দিপু চন্দ্র দেব
মফিজন বই রিভিউ:
ইতিহাস আর ছোটগল্পের দুই বিপরীত বৃত্ত মাহবুব-উল আলমের লেখক জীবনে দেখা গেছে। ব্রিটিশ যুগ থেকে স্বাধীনতা—সবই দেখেছেন তিনি, বাংলা ও বিশ্বের সাথে এক গভীর যোগ আছে তার লেখার, অভিজ্ঞতাজাত প্রজ্ঞার দেখা মেলে তার সাহিত্যে। তার উপন্যাস “মফিজন”-এও এই প্রজ্ঞার দেখা মেলে। এতে চিরায়ত বাংলাদেশকে তুলে এনেছেন তিনি অনবদ্য ভাব-ভাষা-বর্ণনায়।
ছবিরন আর মফিজন দুই বোনের গল্প এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় অংশ। তাদের বাবা পাট ব্যবসায়ী ওয়াজউদ্দীন শেখ। আর কিশোরী মফিজনের প্রেমিক মামুদ। এর সাথে আসে আরো কিছু চরিত্র যেমন মামুদের বাবা মীর তাজুদ্দীন, অন্যকে ভর্ৎসনাকারী সমির কাজী। উপন্যাসটি এই চরিত্রগুলোর জীবনের বেড়ে উঠার আর উত্থান-পতন নিয়ে।
উপন্যাসটির একটি বড় গুণ এর বর্ণনা। কাব্যধর্মী বাক্য কিন্তু গদ্যের প্রাত্যহিক রূপটিকে অটুট রেখেছেন লেখক। ফলে কোনো দুরূহতা সৃষ্টি হয় না, চরিত্রগুলোর মনস্তত্ব তুলে ধরেন তিনি অবলীলায় সহজ ভাষায়। এর সাথে যোগ করা যায়, বর্ণনার চিত্রধর্মীতা এবং সেইসাথে লেখকের বিশ্লেষণ ক্ষমতার কথাও। ফলে একসময় বইয়ে বির্ণিত চরিত্র এবং ঘটনাগুলো পাঠকদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্বচ্ছভাবে।
বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে আশরাফ-আতরাফ নামে একটি বিরাট বিভাজন ছিল এককালে। এ নিয়ে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর “দুই তীর” নামে একটি গল্পও আছে। মফিজন উপন্যাসটিও এই বিভাজনের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ওয়াজউদ্দীন শেখ পাট ব্যবসা করে বিস্তর টাকা কামাই করেছেন ঠিকই কিন্তু শরীফ হতে পারেননি। এটা টাকা দিয়ে অর্জন করা যায় না, এটা বংশগত। তাই তার মধ্যে আশরাফ হওয়ার একটা গোপন ইচ্ছে আছে, সাথে একটি ছেলে সন্তানের বাসনাও তার ছিল। এ জন্য মামুদের সাথে মেয়ের বিয়ের কথা ভাবতে হয়। মেয়ে জামাইয়ের মাধ্যমে এই দুই বাসনাই তিনি পূরণ করতে চান। জাতে ওঠার জন্য শরীফ ঘরে মেয়ে বিয়ে দেওয়া বাংলায় খুবই প্রচলিত একটি প্রথা। কিন্তু সমাজে থাকলেও সাহিত্যে বিষয়টি খুব একটা আসেনি। মাহবুব-উল আলম সফলভাবে একে উপন্যাসের কাঠামোতে নিয়ে এসেছেন। আর এর সাথে ব্যর্থ প্রেম আর যৌতুকের বিষয়টিও আনতে ভুলেননি তিনি। মামুদের সাথে ছবির বিয়ের কথায় মফির অব্যক্ত বেদনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“কপালে ও ওষ্ঠে রগড়াইয়া তুলিতে লাগিল কিসের দাগ। যখন দাগ তোলা হইয়া গেল, তখন তাহার বাঁ-চোখে আসিল জল। তখন ডান চোখ দিয়া আগুন বাহির হইয়া তাহাকে শুকাইয়া ফেলিল।”
এই বর্ণনাটিকে তিনি যেন নিপুণভাবে জাদুবাস্তব করে তুলেছেন।
উপন্যাসটির একটি বড় গুণ এর বর্ণনা। কাব্যধর্মী বাক্য কিন্তু গদ্যের প্রাত্যহিক রূপটিকে অটুট রেখেছেন লেখক। ফলে কোনো দুরূহতা সৃষ্টি হয় না, চরিত্রগুলোর মনস্তত্ব তুলে ধরেন তিনি অবলীলায় সহজ ভাষায়। এর সাথে যোগ করা যায়, বর্ণনার চিত্রধর্মীতা এবং সেইসাথে লেখকের বিশ্লেষণ ক্ষমতার কথাও। ফলে একসময় বইয়ে বির্ণিত চরিত্র এবং ঘটনাগুলো পাঠকদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্বচ্ছভাবে। যেমন বইয়ের এই বাক্যগুলোতে কাব্যিক আবহ আর চিত্রধর্মীতার বিষয়টি দেখে নিতে পারি আমরা, ছবি আর মফি’র শারীরিক পার্থক্যের কথা জানাতে তিনি লেখেন,
“ছবির রং ময়লা, মাংসল। মফির রংয়ের খোলতাই খুব, অথচ কৃশাঙ্গী। কিন্তু, আসল পার্থক্য চোখে। ছবি গরুচোখা প্রকাণ্ড গোলকে ভাষা মূক—কোন আদম যেন উহার প্রতিবাদ স্তব্ধ করিয়া দেওয়ার জন্য উহাকে মোষড়াইয়া রাখিয়া গিয়াছেন। আর মফির চোখ দিয়া বাহির হয় ঝলকে ঝলকে জ্যোতিঃ।”
পুরো উপন্যাসটিই এরকম বর্ণনা, ভাষায় লেখা। মফিজন-এ চিরায়ত বাংলাদেশকে নিয়ে আসেন তিনি এর জটিল সমাজকাঠামোসহ। শেষে বলা যায়, পরিচয় মেলে এখানকার অধিবাসীদের সুখ-দু:খ, রাজনীতির এক নিটোল মায়াবী চিত্রের।
মফিজন
মাহবুব-উল আলম
প্রকাশকাল: ২০২৪
প্রকাশনী: বাতিঘর
দাম: ২০০ টাকা ২০% ছাড়ে বাহিরানায়।
বইটি কিনতে হলে: