বাহিরানা

ধরে রাখতে নেই সব স্মৃতি, উন্মোচন করতে নেই সব রহস্য—কিষ্কিন্ধা কান্দাম(KISHKINDHA KAANDAM )—মামুনুর রশিদ তানিম


মামুনুর রশিদ তানিম


‘মালায়ালি থ্রিলার’ এই শব্দবন্ধের একটা আলাদা নিশ আপিল আছে। তাই যখনি কেউ মালায়ালি থ্রিলারের সন্ধান চায় কিংবা বলে, “ওইযে ওই মালায়ালি থ্রিলার” তখন আলাদা করে সামনে ‘ভালো’ শব্দটা বলতে হয় না, নিশ গোত্রে৷ খারাপ/এভারেজ বহু থ্রিলার আছে মালায়ালামে, কিন্তু ওগুলোর ক্ষেত্রে কেউ এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করে না সচরাচর। এর কারণ হচ্ছে মালায়ালাম থ্রিলারের এক্সপোজার এবং ট্র্যাডিশন। ‘দৃশ্যম ১’, ‘মেমোরিজ’, ‘মুম্বাই পুলিশ’, ‘মুন্নারিয়িপ্পু’, ‘ভেত্তাহ’, ‘ওপ্পাম’, ‘২২ ফিমেল কোট্টায়াম’, ‘কাম্মাতি পাদাম’, ‘আয়োবিন্তে পুস্থাকাম’, ‘সোয়াথানথারায়াম আরধারাথিরিল’, ‘সেভেন্থ ডে’- এসকল সিনেমা দিয়ে ২০১৬/২০১৭ সালের দিকে দেশীয় একটা নিশ গোত্রে মালায়ালি থ্রিলার, সার্বিকভাবে মালায়ালি সিনেমার এক্সপোজার পাওয়া শুরু হয় (থ্রিলারের অবদানেই)। ২০২০ পরবর্তী সময়ে মালায়ালি সিনেমার সর্বভারতীয় এক্সপোজারে অনেক মূলানুগ/শেকড়প্রোথিত ন্যারেটিভ বদলে গেছে, সার্বজনীন আবেদন রাখতে। যাক, সেটা আরো বিস্তৃত আলাপ। মূলত এই শব্দগুলোর খরচ এইকারণে যে, ‘কিষ্কিন্ধা কান্দাম’ (২০২৪) বহুদিন পর সেই মালায়ালি থ্রিলারের আবেশটা দিলো। আবহে, গন্ধে মালায়ালি থ্রিলার সেই সময়ে যেমনটা দেখতে হতো; ঠিক তেমনই (ভালোমন্দের হিসেব পরে)। সেটা হবারও কারণ আছে, ‘কিষ্কিন্ধা কান্দাম’ যে অনুপ্রেরণা নিয়েছে ‘দৃশ্যম’- এর। আর বেড়ে উঠেছে ‘মেমোরিজ’ সিনেমার ধমনীতে। মানে, জিথু জোসেফের স্টাইলে। কোরিয়ান ‘নিও নোয়াহ্’ থ্রিলারের গতি আর আবহের অনুপ্রেরণাকে সুদক্ষভাবে মালায়ালি করে তুলতে পারায় এই লোকের ভূমিকা আছে। তাই ‘কিষ্কিন্ধা কান্দাম’ দেখতে গিয়ে গতি আর আবহটা ওমনই লাগে।

kishkindha-kaandam, ধরে রাখতে নেই সব
কিষ্কিন্ধা কান্দাম

লেখনীতে এই নুয়্যান্সগুলো থাকায় সিনেমার চরিত্রগুলো আপনা থেকেই একটা অন্যরকম গভীরতা পায়৷ তাদের লাইফস্টাইল, মিথস্ক্রিয়া সবেতেই এই ডিটেল ভূমিকা রেখেছে৷ সাথে পলিটিকালি চার্জড লেয়ারটাও আছে, যেটা এই কিষ্কিন্ধা চ্যাপ্টারের জিওগ্রাফি এবং সামগ্রিক আবহকে আরো ভারী করেছে। নোয়া’র গতি ও নোয়া সিনেমার চরিত্রদের প্রোটোটাইপেই গঠিত এই সিনেমার চরিত্রগুলো। গ্রাউন্ডেড ড্রামা, একদম পুরোপুরি মালায়ালি স্বাদে; গন্ধে। প্রধান চরিত্র আসিফ আলীর, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিনেমা এটাকে বলা হচ্ছে। সেটা সর্বতোভাবেই সত্যি৷

হিন্দুপুরাণ অনুযায়ী কিষ্কিন্ধা, রাজা সুগ্রীবের রাজ্য। এই সিনেমার লোকেশনটাও সেই বিষয়টাকেই উপস্থাপন করে। গভীর জঙ্গলের পাশে একটা ছোট্ট গ্রাম। বিস্তৃত এই জঙ্গল বানর দিয়ে ভরা। তারাই আধিপত্য বিস্তার করে৷ এই রিজার্ভ ফরেস্টের পাশেই থাকে অজয়ের পরিবার, তার নতুন বউ আর বাবা। বাবা অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি অফিসার আর অজয় ফরেস্ট অফিসার। মূলত তাদের পারিবারিক ইতিহাস কিংবা বলা চলে, রহস্য; তা নিয়েই এই সিনেমা। অজয়ের প্রথম স্ত্রী মা’রা গেছে। এবং তার ছোট্ট ছেলে গত ৩ বছর ধরে নিখোঁজ। নতুন বউ আসার পর শ্বশুরের অতি সিক্রেটিভ ন্যাচার তাকে সন্দেহবাতিক করে তোলে। অবসরপ্রাপ্ত এই আর্মি জেনারেলের অ্যামনেশিয়ার কথা সবার কাছ থেকে গোপন রাখা, তার মিলিটারি মেজাজ এবং নানান তথ্য পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাগুলো অজয়ের দ্বিতীয় বউ অপর্নাকে খুব ভয়াবহ কিছু ভাবতে বাধ্য করে, অজয়ের ছেলের অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে; পরিবারের যেই ইতিহাস ওতে চাপা পড়ে আছে এবং বাপ আর ছেলে নীরবে যেই ট্র‍্যাজেডি বহন করে চলেছে! (এটুকুতে যেই সমাপ্তি মাথায় আসতে পারে, সিনেমাটা আসলেই তা করেনি। এবং যেটা সামনে এসেছে সেটা ট্র্যাজেডি আর শক ভ্যালু সমভাবে রেখেছে।)

বাকি সবকিছুর সাথে সাথে এই সিনেমা, তার সেটিং/লোকেশনকেও একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। এই গভীর জঙ্গল পরিবেষ্টিত অঞ্চল, বানরের বন্য স্বভাব- সবকিছুই অন্যরকম নিগূঢ়তা যোগ করেছে গল্পে। এবং চিত্রনাট্যে সেই লেয়ারটাও যথাযথভাবে রাখা হয়েছে। প্রকৃতি মাত্রই যে রহস্যময় এবং রহস্যের ডালপালা লোকালয়ে ছড়ালেও, শেকড় যে প্রকৃতি নিজের মাঝে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে- ওই উপলব্ধিটা করাতে সক্ষম হয়েছে এর চিত্রনাট্য। লেখনীতে এই নুয়্যান্সগুলো থাকায় সিনেমার চরিত্রগুলো আপনা থেকেই একটা অন্যরকম গভীরতা পায়৷ তাদের লাইফস্টাইল, মিথস্ক্রিয়া সবেতেই এই ডিটেল ভূমিকা রেখেছে৷ সাথে পলিটিকালি চার্জড লেয়ারটাও আছে, যেটা এই কিষ্কিন্ধা চ্যাপ্টারের জিওগ্রাফি এবং সামগ্রিক আবহকে আরো ভারী করেছে। নোয়া’র গতি ও নোয়া সিনেমার চরিত্রদের প্রোটোটাইপেই গঠিত এই সিনেমার চরিত্রগুলো। গ্রাউন্ডেড ড্রামা, একদম পুরোপুরি মালায়ালি স্বাদে; গন্ধে। প্রধান চরিত্র আসিফ আলীর, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিনেমা এটাকে বলা হচ্ছে। সেটা সর্বতোভাবেই সত্যি৷ এমন শোকাতুর অতীতকে বহন করে চলা, আবার দ্বান্দ্বিক ইমোশনে কোণঠাসা হয়ে থাকা চরিত্রের যেই বিস্তৃত গ্যামাট- পুরোটা ধরেই অভিনয় করেছেন আসিফ আলী। অপর্ণা বালামুরালি নিখুঁত কাস্টিং তার চরিত্রটার জন্য। তাকে আলাদা করা কঠিন (চরিত্র থেকে), পাশে সরিয়ে রাখলেই বোঝা যায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি সে গল্পের জন্য। ভিজয়ারাঘাভানকে অনেক বছর পর বোধহয় এতটা প্রয়োজনীয় চরিত্রে কেউ ভাবলো! দক্ষ অভিনেতা। মিলিটারি মেজাজ তো তার মধ্যে সহসাই দেখা যায় (নানান সিনেমার বি লিস্টের চরিত্রে)। কিন্তু অপরাধবোধ, ফুরোতে থাকা অহম আর অস্তিত্বের সংশয়ে ভোগা চরিত্রে এমন দৃঢ়তার সাথে তার অভিনয় অপ্রত্যাশিত আর অবিশ্বাস্য। বাপ বেটা দুজনের বিশ্বাসযোগ্য ডায়নামিক, সিনেমার গোটা ইমোশনাল কোরটাকে একাই টেনেছে এবং অস্তিত্ববাদের আলাপের জায়গাটাও ডিটেলে রেখেছে।

বাহুল রামেশের নামটা এইক্ষেত্রে আলাদাভাবে নেওয়া উচিত, কারণ এই সিনেমার গল্প; চিত্রনাট্য ও সংলাপ লেখার পাশাপাশি সিনেমাটোগ্রাফিও সে সামলেছে। ভিজ্যুয়াল ডিটেলে তীক্ষ্ম ও অনবদ্য। পরিচালক দিনজিৎ আয়াথানের সাথে তার কোলাবোরেশন জমেছে বেশ। এরকম ট্র‍্যাজিক সাইকোলজিক্যাল ড্রামাকে খুব প্রগাঢ়তার সাথে ডিল করেছেন আয়াথান। তাই স্লো ‘বার্ণ’ হয়েছে পুরোপুরি (আজকাল অনেকেই তো আবার স্লো মানেই বার্ণ বুঝে)। আয়াথানের এই বয়ানদক্ষতার কারণেই, ‘কিষ্কান্ধা কান্দাম’ সমাপ্তিতে এসে জোরালো ধাক্কাটা দিতে পারে দর্শককে, ইমোশনালি এবং সাইকোলজিক্যালি; দু’ভাবেই। আধুনিক ‘মালায়ালি থ্রিলার’- এর সেই ট্র‍্যাডিশনে (শুরুতে উল্লেখ্য) একটা জ্বলজ্বলে নাম হয়ে থাকবে এই সিনেমা।

(Visited 22 times, 1 visits today)

Leave a Comment