দেলওয়ার হাসান রচিত “ঢাকার নবাব পরিবার ও তৎকালীন ঢাকার সমাজ” বইটিকে ঢাকার নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অনুসন্ধানকারী দলিল বলা যায়। উনিশ ও বিশ শতকের ঢাকার নবাবদের জীবন, সমাজ সংস্কার, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং সময়ের সঙ্গে তাদের উত্থান-পতনের গতিধারা এই বইয়ে সংহত ভাবে তুলে এনেছেন তিনি।
এছাড়াও তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও এর বর্তমান অবস্থাও নিয়ে এসেছেন তিনি, বিখ্যাত “আহসান মঞ্জিল”-এর রূপান্তর (বর্তমানে জাদুঘর) এবং অবশেষে নবাবি আমলের বিলুপ্তি বইটিকে একটি সম্মৃদ্ধ সময়ের উত্থান-পতনের সাক্ষী করে তুলেছে।
দেলওয়ার হাসান নবাব পরিবারের ইতিহাসকে বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন। নথি, উপাত্ত, এবং স্থানীয় সূত্রের ব্যবহার গ্রন্থটির বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে।
ঢাকার নবাবদের উৎস ও ব্রিটিশ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টির দিকে তাকালে দুই ধরণের নবাবের পরিচয় পাওয়া যায়, মোগল আমলের নবাব এবং ব্রিটিশ উপাধিপ্রাপ্ত নবাব। বইটিতে ঢাকার দুটি নবাব পরিবারের উল্লেখ রয়েছে— তবে মূল আলোচনা ব্রিটিশ আমলের নবাব পরিবারকে ঘিরে, যারা মূলত দিল্লি থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় এসে বাণিজ্য ও ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাদের পারিবারিক উপাধি ‘খাজা’ থেকে ‘নবাব’ উপাধিতে ভূষিত হওয়ার পেছনে ব্রিটিশদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও জনহিতকর কাজের ভূমিকা বিশদভাবে বর্ণিত করেছেন লেখক।
সিপাহি বিদ্রোহে ইংরেজদের পক্ষাবলম্বন নবাবদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মূল কারণ ছিল। এরপর থেকে তারা ঢাকার নগর উন্নয়ন, মিউনিসিপাল কার্যক্রম, এবং ধর্মীয়-সামাজিক উৎসবের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আবির্ভূত হন।
সমাজ ও নগর উন্নয়নে নবাবদের অবদানের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে উঠে এসেছে, উল্লেখ্য, ঊনবিংশ শতকে ঢাকায় পয়ঃপ্রণালি, পানির সুব্যবস্থা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, এবং বিজলিবাতির ব্যবস্থা প্রবর্তনে নবাবদের ভূমিকা । এছাড়া মহররম, ঈদ, জন্মাষ্টমীর মতো উৎসবে তাদের উদার পৃষ্ঠপোষকতাও সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছিল তখন।
এর সাথে যুক্ত করা যায় “পঞ্চায়েত প্রথা”র মাধ্যমে ঢাকার অভিজাত শ্রেণির সামাজিক শাসন ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার বর্ণনা উঠে এসেছে বইটিতে। আর উঠে এসেছে এই প্রথা কীভাবে স্থানীয় সব গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ধরে রেখেছিল, তার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ।
তবে নবাবদের রাজনৈতিক প্রভাব ও দ্বৈত ভূমিকা’র বিষয়টিও এড়িয়ে যাননি লেখক, ঢাকার নবাবরা মুসলিম শিক্ষা ও রাজনৈতিক সংগঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এক্ষেত্রে ঢাকার মোহামেডান এডুকেশন সোসাইটি, মুসলিম লীগ গঠন, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
আবার, তাদের “বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত”ও তাদের ক্ষতিগ্রস্থ করেছে বৃহৎ অর্থে, ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিরোধাভাসপূর্ণ অবস্থান এবং পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন নিয়ে অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের মধ্যে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। তাই স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে নবাব পরিবারের পতন ও বিচ্ছিন্নতার করুণ ইতিহাসও গ্রন্থটিতে অবশ্যম্ভাবীভাবেই যুক্ত হয়েছে।
এছাড়াও তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও এর বর্তমান অবস্থাও নিয়ে এসেছেন তিনি, বিখ্যাত “আহসান মঞ্জিল”-এর রূপান্তর (বর্তমানে জাদুঘর) এবং অবশেষে নবাবি আমলের বিলুপ্তি বইটিকে একটি সম্মৃদ্ধ সময়ের উত্থান-পতনের সাক্ষী করে তুলেছে।
দেলওয়ার হাসান নবাব পরিবারের ইতিহাসকে বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন। নথি, উপাত্ত, এবং স্থানীয় সূত্রের ব্যবহার গ্রন্থটির বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে।
জটিল ঐতিহাসিক বিষয়বস্তুকে গল্পের মতো প্রবহমান ভাষায় উপস্থাপন করেছেন তিনি। ফলে সাধারণ পাঠক ও গবেষক উভয়েরই সমানভাবে কাজে লাগবে।
বইটি ঢাকার নবাবদের ইতিহাসের পাশাপাশি একটি ঢাকা শহরের বিবর্তনেরও ইতিহাসগ্রন্থ হয়ে উঠেছে। দেলওয়ার হাসানের গবেষণা ও বর্ণনাশৈলী পাঠককে উনিশ-বিশ শতকের ঢাকা শহরের সময়যাত্রার অভিজ্ঞতা দেবে। ঢাকার নগরায়ণ, শিক্ষা-সংস্কৃতি, এবং রাজনীতিতে নবাবদের প্রভাব বোঝার জন্য বইটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ঢাকার নবাব পরিবার ও তৎকালীন ঢাকার সমাজ
লেখক : দেলওয়ার হাসান
বিষয় : ইতিহাস
প্রকাশকাল : ২০২৪
প্রকাশক : পাঠক সমাবেশ
দাম : ৫৫০ টাকা ২০% ছাড়ে ৪৪০ টাকা।
বইটি কিনতে হলে:
ঢাকার নবাব পরিবার ও তৎকালীন ঢাকার সমাজ – বাহিরানা