয়েছেন—ভারতবর্ষ তার বিপরীত। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমন রয়েছে, তা হলো বাণভট্টের হর্ষচরিত। তবে একটি বিপত্তিও রয়েছে, প্রমথ চৌধুরীর হর্ষচরিত নামে একটি অসাধারণ প্রবন্ধে সেই বিপত্তির কথা সবিস্তারে জানতে পারা যায়, তা হলো, পণ্ডিতদের মতে এমনকি বিদ্যাসাগর—যিনি ১৯৩৯ সালে প্রথম হর্ষচরিত বাংলায় প্রকাশ করেন তারও বিবেচনায় এই বইটির পাঠ খুবই দুঃসাধ্য। কিন্তু প্রমথ চৌধুরীই আশার কথা জানিয়েছেন আমাদের, যে, “বাণভট্ট কাজের কথা অতি সংক্ষেপে সহজবোধ্য সংস্কৃত ভাষাতেই বলেন।” (হর্ষচরিত, প্রমথ চৌধুরী)। সেই বাণভট্টের হর্ষচরিত বইয়ের পদ্যে কাজের কথাগুলোরই অসাধারণ বাংলা গদ্য-পদ্যে অনুবাদ করেছেন প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর তার হর্ষচরিত বইটিতে।
বাণভট্ট সংস্কৃত সাহিত্যে প্রণম্য, তার উৎকর্ষতার ছাপ হর্ষচরিত’তে প্রবলভারে পাওয়া যায়। আর প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুরও বাণভট্টের হর্ষচরিত বাংলায় অসাধারণ অনুবাদ করেছেন। মাঝে মাঝে টানা গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে অনুবাদ করেছেন তিনি। এই গঠনকাঠামোর কারণে এর কাহিনিবিন্যাস বুঝতে সুবিধা হয়। আরেকটি বিষয় বিদ্যাসাগর ও প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর-এর মতে বাণভট্টের হর্ষচরিত গদ্যে লেখা, কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর মতে জীবনচরিতটি লেখা পদ্যে।
হর্ষবর্ধনের বিষয়ে বাণভট্টের বাইরে আরেকজন লিখেছিলেন, তিনি প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক হিউয়েন সাং। আর এরপর হাজার বছরের ব্যবধানে হর্ষবর্ধনকে নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য বই, প্রথমত ইংরেজি ভাষায়। কিন্তু এতসবের মধ্যে বাণভট্টের কাব্যটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে, তা এই কারণে যে, এটি কবিতা। আর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তিনি দিগ্বিজয়ী সম্রাট হর্ষবর্ধনের পুরো জীবনটি তুলে আনেননি কাব্যটিতে, তার কাব্যে এই সম্রাটের শুধু বাল্যের কথা রয়েছে। ভারতবর্ষে সুদীর্ঘকাল মুসলমান শাসকরা শাসন করেছেন, হর্ষ ছিলেন ভারতের মুসলিম শাসনের পূর্বের দিগ্বিজয়ী ও পরাক্রমশালী শাসকদের মধ্যে অন্যতম যার বিষয়ে অনেকটাই সবিস্তারে জানা যায়। আরেকজন সম্রাট অশোক, কিন্তু অশোকের বিষয়ে জানা হর্ষের মতো এতো বিস্তারিত নয়। এর মূলে বাণভট্টের হর্ষচরিত ও হিউয়েন সাং-এর হর্ষবর্ধনকে নিয়ে ইতিহাস বইয়ের অবদান রয়েছে অনেক। তাই হর্ষচরিতের একটি ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে তা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু হর্ষবর্ধনের আবাস কোথায় ছিল, তিনি কে ছিলেন, কী তাকে পরাক্রমশালী ও দিগ্বিজয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা না জানলে বাণভট্টের কবিতাটির পুরো রস গ্রহণ করা অসম্ভব হবে না ঠিকই তবে পরিমাণ কমে যাবে। হর্ষবর্ধনের জীবনীর সংক্ষিপ্তসার জানতে প্রমথ চৌধুরীর লেখা থেকেই উদ্ধ্বৃত করি,
“পুরাকালে ভারতবর্ষে শ্রীকন্ঠ নামে একটি দেশ ছিল, এবং সেই দেশে স্থান্বীশ্বর নামক জনপদের রাজবংশে শ্রীহর্ষ জন্মগ্রহণ করেন। এ বংশ পুষ্পভূতির বংশ বলে বিখ্যাত। এই বংশে প্রভাকরবর্ধন নামে একটি রাজা নিজ বাহুবলে নানা দেশ জয় ক’রে পরমভট্টারক উপাধি লাভ করেন। তিনি ‘প্রতাপশীল’ এই অপর নামেও বিখ্যাত।
…
শ্রীহর্ষ প্রভাকরবর্ধনের দ্বিতীয় পুত্র। তিনি ৫৯০ খৃষ্টাব্দে মহারাণী যশোবতীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতা রাজ্যবর্ধন তাঁর চাইতে বছর চারেকের বড়ো, এবং তাঁর ভগ্নী রাজ্যশ্রী বছর দুয়েকের ছোটো।” (হর্ষচরিত, ঐ)
শ্রীহর্ষ বাল্যেই তার পিতা প্রভাকরবর্ধনকে হারিয়েছিলেন, পিতার মৃত্যুর পরই বোন রাজ্যশ্রীর স্বামীকে বধ করে তাকে কারাগারে পাঠায় মলবরাজ। আর বোনকে উদ্ধার করতে গিয়ে সফল হন ঠিকই কিন্তু গৌড়াধিপতি শশাঙ্কের কূটচালে হত হন জ্যেষ্ঠভ্রাতা রাজ্যবর্ধন। এর আগে রাজ্যবর্ধন পুরো রাজ্যভার শ্রীহর্ষকে দিয়েছিলেন কিন্তু বড় ভাইয়ের আগে রাজ্যভার নিতে চাননি তিনি। তবে এই পিতৃভ্রাতৃশোক, সেই সঙ্গে বোনকে পুরোপুরি উদ্ধার করতে না পারা—এসবই শ্রীহর্ষকে দিদ্বিজয়ী হওয়ার পথে নিয়ে যায়। আর এসবই বাণভট্টের হর্ষচরিত-তে রয়েছে। কিন্তু তিনি কাব্যটিতে শশাঙ্কের নাম উচ্চারণ করেননি একবারও, প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর জানাচ্ছেন,
“ঐ ষষ্ট সর্গেই শ্রীহর্ষের মুখ থেকে গৌড়াধম শব্দটি বাহির হয়েছিল।” (হর্ষচরিত, প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর)
তাই শশাঙ্কের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে একটু সন্দেহ থেকেই যায়। তবে প্রমথ চৌধুরীতাকে গৌরাধিপতি বলেই চিহ্নিত করেছেন। শ্রীহর্ষের কাল ছিল খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী। প্রমথ চৌধুরীকে মান্য করলে বোঝায়, যেভাবেই হোক বাংলার সঙ্গে শ্রীহর্ষের যোগ তৈরি হয়েছিল।
বাণভট্ট সংস্কৃত সাহিত্যে প্রণম্য, তার উৎকর্ষতার ছাপ হর্ষচরিত’তে প্রবলভারে পাওয়া যায়। আর প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুরও বাণভট্টের হর্ষচরিত বাংলায় অসাধারণ অনুবাদ করেছেন। মাঝে মাঝে টানা গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে অনুবাদ করেছেন তিনি। এই গঠনকাঠামোর কারণে এর কাহিনিবিন্যাস বুঝতে সুবিধা হয়। আরেকটি বিষয় বিদ্যাসাগর ও প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর-এর মতে বাণভট্টের হর্ষচরিত গদ্যে লেখা, কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর মতে জীবনচরিতটি লেখা পদ্যে। তবে যাইহোক, বাণভট্টের এই একটিমাত্র বইয়ে পুরো প্রাচীন ভারতকে পাওয়া যায়, সেই সময়ের রাজ্য, সমাজ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সহমরণসহ সবই তুলে এনেছেন বাণভট্ট। শ্রীহর্ষের মাও স্বামীর মৃত্যুর পর সহমরণে গিয়েছিলেন। তাই তিনি শুধু পিতাকেই না মাকেও একইসঙ্গে হারিয়েছিলেন। প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর-এর মূলানুগ অনুবাদে তার মূলের পুরোটাই পাওয়া যায়, তাও প্রাঞ্জল ও স্বচ্ছন্দভাবে। সেইসঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে হর্ষচরিততে তখনকার অনেক প্রসিদ্ধ গ্রন্থের কথাও উল্লেখ করেছেন বাণভট্ট। যেমন, কালিদাস, ভাস প্রমুখের নাম বইয়ের শুরুতেই রয়েছে। এখানে আমি প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুরের অনুবাদ থেকে একটি অংশ তুলে ধরছি, তার অনুবাদের মান বোঝাবার জন্য।
দেখতে দেখতে নৃত্যে মেতে উঠল রাজধানীর পণ্যবিলাসিনীরা;
নৃত্যের ছন্দচাতুর্য্যে বিকীর্ণ হ’ল বিকার।
যাদের উপর ঢ’লে পড়ল তাদের বিলোল কটাক্ষের মহিমা, তারা যেন অমৃত-
পীত হয়ে গেল,—অপাঙ্গ-শুক্তির তৃষ্ণায়। মরি মরি, তাদের তর্জ্জন-তরঙ্গিত
তর্জ্জনীনখরের ছটা!—যেন লক্ষ লক্ষ হৃদয়-বিহঙ্গ-ধরার জাল!
অভিমানের অভিনয়ে অভিনয়ে
ভ্রুলতার বিভক্ত ভঙ্গিমা দিয়ে,
প্রণয়ের ভাষণে সম্ভাষণে,
তারা যেন তাড়া দিতে থাকল সকলকে; —
বর্ষণ করল সর্ব্বরস।”
(হর্ষচরিত, চতুর্থ উচ্ছ্বাস, প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর)
“তর্জ্জন-তরঙ্গিত তর্জ্জনীনখরের ছটা!” আর “যেন লক্ষ লক্ষ হৃদয়-বিহঙ্গ-ধরার জাল!” এই অনন্যসাধারণ দুইটি উপমা যা চিত্রকল্পের মর্যাদাপ্রাপ্ত—বলে দেয় প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুরের অনুবাদ কেমন, আর বাণভট্টের মূল সংস্কৃত হর্ষচরিত কেমন, যা অনুবাদেও নিজের ঔজ্জ্বল্য হারায়নি। একি বাংলা ভাষা সংস্কৃতের শব্দঋণ বহন করছে, একারণেও কিছুটা?
বাণভট্টের হর্ষচরিত প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুরের অনুবাদে বাংলা ভাষায় এক অমূল্য সংযোজন, এ নিশ্চিত করে বলা যায়। এই বইটি প্রাচীন ভারতের দরোজা খুলে দেয়, যেখানে মণিমানিক্যের কমতি নেই।
হর্ষচরিত
লেখক: বাণভট্ট
অনুবাদ: প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর
বিষয়: জীবনীগ্রন্থ, কবিতা
প্রকাশক: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ ২০০৮
মূল্য: ৩২০ টাকা।
টীকা: প্রবোধেন্দুনাথ ঠাকুর তার বইয়ে বাণভট্টের বানান লিখেছেন বানভট্ট। তবে আমরা এই লেখায় বাণভট্ট বানানটিই বেছে নিয়েছি কেননা প্রমথ চৌধুরীসহ অনেকেই এই বাণভট্ট বানানটি ব্যবহার করেছেন।