বাহিরানা

দৃশ্যের ভিতর ভূত বই রিভিউ—প্রহরী—পাঠকের প্রেমের কাছে


দিপু চন্দ্র দেব

কবিতা কেন কবিতা বা কী কী গুণাবলী থাকলে বা না থাকলে একটা কবিতাকে ভালো কিংবা খারাপ বলা যায়? বাক্যটিতে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর বব ডিলানের ভাষায় “হাওয়ায় ছড়িয়ে আছে”। উত্তরগুলোকে খুঁজে পাওয়া এতই সহজ আর ঠিক একারণেই এতই জটিল। কেননা কবিতা নিয়ে এখন পর্যন্ত যত মূল্যায়ন আমরা পেয়েছি তার সবগুলোই সঠিক, এরকমই তো হওয়া উচিৎ। যেহেতু কবিতা শিল্প বিজ্ঞান নয়। কিন্তু এরপরও আমরা ভালো কবিতা নির্ণয় করতে পারি, এক্ষেত্রে কোনো তত্ত্বেরও প্রয়োজন নেই আমাদের। প্রহরীর প্রথম কবিতাবই ‍“দৃশ্যের ভিতর ভূত”-এর গুণ, ভালো-মন্দ নিয়ে এসব উত্তর আমরা যাচাই করে দেখব লেখার বাকি অংশে। ২০২৪-এর বইমেলায় বইটি প্রকাশিত হয়েছিল বৈতরণী থেকে।

তবে, বইটির মূলবিন্দু হচ্ছে প্রেম। প্রায় কবিতা-ই একজন তুমিকে উদ্দেশ্য করে, এই তুমি প্রায়ই ব্যক্তিগত তুমি, আবার কখনও তাকে তিনি হাওয়া নামে সম্বোধন করেন, হাওয়া মানে প্রাণ, সজীবতা। এলিয়টের হাওয়ার রং হলুদ তাই সেটি ক্ষয়ের নিদর্শন, জন্ডিসাক্রন্ত পুড়োজমির প্রতীক, কিন্তু প্রহরীর হাওয়া তার একান্ত নিজস্ব, একে তার আশার প্রতীক বলেই বোধহয়। তবে এই তুমি—তাকে যেভাবে, যে নামেই সম্বোধন করা হোক নাকে পাঠকদেরও সেই কথোপকথন, হাহাকার, বিরহে প্রবেশাধিকার থাকে।

তার কবিতা সহজ স্বাভাবিক। সেগুলোতে নির্মাণের চিহ্ন থাকে গোপন। কবিতায় প্রতিদিনের যাপিত জীবন, সমাজ-রাষ্ট্র থেকে উঠে আসা শব্দাবলী ভিড় করে থাকে। তাই পাঠকদের সাথে যোগাযোগ সহজ হয়। কিন্তু সেখানে মোড় থাকে, ফলে পরিচিত বিষয়বস্তুর অর্থ বদলে যায়, অচেনা হয়ে ওঠে। যেমন তিনি বলেন,

অন্ধকারের ভীষণ জ্বর— তাই সে বিষণ্ণতার কাঁথা মুড়ে শুয়ে আছে বিস্মৃত মাঠের ’পরে।

(জ্বর)

আচ্ছা, একটা দু:খ বলতে না পারার বেদনা কেমন!

(এ দেখা না-ই বা হতো)

হাওয়া— গত সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই বাড়ি ফিরেছে দু:খ
আমার;

(ঢেউ আর ঢেউ)

কবিতাগুলোতে থাকা উপমা কখনও কখনও চকিতে উজ্জ্বলতর আলোকবিন্দু মতো আছড়ে পড়ে, এরকম কয়েকটি পঙক্তি দেখা যেতে পারে,

মক্তবে পড়া আরবি হরফের মতো
ভেসে উঠছে তোমার চোখ।

(একআ হয়ে যাচ্ছি)

আমি মূলত হতে চেয়েছিলাম মাছ; যার চোখ ছিল বুদ্ধের হৃদয়!

(নজরানা)

তবে, বইটির মূলবিন্দু হচ্ছে প্রেম। প্রায় কবিতা-ই একজন তুমিকে উদ্দেশ্য করে, এই তুমি প্রায়ই ব্যক্তিগত তুমি, আবার কখনও তাকে তিনি হাওয়া নামে সম্বোধন করেন, হাওয়া মানে প্রাণ, সজীবতা। এলিয়টের হাওয়ার রং হলুদ তাই সেটি ক্ষয়ের নিদর্শন, জন্ডিসাক্রান্ত পুড়োজমির প্রতীক, কিন্তু প্রহরীর হাওয়া তার একান্ত নিজস্ব, একে তার আশার প্রতীক বলেই বোধ হয়। তবে এই তুমি—তাকে যেভাবে, যে নামেই সম্বোধন করা হোক না কেন পাঠকদেরও সেই কথোপকথন, হাহাকার, বিরহে প্রবেশাধিকার থাকে। প্রবেশাধিকারের কথাটি একারণে বলা যে, যদি সেটি না থাকে তাহলে কবিতা কখনওই ডায়েরির বাইরের কিছু হয়ে উঠতে পারে না, ফলে তাকে কবিতা বলাও সঙ্গত হয় না। প্রহরী সেক্ষেত্রে তার প্রেমকে, হাওয়াকে পাঠকদের প্রেমের কাছেও পৌঁছে দিয়েছেন, কবিতাগুলোর পাঠে এরকমই মনে হয়।

প্রেম বইটির অবয়ব গড়েছে, অন্যদিকে আছে উদ্বাবস্তু এক সময়ে বিচ্ছিতাবোধের তরুণ হৃদয়ের দৃষ্টি, আর এই দুইয়ের যৌথতায় এসেছে সমাজ, শ্রেণী-রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়াদি। এই মিশ্রিত বিষয়বস্তুগুলো থেকে কয়েকটি পঙক্তি দেখা যেতে পারে,

এইসব মন ভাঙা দুপুর ফুরায়ে যাবার কালে— কে জানি
চলে যায়; সন্ধ্যার অন্ধকারে।
(মন ভাঙা দুপুর)

একটা সন্ধ্যা হুট করে ঢুকে পড়েছে লাউয়াছড়া বনের
ভিতর; তোমার কাছে ফেরার দৃশ্য ধরে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন,

(ভার)

আমি সেই হাহাকারে
বসে তোমাকে খুঁজছি, সারাদিন বৃষ্টি কিন্তু কোথাও তুমি
নাই।

(আমাকে বাঁচাও)

ফিরে এসো
সমুদ্রের পথে—
আমি তোমার ফেরার দিকে চেয়ে
জিরিয়ে গুনছি নক্ষত্রের দিন—

(ফিরে এসো হাওয়া)

লেখার প্রথমে যে প্রশ্নগুলো মাথা তুলেছিল সেগুলোর উত্তরে বলা যায়, প্রহরী চিরায়ত বাংলাকবিতার মধ্যে থেকেই কবিতা লিখছেন, তাই তার কবিতায় পূর্বসুরীরাও আছেন বিভিন্নভাবে। তবে, এরমধ্যে তার স্বরকেও চিহ্নিত করা যায়, যা তার আয়তন-আকার গঠন করছে নিজের মতো। তার কবিতা আলো-হাওয়ার মতো সহজ কিন্তু ভিন্ন-ভিন্ন দ্যোতনায় নিজেদের প্রকাশ করতে চায়। তিনি নিজেকে আড়াল করতে চান না কবিতায়, এটি তার কবিতার একটি প্রবণতা বলা যায়, তার ব্যক্তিগতকে, তাকে তিনি প্রকাশ করতে চান প্রবলভাবেই— এক্ষেত্রে কতখানি তিনি সফল বা ভবিষ্যতে প্রবণতাটিকে কতটা বিস্মৃত করবেন সেটা সময়ের হাতেই ছেড়ে দেওয়া যাক,
তবে জীবননানন্দের ভাষায় বলা যায় এর আগে, “ধরা যাক তবে এবার দুয়েকটা ইঁদুর।”

দৃশ্যের ভিতর ভূত
লেখক : প্রহরী
বিষয় : কবিতা
প্রকাশকাল : প্রথম প্রকাশ ২০২৪ (চতুর্থ মুদ্রণ ২০২৫)
প্রকাশক : বৈতরণী
দাম : ৩২০ টাকা ২০% ছাড়ে বাহিরানাতে ২৫৬ টাকা।

বইটি কিনতে চাইলে:

দৃশ্যের ভিতর ভূত – বাহিরানা

(Visited 53 times, 1 visits today)

Leave a Comment