বাহিরানা

পরার্থপরতার অর্থনীতি বই রিভিউ—আকবর আলী খান—যে বইটি এখনও প্রাসঙ্গিক


জয় সেন

যত দিন যাচ্ছে আকবর আলী খানের “পরার্থপরতার অর্থনীতি” নিজের গুরুত্ব বাড়িয়েই চলেছে। তিনি নিজে অর্থনীতির ছাত্র হওয়ায় এবং প্রশাসনিক কাজে যুক্ত থাকায় বাংলাদেশের জন্ম থেকে এর বিস্তার ও সীমাবদ্ধতা দেখেছেন। এটাও দেখেছেন যে, এখানে, অর্থনীতির সিদ্ধান্ত যারা নেন, তারা অর্থনীতিবিদ নন, আবার যারা অর্থনীতিবিদ তারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্তরটিতে থাকেন না। ফলে, বহু বিবেচনায়ই সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রাজ্ঞজনদের মতামত প্রয়োগ করা হয় না। তবে, ২০০০ সালে প্রকাশিত এই বইটি যখন এখনও মানুষ পড়তে চাচ্ছে, এর থেকে এটা বোঝা যায় জ্ঞান বৃথা যায় না।

“গ্রেশামের সনাতন বিধির মত এটি মনে রাখা ভাল যে, উন্নয়নের জগতে একই কর্মসূচীতে যদি গরীবদের সাথে যারা গরীব নয় তাদের একত্রিত করা হয়, তবে যারা দরিদ্র নয় তারা দরিদ্রদের এবং যারা দরিদ্র তারা হতদরিদ্রদের বঞ্চিত করবে এবং এ পরিস্থিতি চলতেই থাকবে যদি প্রথমেই উপশমমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়। যা ঘটবে তা হল গরীবদের নামে যারা গরীব নয় তারা সকল ‍সুবিধা ভোগ করবে।” Yunus, Muhammad, Bankar to the poor (Dhaka university press Ltd, 1999)

এই কয়েকটি বাক্যে তিনি বাংলাদেশের সামগ্রিক হালচালই নিয়ে এসেছেন। তার উল্লেখিত পরিস্থিতি বর্তমান থাকায় দেশে কখনওই সঠিকভাবে বিদেশি সাহায্য সহযোগীতা কাজে লাগানো যায়নি। এখানে, দানের স্বার্থ ও গরীবের উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় রাখলে পুরো বইটি আত্মস্থ করা সহজ হবে।

আমরা দেখেছি কোনো একটি দেশের ইতিহাসের কালপর্বে অর্থনীতির সিদ্ধান্তকে পর্যালোচনা করতে হয়, কারণ বর্তমান কাঠামোটি তখন আর কাজ করে না, আর ঠিক তখনই অতীতে এই সমস্যাটি নিয়ে যারা আলোকপাত করেছিলেন তাদের কাছে ফিরতে হয়। আকবর আলী খানের বইটি সেই তালিকাতেই পড়ে, কারণ এর আবেদন বাংলাদেশেকে সক্ষম করে তোলার প্রতি।

দক্ষিণ এশিয়াকে বোঝার জন্য বইয়ের নাম প্রবন্ধ “পরার্থপরতার অর্থনীতি” পাঠ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দানের মধ্যে কী কোনো স্বার্থ আছে? রাজা হর্ষবর্ধনের দান-খয়রাত নিয়ে আলোচনা থেকে উন্নত বিশ্বের পক্ষ থেকে তৃতীয়বিশ্বে গরীবদের উন্নয়নের জন্য যে দান দেওয়া হয় তার উপযোগীতা কতদূর? এখানে আবার এ প্রশ্নটি আসে দাতাসংস্থাগুলো যে সাহায্যসহযোগীতা দেয় সেগুলোর কতটুকু গরীবদের হাতে যায়? আর সবচেয়ে বড় কথা এর ফলে দরিদ্রদের ভাগ্যের চাকা কতটুকু ঘোরে? আর দানের লক্ষ্যগুলো কী, কী? প্রবন্ধটিতে এরকম অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন লেখক।

তবে সব বিবেচনা শেষে একটি সিদ্ধান্ত টেনেছেন তিনি, সেটির মূল বক্তব্য হলো, দান যেন গরীবদের ভাগ্যের উন্নতি ঘটায়, নাহলে সেটির সুফল পাওয়া যাবে না। প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে ডক্টর মোহাম্মদ ইউনূসের আত্মজীবনী থেকে উদ্ধিৃতি দিয়েছেন তিনি, “গ্রেশামের সনাতন বিধির মত এটি মনে রাখা ভাল যে, উন্নয়নের জগতে একই কর্মসূচীতে যদি গরীবদের সাথে যারা গরীব নয় তাদের একত্রিত করা হয়, তবে যারা দরিদ্র নয় তারা দরিদ্রদের এবং যারা দরিদ্র তারা হতদরিদ্রদের বঞ্চিত করবে এবং এ পরিস্থিতি চলতেই থাকবে যদি প্রথমেই উপশমমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়। যা ঘটবে তা হল গরীবদের নামে যারা গরীব নয় তারা সকল ‍সুবিধা ভোগ করবে।” Yunus, Muhammad, Bankar to the poor (Dhaka university press Ltd, 1999)

এই কয়েকটি বাক্যে তিনি বাংলাদেশের সামগ্রিক হালচালই নিয়ে এসেছেন। তার উল্লেখিত পরিস্থিতি বর্তমান থাকায় দেশে কখনওই সঠিকভাবে বিদেশি সাহায্য সহযোগীতা কাজে লাগানো যায়নি। এখানে, দানের স্বার্থ ও গরীবের উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় রাখলে পুরো বইটি আত্মস্থ করা সহজ হবে।

আরেকটি অধ্যায় ““শুয়রের বাচ্চাদের” অর্থনীতি”” এর মূল প্রতিপাদ্য হলো প্রশাসনের দুর্নীতি। আমাদের পিছিয়ে পড়ায় এর অবদান কম তো নয়ই বরং খুবই বৃহৎ। ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা মাইকেল ক্যারিটের অনুপ্রেরণায় লেখা এই প্রবন্ধটির বিস্তার সেই চাণক্যের অর্থশাস্ত্র পর্যন্ত।

“সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি” নামক অধ্যায়ে, ““সংস্কারকে ব্যাভিচারের সাথে তুলনা করে জনৈক ব্যক্তি বলেছেন : “যারা ব্যভিচার করে তারা কখনও এ সম্পর্কে উচ্চবাচ্য করে না, যারা পারে না তারাই এ নিয়ে ফরফর করে।” আকবর আলী খানের এই ব্যক্তির উল্লেখে নিজের বক্তব্য পেশ করায় দুইটি জিনিস আমাদের বর্তমান দেশের পরিস্থিতিকেও ভালোভাবেই ইন্ডিকেট করছে, এক, সংস্কার রাজনৈতিক, আবার তার অর্থনীতিও আছে। মানে রাজনৈতিক সংস্কারের ভালোমন্দ দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। এখন আমরা নিজেদের কতখানি বোধবুদ্ধি নিয়ে এই সংস্কারের সাথে বোঝাপড়া করব, তাতেই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

রাজনীতি জনগণের, তাই তাদের সিদ্ধান্তই আসল হওয়ার কথা। যদিও আমাদের ইতিহাস সেই সাক্ষ্য দেয় না। কিন্তু এর সাথে প্রবন্ধটির এই বাক্যটির দিকেও মনোযোগ দেওয়া ভালো হবে, “কিন্তু ভাল অর্থনীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাল রাজনীতি নয়। যে ধরণের সংস্কার ভোটারদের আকৃষ্ট করে না, সেই ধরণের সংস্কার রাজনীতিবিদ্‌দেরও আকর্ষণ করে না।” এই কথাটি ভালোভাবে ধারণ করতে পারলে সহজেই কোন দল বা ক্ষমতায় আসীন পক্ষ জনতুষ্টিমূলক কাজকর্ম করছে কী-না সেটি সহজেই ধরে ফেলা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা যায়।

বাকি প্রবন্ধগুলোও এখানে উল্লেখিত প্রবন্ধগুলোর ধারাবাহিকতায় পুরনো সব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছেন লেখক। সমস্যাগলো যে পুরনো সেটি প্রবন্ধগুলোর নামেই স্পষ্ট চিহ্নিত, যেমন এখানে কয়েকটি, “লিঙ্গ-ভিত্তিক বৈষম্যের অর্থনীতি” “শোষণের রাজনৈতিক অর্থনীতি” “শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অসাম্য”। এগুলো থেকে বেরোনোর পথ সন্ধান করেছেন তিনি। আকবর আলী খানের হিউমার অসাধারণ, তিনি বইটিতে এমনসব জটিল ইতিহাস ও অর্থনীতিবিদদের উদ্ধৃতি ও তাদের কৃত সমস্যাচিহ্নিতকরণ হাজির করেছেন এমন সাধারণের বোধগম্য ভাষায় যে পণ্ডিত থেকে সাধারণ পাঠক সবার কাছেই অসাধাণ পাঠযোগ্যতা অর্জন করেছে “পরার্থপরতার অর্থনীতি”। আর প্রতি অধ্যায়েই তথ্যসূত্র নির্দেশ করা ও বইয়ের শেষে পরিভাষাকোষ যুক্ত করায়, যারা আরো সব তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদদের লেখা পড়তে চান, তাদের উপকৃত করবে।

বাংলাদেশকে গড়তে এই ক্লাসিক বইটির কাছে বারেবারেই ফিরতে হবে।

পরার্থপরতার অর্থনীতি
লেখক : আকবর আলি খান
বিষয় : অর্থনীতি
প্রকাশকাল : প্রথম প্রকাশ ২০০০, ২৩তম মুদ্রণ ২০২৩
প্রকাশক : দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউ পি এল)
দাম : ৪০০ টাকা ২০% ছাড়ে ৩২০ টাকা।

বইটি কিনতে চাইলে:

পরার্থপরতার অর্থনীতি – বাহিরানা

(Visited 7 times, 1 visits today)

Leave a Comment