বাহিরানা

রায়হান রাইনের অতীশ দীপঙ্কর রচনাবলি: নতুন চিন্তার পথ

রায়হান রাইনের অতীশ দীপঙ্কর রচনাবলি বই রিভিউয়ের প্রচ্ছদ

তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের বিস্তারে ও রক্ষায় যে দুইজন বৌদ্ধ মাধ্যমিকবাদী বাঙালি আচার্যের প্রভাব সর্বাধিক তারা হলেন আচার্য শান্তরক্ষিত (৭২৫-৭৮৮) ও অতীশ দীপঙ্কর (৯৮২-১০৫৪)। অতীশ দীপঙ্কর জন্মেছিলেন বাংলাদেশের বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে। রাজা ঠিস্রোং দেচানের আমন্ত্রণে শান্তরক্ষিত অষ্ঠম শতাব্দীর শেষে তিব্বতে যান। তাদের রচনাবলীর সঙ্গেও বাংলা ও তিব্বত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। শান্তরক্ষিত ও অতীশ দীপঙ্করের বহু মূল্যবান রচনা বাংলা ও তিব্বতে রচিত হয়েছে। শান্তরক্ষিত নাগার্জুনের মাধ্যমিকবাদী ধারার ভাষ্যকার, নাগর্জুনের সঙ্গের দিগনাগ ও ধর্মকীর্তীর চিন্তার সমন্বয়ও ঘটান তিনি। তার গ্রন্থ মধ্যমকালঙ্কার: মাধ্যমিক পথের ভূষণ এর মূলসূত্র “না এক না বহু” তত্ত্বটি এই ধারা থেকেই আগত। রায়হান রাইনের অতীশ দীপঙ্কর রচনাবলী থেকে আমরা জানতে পারি, শান্তরক্ষিতের আগেই তীব্বতে বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সপ্তম শতাব্দীর আগেই বৌদ্ধমত একটি ভিত্তি পেয়েছিল তিব্বতে, কয়েটি বিহারও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। তবে শান্তরক্ষিত তিব্বতের তখনকার স্থানীয় দেব-দেবীদের নিয়ে গঠিত পোনধর্ম-এর প্রভাব কমিয়ে বৌদ্ধধর্মকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত করে তোলেন। তিনি তিব্বতে যাওয়ার আগে নালন্দা বিহারের আচার্য ছিলেন এবং তিব্বতে বিখ্যাত সামিয়ে বিহার নির্মাণ করেন। তিনি সেখানে আচার্য বেধিসত্ত্ব উপাধি পেয়েছিলেন। শান্তরক্ষিত মগধের রাজার গুরু ছিলেন।

বাঙালি জাতির প্রজ্ঞা ও সংস্কৃতিকে নিয়ে যারা ঔপনিবেশিক শিক্ষার প্রভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন তাদের মোক্ষম জবাব যেমন অতীশ দীপঙ্কর, সেইসঙ্গে তার রচনাবলীর মধ্যে থাকা নতুন দর্শন আজও নতুন পথের দিশা দিতে পারে। নাগার্জুনের শূন্যবাদ পাশ্চাত্যের উত্তরাধুনিকতাবাদ চর্চার মধ্যে নতুন জ্ঞান যুগিয়েছে, কিন্তু বাংলায় তার চর্চা নেই, থাকলে তারই ধারার শান্তরক্ষিতের, অতীশ দীপঙ্করের চর্চাও থাকত।

শান্তরক্ষিতের প্রচারিত লামাবাদ ও সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধধর্মই প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সেই একই তিব্বত দেশে, নবম শতাব্দীর রাজা লাংদারমা-এর রাজপদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর। গুরুত্ব হারানো পোনধর্ম আবার রাষ্ট্রীয় গুরুত্বসহ ফিরে আসে রাজার সেই ধর্মে আনুগত্যের কারণে। সেই রাজার খুন হওয়ার কারণে আবারও দৃশ্যপটে বৌদ্ধধর্মের সম্ভবনা দেখা দেয়। কিন্তু তখন একজন গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধাচার্যের প্রয়োজন পড়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাসে অতীশ দীপঙ্করের তিব্বত পাঠপর্ব। অতীশ দীপঙ্কর তখন মগধের রাজা মহীপালের আমন্ত্রণে বীক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ পদে যোগ দিয়েছিলেন। তখন সেখানে ১০৮টি বিহারের দায়িত্ব ছিল তার উপর, শিক্ষার্থী প্রায় আট হাজার। সেসময়ই তিনি তিব্বতে যান রাো এশেওদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে, এই রাজা পোনধর্মের এক রাজার কারণে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। দীপঙ্কর তিব্বতে গিয়ে কদমপা বৌদ্ধমত প্রতিষ্ঠা করেন এবং বৌদ্ধধর্মকে স্বরূপে ফিরিয়ে আনেন। তার বিখ্যাত রচনা বোধি-পথ-প্রদীপ ও একইগ্রন্থের ভাষ্যগ্রন্থ বোধি-মার্গ-প্রদীপং-পঞ্জিকা-নাম রচনা করেন ১০৪২-৪৩ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি বোধি-পথ-প্রদীপ লিখেছিলেন কৈলাস পাহাড়ের কাছে থোলিং বিহারে।

রায়হান রাইনের অতীশ দীপঙ্কর রচনাবলি গ্রন্থটিতে এই বৌদ্ধাচার্যের সব লেখাই দুই মলাটবদ্ধ হয়েছে। লেখাগুলোর অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন রায়হান রাইন। তিনি নিজে কবি ও কথাসাহিত্যিক, তাই তার অনুবাদও শিল্পরসসম্মৃদ্ধ। তিনি বাংলার দর্শন: প্রাক্‌-উপনিবেশ পর্ব বইটিরও রচয়িতা, তাও এই বইটিতে কাজে লেগেছে।  তবে অতীশ দীপঙ্করের রচনার অনুবাদ ও সেইসঙ্গে সেসবের রায়হান রাইনকৃত ভূমিকা-ব্যাখ্যায় বিশেষ করে বৌদ্ধ দর্শনচিন্তা ও সাহিত্যের সঙ্গে যারা পরিচিত নন, তারাও অনায়াসে এই বইয়ের লেখাগুলো পড়তে পারবেন। বইটিতে বোধি-পথ-প্রদীপ, চর্যা-সংগ্রহ-প্রদীপ, সত্যদ্বয় অবতার, মধ্যমকোপদেশ, চর্যা-গীতি, সংসার-মনোনির্যাণীকার-গীতি, বোধিসত্ত্ব-চর্যা সূত্রীকৃতাববাদসহ অতীশ দীপঙ্করের সব লেখাই রয়েছে । তার বাংলা ও তিব্বত পর্বের লেখাগুলো একসঙ্গে পাওয়া অতীশ দীপঙ্কর চর্চাকে যে সম্মৃদ্ধ করবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। অতীশ দীপঙ্করের চিন্তা আজো যে শুধু প্রাসঙ্গিক তাই নয়, এতে রয়েছে নতুন চিন্তার সম্ভাবনা, যা বর্তমান বিশ্বকে নতুনভাবে দেখার পথ তৈরি করতে পারে।

বৌদ্ধ ইতিহাসে তিব্বতের সঙ্গে বাংলার মিল হলো বাংলাতেও শত শত বছর বৌদ্ধধর্ম স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত ছিল, আমাদের সংস্কৃতির চিন্তাধারায় এখনও সেই সংস্কৃতি ও চিন্তার কণাগুলো খুঁজলে পাওয়া অসম্ভব নয়। তবে তিব্বতে বৌদ্ধধর্মকে নিশ্চিহ্নের হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন দুই বাঙালি বৌদ্ধাচার্য, আর এতে বাংলার সঙ্গে তফাৎ রচিত হয়েছিল তিব্বতের বৌদ্ধ ইতিহাসে। যা এই দুই আচার্যের নিজ ভূমিতে হয়নি। ইতিহাস বিচিত্রভাবে নিজেকে প্রকাশ করে এবং কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকেই সে হারিয়ে যেতে দেয় না, অতীশ দীপঙ্করের লেখাপত্র তিব্বতে সংগৃহীত হওয়া তার বড় প্রমাণ। ভিন দেশের, ভিন জাতির এক শিক্ষকের লেখা এত সম্মানের সহিত যে শতক শতক অন্য এক জাতির দ্বাো সংরক্ষিত হতে পারে তার নজির কমই আছে পৃথিবীতে।

বাঙালি জাতির প্রজ্ঞা ও সংস্কৃতিকে নিয়ে যারা ঔপনিবেশিক শিক্ষার প্রভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন তাদের মোক্ষম জবাব যেমন অতীশ দীপঙ্কর, সেইসঙ্গে তার রচনাবলীর মধ্যে থাকা নতুন দর্শন আজও নতুন পথের দিশা দিতে পারে। নাগার্জুনের শূন্যবাদ পাশ্চাত্যের উত্তরাধুনিকতাবাদ চর্চার মধ্যে নতুন জ্ঞান যুগিয়েছে, কিন্তু বাংলায় তার চর্চা নেই, থাকলে তারই ধারার শান্তরক্ষিতের, অতীশ দীপঙ্করের চর্চাও থাকত। নিজভূখণ্ডের চিন্তাকে অন্যের কাছ থেকে গ্রহণেই আমরা সিদ্ধ—এটাই প্রমাণিত হচ্ছে। রায়হান রাইনের অতীশ দীপঙ্কর রচনাবলি সেই নিজদেশ বিমুখতাকে প্রশমিত করে নতুন নতুন ভাবনা ও চর্চার দিশা দিতে পারবে বলেই মনে হয়।

অতীশ দীপঙ্কর রচনাবলি
অনুবাদ ও সম্পাদনা: রায়হান রাইন
বিষয়: বৌদ্ধ দর্শন
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশকাল: ২০২০
মূল্য: ৫৫০ টাকা।


মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত লেখাগুলো

বাহিরানায় জনপ্রিয়

বাহিরানায় বিভাগসমূহ