বাহিরানা

বাঙ্গালাদেশে যে সকল দুর্ব্বৃত্ত জাতি বই রিভিউ—এফ্‌, সি, ডালি, আই, ই, সম্পাদনা, মোস্তাক আহমাদ দীন—বাকহীনের ইতিহাস


জয় সেন

বাঙ্গালাদেশে যে সকল দুর্ব্বৃত্ত জাতি বই রিভিউ:
ব্রিটিশ ভারতের ১৯১৬ সালে তখনকার বাঙ্গালা পুলিশের ডেপুটি পুলিশ ইন্‌স্পেকটর-জেনারেল এফ্‌, সি, ডালি, আই, ই পুলিশ সদস্যদের জন্য এই অঞ্চলে চুরি-ডাকাতি যারা করে তাদের পরিচয় কার্যপ্রণালী সম্পর্কে “বাঙ্গালাদেশে যে সকল দুর্ব্বৃত্ত জাতি: চুরি ডাকাইতি প্রভৃতি করে তাহাদের সম্বন্ধে পুস্তক” নামে একটি বই লিখেছিলেন। বইটি সর্বসাধারণের জন্য নয় বিধায় মাত্র কয়েক কপিই মুদ্রিত হয়েছিল। এরপর পেরিয়ে গেছে এক শতাব্দী, কিন্তু এর ভেতরে থাকা ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অজানাই রয়ে গিয়েছিল। তথ্যগুলো জানা না থাকলে ঔপনিবেশিক ইতিহাসে কিছু সম্প্রদায় সবকিছু হারিয়ে সমাজবহির্ভূত এবং গায়ত্রী চক্রবর্তীর ভাষায় “বাকহীন” হয়ে কী রূপ নিয়েছিল —তা বোঝা কঠিন। কবি ও গবেষক মোস্তাক আহমাদ দীন সেই শতাব্দীর ব্যবধান গুছিয়েছেন, তার সম্পাদনায় বইটি বাকহীনদের বাক যেন আবার প্রতিষ্ঠিত করলো বাংলা ভাষায়।
মনে রাখতে হবে, ব্রিটিশরাই ভারতে প্রথমে জমির ব্যক্তি মালিকানা তৈরি করেছে খাজনা গ্রহণের জন্য, এর আগে ভারতবর্ষে ব্যক্তি মালিকানা ছিল না, সব জমির মালিক ছিল গ্রাম পঞ্চায়েত, মোগল শাসনেও খাজনা সংগ্রহ করা হতো পঞ্চায়েতের কাছ থেকে। তাই মালিকানাসূত্রে জমিদারির আমদানীও করেছিল তারাই, আর ভূমিহীন কৃষক এবং দুর্ভিক্ষের সূত্রপাতও সেখানেই। ডালি যে দুর্ব্বৃত্ত জাতির কথা বলছেন তারা সেই জমির মালিকানা হারানো এবং দুর্ভিক্ষ থেকেই জাত। যারা সমাজচ্যুত হয়েছে ডালির দেশের ব্যবসায়ীচক্রের স্বার্থে তৈরি আইনের কারণে। সেদিকে ডালির দৃষ্টি দেওয়া অবশ্য শোভন হতো না, তিনি দেনওনি।

শ্রীপান্থের বিখ্যাত বই “ঠগী”তে আমরা বৃটিশ শাসনে চারিদিক থেকে ভেঙে পড়া এক সমাজচিত্রকে দেখেছি, অনাচারের অন্ত নেই যেখানে, তখন সন্নাসীরাও হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরই সমান্তরালে আমাদের আলোচ্য বই “দুর্ব্বৃত্ত জাতি”কে বসালে আমরা এক সম্পূর্ণচিত্রের মুখোমুখি হব, যেখানে তখনকার দুর্যগের কারণগুলো তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। বাংলা এবং ভারতের এমনসব সম্প্রদায়কে আমরা এখানে পাব যাদের পেশা কখনওই চুরি ডাকাতি সম্পর্কিত নয়। তাহলে কেন, কীভাবে অবনমন হলো তাদের? বইটি নিজেই অভিযুক্তদের বিষয়ে ক্ষমতার কোণ থেকে আমাদেরকে উত্তরগুলো সরবরাহ করে।

বইটি দুইভাগে বিভক্ত, প্রথম ভাগে আছে বাংলার স্থানীয় দুর্ব্বৃত্তরা, দ্বিতীয়ভাগে ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে আসা দুর্ব্বৃত্তদের নিয়ে। প্রথম অংশে যেসব জাতির কথা আলোচিত হয়েছে প্রথমেই সেগুলোকে সম্প্রদায় হিসেবে ধরে নিতে হবে, কারণ এফ, সি, ডালি সম্প্রদায়কে জাতি হিসেবে গুলিয়ে ফেলেছেন। যে সম্প্রদায়গুলো নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন, সেগুলো হলো বেদিয়া, ভূমিজ, ব্যাধ, বাগ্‌দী, পোদ ও কাওরা, ঢেকারু, গায়েন, লোধা, তুঁতিয়া মুসলমান, মক্কা মওয়ালেম, ছোঠভাগিয়া মুচি এবং সান্দার। বইটির সম্মৃদ্ধ ভূমিকায় সম্পাদক আমাদের জানাচ্ছেন, “বেদিয়া, ভূমিজ, ব্যাধ ও বাগ্‌দীদের সম্পর্কে কিছু বিবরণ অন্যান্য বইয়ে উল্লেখ থাকলেও আর কারও কথা খুঁজে পাওয়া যায় না। আর এ-কারণেই এই অনালোচিত-অপ্রচারিত বইটির গুরুত্ব আমাদের কাছে আরও বেড়ে গেছে।”

দ্বিতীয় অংশে আছে অন্যান্য প্রদেশের দুর্ব্বৃত্তদের কথা। এখানে এসেছে বৈদ মুসলমান, বনফড়, ছত্রিশগড় চামার, মিন্‌কা, পালোয়ার দোসাদসহ আরো অনেক সম্প্রদায়। এফ, সি, ডালি এই দুর্ব্বৃত্তদের চুরি-ডাকাতির নমুনা, ছদ্মবেশ, সাংকেতিক ভাষা, পেশা ও অবস্থানের বিবরণ দিয়েছেন, এই তথ্যগুলো তিনি সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে। তৎকালিন পুলিশের এসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট ডবলিউ থর্প, ইন্‌স্পেকটর শরৎচন্দ্র ঘোষের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশনের কাগজপত্র এবং তৎকালীন বাংলার ক্রিমিনার ইসভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের গেজেটসহ আরো দলিলপত্রাদির সাহায্য নিয়েছেন তিনি।

সম্প্রদায়গুলোকে চেনানোর জন্য তিনি পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন, কিন্তু তারা কী কারণে এই চুরি-ডাকাতিতে এসেছে তার কারণ নির্ণয় করেননি, তবে তাদের পূর্বের পেশার উল্লেখ করেছেন। আর সমগ্র ভারতবর্ষের অভিবাসনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং নিম্নবর্গের অপরাধের ইতিহাসও এসেছে তার লেখায়। যেটি পাঠকদের একটি কালানুক্রম সাজাতে সাহায্য করে। যেমন, তিনি বলছেন, “যে-সময়ে বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রদেশে মহারাষ্ট্রীয়গণের পরিবর্তে পিণ্ডারিগণ ডাকাতি শুরু করল তখন বাংলাদেশে মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে যারা আলাদাভাবে ডাকাতি করত তারাও ডাকাতের দল গঠন করে।” এটি তিনি বলছেন বেদিয়াদের নিয়ে, যারা নিজেদের গুজরাট থেকে এসেছে বলে দাবী করে কিন্তু গুজরাট কোথায় তা জানে না, আরেকটি বিষয় মিশ্রধর্মের ধারণাটি যেটি বাংলার বাউল সমাজে দেখা যায় তার একটি নজির বেদিয়াদের মধ্যেও দেখা যায়, তারা কালী পূজা করে কিন্তু বিয়ে করে মুসলমানি রীতিতে। আরেকটি সম্প্রদায় হলো গায়েন, যারা নদীপথে ডাকাতি করত, তারা আশ্চর্যজনকভাবে নিজেদের হজরত শাহজালালের সফরসঙ্গীদের একজনের সাথে নিজেদের সম্পর্কিত করে। যদিও এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

এরকম অংসখ্য টুকরো টুকরো মণিখণ্ড ছড়িয়ে আছে বইটিতে, যাদের জড়ো করলে একটি সামগ্রিক চিত্রের দিকে যাওয়া যায়। উল্লেখ্য, এই দুর্ব্বৃত্তদের নিজস্ব সাংকেতিক ভাষা আছে যা তাদের দলগত সক্ষমতার দিকেও ভালোভাবে ইঙ্গিত দেয়। যেমন তাদের কয়েকটি শব্দ দেখা যেতে পারে, সিদ=মাঁধী, চুরি=বেলি, পুলিশ=কাকারো, লুকাইয়া থাকা=চাপ্পাকা।

বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে তাকানো যেতে পারে, যেমন যারা চুরি করে তারা চুরি-ডাকাতির দ্রব্যাদি বিক্রি করে কোথায়? এর উত্তরও ডালি দিয়েছেন আমাদের, যে তারা সেসব বিক্রি করে স্থানীয় মহাজন, জমিদার, প্রভাবশালীদের কাছে। এই উপরের শ্রেণীটি, ঔপনিবেশিক আমলে ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব, তারা সবসময় জনগণের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, এখানেও এর অন্যথা হয়নি। তারা ছিল ব্রিটিশদের স্বার্থরক্ষাকারী, বিনিময়ে ব্রিটিশরাও তাদের স্বার্থ দেখেছে। এ. আর দেশাই-এর ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সামাজিক পটভূমি’তে আমরা দেখতে পাব জমিদারেরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সব ধরণের আন্দোলনের বিরুদ্ধাচারণ করেছে, যেগুলোতে সাময়িক যোগ দিয়েছে সেগুলোও নিজেদের স্বার্থের প্রয়োজনে। মনে রাখতে হবে, ব্রিটিশরাই ভারতে প্রথমে জমির ব্যক্তি মালিকানা তৈরি করেছে খাজনা গ্রহণের জন্য, এর আগে ভারতবর্ষে ব্যক্তি মালিকানা ছিল না, সব জমির মালিক ছিল গ্রাম পঞ্চায়েত, মোগল শাসনেও খাজনা সংগ্রহ করা হতো পঞ্চায়েতের কাছ থেকে। তাই মালিকানাসূত্রে জমিদারির আমদানীও করেছিল তারাই, আর ভূমিহীন কৃষক এবং দুর্ভিক্ষের সূত্রপাতও সেখানেই। ডালি যে দুর্ব্বৃত্ত জাতির কথা বলছেন তারা সেই জমির মালিকানা হারানো এবং দুর্ভিক্ষ থেকেই জাত। যারা সমাজচ্যুত হয়েছে ডালির দেশের ব্যবসায়ীচক্রের স্বার্থে তৈরি আইনের কারণে। সেদিকে ডালির দৃষ্টি দেওয়া অবশ্য শোভন হতো না, তিনি দেনওনি।

তবে, পড়ার সময় একটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন, যে, যা কিছু বলা হয় তার আড়ালেই রয়ে যায় না বলা কথাগুলো। বইটি সেই না বলার দিকে আমাদের নিয়ে যেতে পারে। কোন অবস্থায় পতিত হলে ব্যাধেরা দক্ষ পাখি শিকারী থেকে দুর্ব্বৃত্ত জাতিতে রূপান্তরিত হয়? অবস্থাটি জানার নিশানা পাঠকদেরই খুঁজে নিতে হবে, বইটি শুধু দু:খের আগুনটিকে জ্বেলে রাখতে পারে, বিপক্ষে থেকেও ডালি এখানে পরম পথপ্রদর্শক।

বাঙ্গালাদেশে যে সকল দুর্ব্বৃত্ত জাতি: চুরি ডাকাইতি প্রভৃতি করে তাহাদের সম্বন্ধে পুস্তক
লেখক : এফ্‌, সি, ডালি, আই, ই
সম্পাদনা: মোস্তাক আহমাদ দীন
বিষয় : গবেষণা, ইতিহাস
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২১
প্রকাশক: চৈতন্য প্রকাশন
দাম: ৪০০ টাকা ২০% ছাড়ে বাহিরানায় ৩২০ টাকা।

বইটি কিনতে চাইলে: 

বাঙ্গালাদেশে যে সকল দুর্ব্বৃত্ত জাতি (Bangaladeshe je shokol durbrittya jati) – বাহিরানা

(Visited 45 times, 1 visits today)

Leave a Comment