বাহিরানা

কাজী আনোয়ার হোসেনের আমিই মাসুদ রানা: আত্মজৈবনিক ও থ্রিলারের মিশেল

কাজী আনোয়ার হোসেনের আমিই মাসুদ রানা বই রিভিউয়ের প্রচ্ছদ

কাজী আনোয়ার হোসেনের (১৯ জুলাই ১৯৩৬-১৯ জানুয়ারি ২০২২) মাসুদ রানা বাংলা থ্রিলার জগতে যে বিপুল আলোড়ন ও তরঙ্গ তুলেছিল তা বিস্ময়কর বললেও কম বলা হয়। ভারত নাট্যম, ধ্বংস পাহাড়-এর রেশ কাটতে না কাটতেই তাতে জড়ো হয়েছিল আরো অসংখ্য নতুন নতুন বই, যা একটি প্রজন্মকেই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। মাসুদ রানার পুরুষালি রূপ, বাংলাদেশি স্পাই এজেন্ট হিসেবে যে শৌর্য বীর্যের সাক্ষাৎ বাংলাদেশের থ্রিলার পাঠকদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছিল—তা পক্ষান্তরে থ্রিলার সাহিত্যেরই এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। একটি স্বাধীন দেশের একজন স্পেশাল এজেন্ট বিশ্বের বড় বড় দেশের সঙ্গে টক্কর দিয়ে চলেছে, অপরাধী সনাক্ত করছে, পাকড়াও করছে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও যার সিদ্ধান্ত ও যুক্তি অভ্রান্ত, সাহস অটল—এরকম একজন যে আশির দশকের তরুণদের মনোদেশে কীরকম ধাক্কা দিয়েছিল তার কথা বিবেচনায় নিলে এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে। বলা যায় ইয়ান ফ্লেমিং (Ian Fleming)- এর অসাধারণ সৃষ্টি স্পাই জেমস বন্ড (James Bond) চরিত্রের চেয়ে মাসুদ রানা কোনো অংশেই কম নয়।

আমিই মাসুদ রানা বইয়ের একটি বিশেষ গুরুত্ব হলো এখানে এমন অনেক বিষয়—বিশেষত সাক্ষাৎকার ও গদ্যে—উঠে এসেছে অকপটভাবে, যে তা কাজী আনোয়ার হোসেনের ব্যক্তিগত জীবন দর্শন, মাসুদ রানা লেখার পর্ব ও সেবা প্রকাশনী প্রতিষ্ঠাপর্ব নিয়ে নতুন করে ভাববার উপাদান যোগায়।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের থ্রিলারের যে জাগরণ, তা অনেককাংশেই মাসুদ রানা সিরিজের কাছে ঋণী। যেমন বর্তমানে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনসহ অনেকেই থ্রিলারে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেনে। যদিও ঘরানা ভিন্ন, তবু থ্রিলারের একটি বিরাট পাঠকগোষ্ঠী বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে, যার সুফল পাওয়া যাচ্ছে—তা আনোয়ার হোসেনের সেবা প্রকাশনীর কারণেই, এটা অস্বীকার করার পথ নেই, কারণ এই পাঠক গোষ্ঠীর প্রায় সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের। এই পাঠক তৈরিতে পরবর্তীতে রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দাও বিশেষ প্রভাব রেখেছে।

কাজী আনোয়ার হোসেনের আমিই মাসুদ রানা বইটি মূলত প্রথম আলোতে প্রকাশিত আনোয়ার হোসেনের কয়েকটি গল্প, একটি অপ্রকাশিত উপন্যাস, কয়েকটি সাক্ষাৎকারের সংকলন। লেখাগুলোয় তার আত্মজীবনী, স্মৃতি, কথাসাহিত্য ও থ্রিলারের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে। মাসুদ রানা রচনার ইতিবৃত্ত তো রয়েছেই। বইয়ে স্থান পেয়েছে দুইটি বড় গল্প, উপন্যাস দুইটি ও অসমাপ্ত উপন্যাস একটি, তিনটি সাক্ষাৎকার, দুইটি কথামালা, ও কয়েকটি গদ্য। এই লেখাগুলোর মধ্যে প্রথম আলোর ২০০২ সালের প্রথম ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত মিজান দাদা নামে উপন্যাসটিও রয়েছে, যা সময়ের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম আলোয় মাসুদ রানার ৫০ বছর পূর্তিতে প্রকাশিত একটি বিশেষ সংখ্যা থেকেও আনোয়ার হোসেনের লেখা রয়েছে এই বইয়ে।

আমিই মাসুদ রানা বইয়ের একটি বিশেষ গুরুত্ব হলো এখানে এমন অনেক বিষয়—বিশেষত সাক্ষাৎকার ও গদ্যে—উঠে এসেছে অকপটভাবে, যে তা কাজী আনোয়ার হোসেনের ব্যক্তিগত জীবন দর্শন, মাসুদ রানা লেখার পর্ব ও সেবা প্রকাশনী প্রতিষ্ঠাপর্ব নিয়ে নতুন করে ভাববার উপাদান যোগায়। আর যারা তার উপন্যাস ও গল্পের ভক্ত, তাদের জন্য তো বিশেষ গুরুত্ব রইলই।

বইটি মাসুদ রানা, সেবা প্রকাশনী ও কাজী আনোয়ার হোসেন ও তার লেখা যারা পছন্দ করেন তাদের জন্য এক স্বর্ণখনি। এর কারণ হলো এখানে যে যে লেখা রয়েছে তা অন্য আর কোথায়ও পাওয়া যাবে না। বইটি তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত, এ আবার তার কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান নিবেদনও, যা বাংলাদেশে ক্রশন বিরল হয়ে পড়ছে। কাজী আনোয়ার হোসেনের কাজ এভাবেই টিকে থাকবে, তার বইগুলো বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে না গিয়ে নতুন নতুন পাঠকদের কাছেও পৌঁছাবে, এই আশাবাদ আমরা রাখতেই পারি।

আমিই মাসুদ রানা
লেখক: কাজী আনোয়ার হোসেন
বিষয়: আত্মজীবনী, কথাসাহিত্য, সাক্ষাৎকার ও থ্রিলার
প্রকাশনী: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশকাল: ২০২২
মূল্য: ৫০০ টাকা।


মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত লেখাগুলো

বাহিরানায় জনপ্রিয়

বাহিরানায় বিভাগসমূহ