কবি ও ঔপন্যাসিক রায়হান রাইন অতীশ দীপঙ্কর ও শান্তরক্ষিত-এর লেখার অনুবাদের মাধ্যমে বাংলার চিন্তাপদ্ধতি আবিষ্কারে যে অধ্যবসায়, বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন একইরকম পূর্ণমনোযোগ ও বিজ্ঞতায় বাংলার প্রাক্-ঔপনিবেশিক পর্বের দর্শনকে ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করে তার সারসহ তুলে এনেছেন। রায়হান রাইনের বাংলার দর্শন: প্রাক্-উপনিবেশ পর্ব বইটি অন্য বইগুলোর মতোই জটিলতামুক্ত ও ভূমিকা-ব্যাখ্যায় সম্মৃদ্ধ।
রায়হান রাইনের বাংলার দর্শন: প্রাক্-উপনিবেশ পর্ব বইটির পাঠ প্রবেশের সময় ভারতীয় দর্শন ধারার কয়েকটি মৌল বিষয়ও একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে। তাতে ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে বাংলার দর্শনের মিল-অমিলটি দেখা যাবে ভালো করে। ভারতীয় দর্শন আস্তিকদর্শন ও নাস্তিকদর্শন দুই ভাগে বিভক্ত, আস্তিক দর্শন ৬টি, সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা এবং বেদান্ত, এগুলোকে একত্রে ষড়দর্শন বলা হয়, আর নাস্তিক দর্শন ৩টি হলো চার্বাক, বৌদ্ধ এবং জৈন। এখানে শব্দ দুটি ধর্মে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী অর্থে নয়, শব্দগুলো দ্বারা বোঝায় বেদে বিশ্বাসী আস্তিক ও বেদে অবিশ্বাসী অর্থে নাস্তিক। আবার ভারতীয় দর্শন প্রধাণত ধর্মনির্ভর, পাশ্চাত্যের মতো ধর্মনিরপেক্ষ নয়। এই দর্শনগুলোর মধ্যে দুইটি বিশেষ বিষয় দেখা যায়, প্রথমটি হলো, সমকালীন অন্য দর্শনমত সম্পর্কে সম্যকভাবে ওয়াকিবহাল হওয়া যাকে বলা হয় পূর্বপক্ষ, সম্যকভাবে জেনে নিজের মত ব্যক্ত করা, মানে অপর দর্শনের মতকে খণ্ডন করা, তাকে বলা হয় উত্তরপক্ষ। এবং দ্বিতীয় বিষয়টি হলো উদ্দেশ্য, এই দর্শনগুলোর উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য হলো মানবজীবনের দুঃখের অবসান। পাশ্চাত্যের সঙ্গে এখানেও তফাৎ ভারতীয় দর্শনে। তবে বাংলার দর্শন কেমন? এই প্রশ্নটি এসে যায়, তবে এর উত্তরের আগে আরো দুইটি বিষয় দেখা উচিত, এক, বাংলার দর্শনে ভারতীয় দর্শনের অন্তসার রয়েছে, কেননা বাংলা ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে ভাগ হয়েছে, এর আগের হাজার বছর এই ভূখণ্ড ভারতের অংশ ছিল, দুই, ভারতীয় দর্শন যেরকম ধর্মনির্ভর বাংলার দর্শনে তা থাকলেও সেটা অনেক চড়াই-উৎরাই এর মধ্য দিয়ে গিয়ে নব এক রূপ পেয়েছে। বাংলার দর্শনে ইসলামী ধর্ম-দর্শন চিন্তা-ঐতিহ্যও এসে মিশেছে, আর তা একে নবরূপ পেতে সাহায্য করেছে বেশি। কারণ ষোড়শ শতকে বাংলার ভাবজগত যে চৈতন্যদেবের প্রেমভাবের স্ফুরণের সাক্ষী হয়েছিল সেই চৈতন্যদেব সময় ও কাল প্রভাবে ইসলামের ভাবকে আত্মস্থ করেছিলেন তার প্রেমতত্ত্বে, যাকে আমরা সুফিপ্রভাব বা সরাসরি ইসলামি প্রভাব যা হিসেবেই পড়ি না কেন।
এই দেহাত্মবাদটি কী? এর মানে বুঝতে আধ্যাত্মবাদ কী তা জানা প্রয়োজন, আধ্যাত্মবাদে আত্মাকেই মূল ধরা হয় কিন্তু দেহাত্মবাদে দেহের মধ্যেই এই ব্রহ্মাণ্ডের মূল বা ব্রহ্মাণ্ড প্রকাশিত, তা ধরা হয়। ভারতীয় দর্শনভাবিত উপনিষদ ও বেদান্তের আধ্যাত্মবাদের সঙ্গেও বাংলার দর্শনের বিরোধ আছে, কারণ বাংলার দর্শন দেহাত্মবাদী। আধ্যাত্মবাদ যেখানে অমর-অজর আত্মাই সবকিছু বলে মানে সেখানে বাংলার দর্শন দেহ দিয়েই ব্রহ্মাণ্ডের বিচার করে হয়ে যায় দেহাত্মবাদী। বাংলার দর্শন তাই পশ্চিমের শুধুমাত্র যুক্তির উপর নির্ভর করার চেয়ে আলাদা ও একইসাথে ভারতীয় দর্শনের থেকেও আলাদা।
তাই চৈতন্যদেব বাংলার দুই বৃহৎধর্ম—হিন্দু ও মুসলমান—অনুসারীদের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। তারই মধ্যে ভাবরসে উজ্জ্বল ফুল ফোটেছিল মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীতে। তখন সময়টি ছিল মুসলমান শাসনের, সে কথাটা ভেবে দেখতে হবে—মুসলিম শাসকবর্গ চৈতন্যের ভক্তিমার্গের ভাববাহিত সেই পদাবলীকে বাধা তো দেনই বরং তাকে আরো সুঘ্রাণ ছড়াতে সাহায্য করেছিলেন। এর মধ্যদিয়ে মধ্যযুগে বাংলা ভাষা আরো বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। ভাষাবিকাশেও মুসলিম শাসনের বিশেষ অবদান আছে। এর সঙ্গে বলা যায়, প্রেমভাবের সঙ্গে ইসলামের কোনো বৈরিতা নেই বরং এই ভাববস্তুটি ইসলামের গোড়ার কথা। দর্শন ও কবিতার বৈরিতা তত্ত্ব এই মধ্যযুগে অচল হয়ে যায়। কবিতার সঙ্গে দর্শনের বিরোধ তো নেইই, বরং উল্টোটাই সত্য, দর্শন ছাড়া কবিতার চলে না। এরই ধারাবাহিকতায় এসেছিলেন লালন। লালনে চৈতন্য, সুফিবাদ, ইসলাম, ভারতীয় দর্শন মিলেমিশে একাকার, তার সঙ্গে ভাবের সখ্য পাওয়া যায় সন্ত কবির-এর। লালনে বাংলার দর্শন তার স্বরূপ প্রকাশ করেছে গানে কিন্তু তাতে ভারতীয় দর্শনের পূর্বপক্ষ ও উত্তরপক্ষ অবলীলায় নতুন গঠনে ভাস্বর হয়েছে, প্রতিটি দর্শনকথাই যা গানে প্রকাশিত হয়েছে তাতে সঙ্গোপনে মিশে আছে প্রতিপক্ষের ভাববিচার ও তার ভাব নির্ণয়ের পর উত্তর। যা এমনকি আমাদের কবি গানের মধ্যেও দেখা যায়, যদিও তা অনেক খোলামেলা, দর্শনের মতো নিগূঢ় নয়।
রায়হান রাইন বাংলার দর্শন: প্রাক্-উপনিবেশ পর্ব বইটিতে চৈতন্যদেবের ভাবান্দোলন ও রঘুনাথ শিরোমণির নব্য ন্যায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তার মতে বাংলার দর্শন এই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও জীবনপ্রবাহজাত, ব্রিটিশ আমলের আগের দর্শন নিয়েই মূলত বইটির আলোচনা। ব্রিটিশ আমলে এই দর্শনকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। বাংলার দর্শন নিয়ে যদি সহজভাবে বলা যায় তা হলো, এই বাংলা ভূভাগের জনমানুষের জীবন থেকে জাত যে দর্শনে বৌদ্ধ সহজিয়া মত, ভারতীয় দর্শন ও ইসলাম এসে মিশেছিল, যা তাকে পূর্ণাঙ্গ অবয়ব দিয়েছে, তাই বাংলার দর্শন।
বইটিতে বাংলার প্রাচীন আদি অধিবাসীদের নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন রায়হান রাইন। এ বিষয়ে প্রখ্যাত ইতিহাস গবেষক অতুল সুর-এর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন তিনি বাংলার আদি অধিবাসীদের সম্পর্কে, বাংলার আদি অধিবাসীরা ছিল অস্ট্রিক ও আলপীয় জনগোষ্ঠীর মানুষেরা, তাদের সঙ্গে মিশেছিল দ্রাবিড়েরা। তাদেরকে আর্যরা কীভাবে দেখত এবং বাংলার আদি ভাষাকে কীভাবে দেখা হতো তা নিয়ে অতুল সুর বলছেন, “উপনিষদে অসুরদের প্রসঙ্গ এসেছে এবং তা থেকে এসব জাতির ধর্মবিশ্বাসেরও প্রমাণ পাওয়া যায়। মহাভারতের আদিপর্বে বলা হচ্ছে, অসুররাজ বলির পাঁচ পুত্রের নামে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্ম রাজ্যের নামকরণ করা হয়েছে। বৌদ্ধদের প্রাচীন গ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প-এ বলা হয়েছে, এ দেশের ভাষা হলো অসুর জাতির ভাষা। (অতুল সুর)।
আলপীয় জনগোষ্ঠীকেই অসুর বলা হয়েছে, বৈদিক বা আর্যদের থেকে জাতি ও সংস্কৃতি দিয়ে বাংলার মানুষেরা যে পৃথক এবং আর্যদেরকে যে অসুরেরা পরাজিত করেছিল তারও বিবরণ রয়েছে বৈদিক ব্রাহ্মণেই, তা নিয়ে আরেকটি উদ্ধৃতি, “অসুরদের সংস্কৃতি ছিল বৈদিকদের থেকে পৃথক। কেবল যে পৃথক ছিল তা-ই নয়, উভয় জাতির মধ্যে বিরোধী মনোভাবও বেশ স্পষ্ট। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ অসুরদের সঙ্গে দেব তথা আর্যদের লড়াইয়ের তথ্য পাওয়া যায় এবং এতে অসুরেরা যে আর্যদের পরাজিত করেছে সেই বিবরণও আছে। এ পরাজয়ের কারণ হিসেবে তারা বলেছে, অসুরদের মতো রাজা তাদের নেই। (অতুল সুর)
বাঙালি জাতিকে তার মূল থেকে সরিয়ে দেওয়ার মোক্ষম পথ হচ্ছে তাকে তার দর্শন থেকে সরিয়ে দেওয়া। অতুল সুর যে ঐতরেয় ব্রাহ্মণের বিজয়ী অসুরদের কথা বলেছেন সেই একই অসুরদের ভয়ে দ্বিগবিজয়ী আলেকজান্ডার বাংলায় আক্রমণ করতে সাহস করেননি, সে ইতিহাস আমরা গ্রিক ইতিহাসবিদ মেগাস্থিনিস-এর কাছ থেকে জানতে পারি। তারই ধারাবাহিকতা পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। ভারতীয় উপমহাদেশে আমরাই একমাত্র যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, এই সহজ সত্যটি আহমদ ছফা প্রথম অবহিত করেছিলেন।
রায়হান রাইনের বাংলার দর্শন: প্রাক্-উপনিবেশ পর্ব নিয়ে মূল কথায় আসি, দেহাত্মবাদ বিষয়টি না বুঝলে বাংলার দর্শন সম্যকভাবে বোঝা যাবে না, ইউরোপীয় দর্শন ঐতিহ্য দিয়ে দেহাত্মবাদ বোঝা সম্ভব নয়, “কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, দেহাত্মবাদ কি ভাববাদ, নাকি বস্তুবাদ? এটা কি জ্ঞানতাত্ত্বিক মত, নাকি আদিবিদ্যক? এসব পারিভাষিক অর্থ আরোপ না করে তাঁরা যদি দেখতে চেষ্টা করেন, কীভাবে প্রাচীন কাল থেকে এ অঞ্চলের সংস্কৃতিতে দেহকে অর্থপূর্ণ করা হয়েছে, কীভাবে দেহের অনুষঙ্গে জগৎকে বুঝতে চাওয়া হয়েছে, কীভাবে এর সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে ভাষাকে একং কীভাবে একে সমস্ত ভাবসত্তার আশ্রয় হিসেবে দেখা হয়েছে, তাহলেই হয়তো দেহাত্মবাদের প্রকৃত তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব। (বাংলার দর্শন: প্রাক্-উপনিবেশ পর্ব)
রায়হান রাইনের মতটিকে খুঁটিয়ে দেখলে আমরা দেখতে পাই বাংলার দর্শনকে বুঝতে হলে আমাদেরকে বাংলার পদাবলী, গাঁথা, মঙ্গলকাব্য থেকে বাউল তত্ত্ব, সুফিবাদ—সব জায়গাতেই যেতে হবে। আর ইতিহাস তো রইলই এতে।
কিন্তু এই দেহাত্মবাদটি কী? এর মানে বুঝতে আধ্যাত্মবাদ কী তা জানা প্রয়োজন, আধ্যাত্মবাদে আত্মাকেই মূল ধরা হয় কিন্তু দেহাত্মবাদে দেহের মধ্যেই এই ব্রাহ্মাণ্ডের মূল বা ব্রহ্মাণ্ড প্রকাশিত, তা ধরা হয়। ভারতীয় দর্শনভাবিত উপনিষদ ও আস্তিক দর্শন বেদান্তের আধ্যাত্মবাদের সঙ্গেও বাংলার দর্শনের বিরোধ আছে, কারণ বাংলার দর্শন দেহাত্মবাদী। আধ্যাত্মবাদ যেখানে অমর-অজর আত্মাই সবকিছু বলে মানে সেখানে বাংলার দর্শন দেহ দিয়েই ব্রহ্মাণ্ডের বিচার করে হয়ে যায় দেহাত্মবাদী। বাংলার দর্শন তাই পশ্চিমের শুধুমাত্র যুক্তির উপর নির্ভর করার চেয়ে আলাদা ও একইসাথে ভারতীয় দর্শনের থেকেও আলাদা। ভুলে গেলে চলবে না এই ভূখণ্ডের শান্তরক্ষিত ও অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধদর্শনে নব ব্যাখ্যা হাজির করেছিলেন। বাংলার দর্শনের আদিরূপে বৌদ্ধ সহজিয়াদের চর্যাগীতিকায় এবং বৌদ্ধদর্শনেরর প্রভাব সর্বাধিক, এতে আগে বলা ভারতীয় দর্শনের প্রকাশপদ্ধতি—পূর্বপক্ষ ও উত্তরপক্ষ—তো আছেই এবং এর সঙ্গে ইসলামের সুফিবাদের মিশ্রণ নিয়ে এই দর্শন এখনও জীবন্ত। কারণ এই দর্শন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পর্বে ও এর পরে প্রায় স্থিমিত হয়ে গেছে ঠিকই কিন্তু এর প্রবাহমানতা রয়ে গেছে পুরোমাত্রায় এবং তা জ্বলে ওঠার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে শুধু।
ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও আদর্শ এই দর্শনকে মূল স্রোত থেকে বের করে দেওয়ার জন্য কিছু শব্দ আবিষ্কার করেছে—যেমন লোকদর্শন, লোকসংস্কৃতি, লোকধর্ম—সেসব আদতে বাংলার মূল দর্শনকে স্থগিত ও পঙ্গু করার জন্যই। এই শব্দগুলো যে রূপেই আগে-পরে ব্যবহৃত হোক না কেন, এগুলোর বর্তমান অর্থ হলো, যা সমাজের মূলস্রোতের নয়। এতে যা ক্ষতি হচ্ছে তা হলো বাংলাদেশের বিশ্বদর্শন পাশ্চাত্যপ্রভাবিত হয়ে গেছে, কারণ বিশ্বদর্শন পুরোপুরি দর্শন নির্ভর, জ্ঞান ও সৃষ্টির প্রতিটি শাখা দর্শন দ্বারা প্রভাবিত, এর সাক্ষাৎ উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই সবচেয়ে প্রকটভাবে দৃশ্যমান, চারপাশের চেয়ে দেখলে যে উঁচু ইমারতগুলো আমরা দেখি তাতে বাংলার নিজস্বতা কোথায়? নেই, কারণ আমাদের নিজস্ব দর্শনের উপর নির্ভরতা ও একে মূলস্রোতের বাইরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টায় নিজস্ব স্থাপত্যবিদ্য দাঁড়াতে পারেনি, তাই লুই আই কানের নকশায় সংসদভবন তৈরি হয়েছে, যদিও তা অনিন্দ্য সুন্দর কিন্তু তাতে বাংলাদেশ কোথায়? নেই। একই কথা খাঁটে চিত্রকলার ক্ষেত্রে, চিত্রকলা ও ভাস্কর্যতে ইউরোপের আধুনিকতাবাদ ও বিমূর্ততাবাদ আমাদের নিজেদের দেশ ও সংস্কৃতিকে পাঠ করতে দেয় না। ইউরোপের এক্সপ্রেশনিজম সরাসরি ক্রিশ্চান নি:ঙ্গতার দর্শন থেকে উদ্ভূত, ইউরোপের সেই একাকীত্বময় বরফঢাকা নিঃসঙ্গতা ও ক্ষয়ের অনুভূতি কী বাংলাদেশে পাওয়া সম্ভব? নয়। তবু তার পেছনে ছুটে লোকসংস্কৃতি ও দর্শন নামে আমরা নিজেদেরকেই আদতে আড়াল করে ফেলছি বিশ্বসভা থেকে।
চিন্তার এই ঘেরাটোপ থেকে বেরুতে নিজেদের দর্শন চর্চার বিকল্প নেই, পাশ্চাত্যও গ্রীকদর্শনের মাধ্যমের নিজেদের বর্বরদশা কাটিয়েছি। সব জাতিই বর্বরদশা থেকে সভ্য হয়েছে, আমরাও হয়েছি, তবে আমরা আটকে আছি মৌলিকতা ও নিজস্বতাহীনতার এক চক্রে যা আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনীতি, অর্থনীতি—সবকিছুকেই প্রভাবিত করে দমিয়ে রাখছে। আমাদের পথ বের করতে হলে আমাদের কী আছে তা জানা ও চর্চার প্রয়োজন, বাংলার দর্শনই সেই নতুন দিশা দিতে পারে আমাদের, যার মধ্যদিয়ে আমরা পাঠ করতে পারি নিজেদের ও আমাদের চারপাশকে, তৈরি হতে পারে মৌলিক এক বিশ্বদর্শন—যা আমাদের ছাড়া আর কারো নেই। রায়হান রাইনের বাংলার দর্শন: প্রাক্-উপনিবেশ পর্ব সেই চর্চাকে বেগবান করবে এই প্রজ্ঞা বইটির মধ্যেই নিহিত।
বাংলার দর্শন: প্রাক্-উপনিবেশ পর্ব
লেখক: রায়হান রাইন
বিষয়: দর্শন
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশকাল: ২০১৯
মূল্য: ৭০০ টাকা।