জয় সেন
উর্দু সাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক সাদাত হাসান মান্টো। তার গল্পগুলো নির্মিত হয়েছে বাস্তবের জমি থেকে, বিশ্বসাহিত্যে প্রথম সারির এই কথাসাহিত্যিকের গল্পগুলো বাস্তবতা বা রিয়েলিটির সাথে একরমভাবে যুক্ত কেন? এই প্রশ্ন আসে। তবে তাকে যারা পড়েছেন বা পড়তে চান তাদের আবারও পড়া উচিত যারা পড়েননি তাদের মতোই। যারা মূল বা ইংরেজির বাইরে বাংলায় পড়তে চান, তাদের জন্য মানসম্মত অনুবাদের প্রয়োজন, আলোচ্য বই মান্টো’র “কালো সালোয়ার ও অন্যান্য গল্প”-তে জ্যোতির্ময় নন্দী মানসম্মত অনুবাদের কৌটাটি ভরাট করেছেন। বইয়ের ভূমিকায় বলা আছে “মান্টোর প্রায় তিনশ গল্প থেকে মাত্র এক ডজন গল্পের অনুবাদ এখানে সংকলিত হয়েছে।”
বিখ্যাত, প্রখ্যাত, কমপঠিত কিন্তু পঠিত হওয়ার প্রয়োজন এরকম গল্পগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বিষয়বস্তুগুলো হচ্ছে দাঙ্গা, দেশভাগ, সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। অনেকগুলোই কোনো না কোনো ভাবে পড়া, আবার কয়েকটি নতুন। বইয়ের কয়েকটি বিখ্যাত ও কম শোনা যায় এরকম গল্পের নাম দেখা যেতে পারে, “১৯১৯ সালের কথা” “সেই মেয়েটি” “টোবাটেক সিং” “ঠান্ডা গোশত” “আর্টিস্টদের কথা” ও “কালো সালোয়ার”।
একসময় সে আর নিরব থাকতে পারে না, বলে ফেলে, লাঁকা কথিত সেই রিয়েল-এর কথা—দাঙ্গার সময় একটি মেয়েকে তারা কয়েকজন ধর্ষণের উদ্দেশ্যে নিয়ে গিয়েছিল, যখন স্বামীটির পালা এলো, সে দেখতে পায় মেয়েটি নড়া-চড়া করে না, এরপর সে বিস্ময়ে আবিষ্কার করে, মেয়েটি মৃত। প্রথমে তার কাছে রিয়েলিটি ফ্যান্টাসির খোলসে ঢাকা ছিল, কত্ত মজা! কিন্তু হঠাতই সেই খোলসটি ভেঙে যায়, সে মুখোমুখি হয় মৃত মেয়েটির ঠান্ডা গোশতের। সে শরীর-মন কোনোটি দিয়েই এই ব্যাপারটি সহ্য করতে পারে না, তার বাস্তবতা খানখান হয়ে যায়। এই একটি চিত্রের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ভারতের দাঙ্গা আর অবিশ্বাসের মানচিত্রটি পূর্ণ হয়ে ওঠে।
মান্টো বাস্তবতাকে পছন্দ করেন কেন? যেহেতু জাঁক লাঁকা আমাদের জানাচ্ছেন “রিয়েল” ফ্যান্টাসির আবরণে ঢাকা থাকে, তবে এই রিয়েল আমাদের জানা বাস্তবতা নয়, লাঁকার রিয়েল’কে বলা যায় “ধ্বংস”। কারণ একে মানুষ সহ্য করতে পারে না। এখানেই ফ্যান্টাসির বিষয়টি আসে, কারণ এটা ছাড়া রিয়েল-এর মুখোমুখি হওয়া অসম্ভব এক কাজ। মান্টোর “ঠান্ডা গোশত” গল্পটির কথা বলা যায়, সেখানে এক লোক ঘরে ফেরার পর তার স্ত্রীর মিলনের আহ্ববানে সাড়া দিতে পারে না, নিঃসাড় পড়ে থাকে। স্ত্রী এটা মেনে নিতে পারে না, তার উপর চড়াও হয়ে কারণ জানতে চায়, কাকে স্বামীটি তার অংশের ভাগ দিয়ে এসেছে? স্বামীটি উত্তর দিতে পারে না। একসময় সে আর নিরব থাকতে পারে না, বলে ফেলে, লাঁকা কথিত সেই রিয়েল-এর কথা—দাঙ্গার সময় একটি মেয়েকে তারা কয়েকজন ধর্ষণের উদ্দেশ্যে নিয়ে গিয়েছিল, যখন স্বামীটির পালা এলো, সে দেখতে পায় মেয়েটি নড়া-চড়া করে না, এরপর সে বিস্ময়ে আবিষ্কার করে, মেয়েটি মৃত। প্রথমে তার কাছে রিয়েলিটি ফ্যান্টাসির খোলসে ঢাকা ছিল, কত্ত মজা! কিন্তু হঠাতই সেই খোলসটি ভেঙে যায়, সে মুখোমুখি হয় মৃত মেয়েটির ঠান্ডা গোশতের। সে শরীর-মন কোনোটি দিয়েই এই ব্যাপারটি সহ্য করতে পারে না, তার বাস্তবতা খানখান হয়ে যায়। এই একটি চিত্রের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ভারতের দাঙ্গা আর অবিশ্বাসের মানচিত্রটি পূর্ণ হয়ে ওঠে।
একই ঘটনা ভিন্নভাবে আমরা “টোবাটেক সিং”-এও পাব। গ্রাম দেশ আশা-ভবিষ্যৎ-অতীত সব যেখানে শেষ হয়ে গেছে। মান্টো জানতেন ফ্যান্টাসির কথা, জানতেন বাস্তব অসহ্য, কিন্তু এর উপর থেকে আবরণ খসিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তার ভবিতব্য—তিনি এটাও জানতেন। কারণ ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিজেও এসব যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন, অন্যদের দেখেছেন কাছ থেকে। না হলে আমাদের দেশভাগ, দাঙ্গা, এর থেকে উদ্ভূত মানবিক সম্পর্কের জটিলতা—এরকম অনেক অভিজ্ঞতাকেই নতুন করে ও একটি সভ্যতার ক্ষয়ের ভেতর থেকে জানা কঠিন হতো, অন্তত অভিজ্ঞতার সাহিত্যিক ভাষাদানের বিষয়টিকে। যেগুলো হয়ে উঠেছে বিশ্বমানসের সম্পদ।
জ্যোতির্ময় নন্দী নাগরি লিপি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন গল্পগুলো, তার অনুবাদের একটি নিদর্শন দেখা যেতে পারে,
“এটা ১৯১৯ সালের কথা ভাইজান, যখন রাউলাট অ্যাক্টের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে এজিটেশন হচ্ছিল। আমি অমৃতসরের কথা বলছি। স্যার মাইকেল ওডায়ার ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া রুলসের আওতায় গান্ধীর পাঞ্জাবে ঢোকা বন্ধ করে দিল। উনি এদিকে আসার সময় পালওয়ালে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে গ্রেফতার করে বোম্বাইয়ে ফেরত পাঠানো হলো। যদ্দুর আমি বুঝতে পারছি ভাইজান, ইংরেজ যদি এ ভুল না করত তো তাদের শাসনামলের কালিমালিপ্ত ইতিহাসে জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যাকাণ্ডের মতো রক্তক্ষয়ী ঘটনার এমন বাড়বাড়ন্ত হতো না।”
(১৯১৯ সালের কথা)
মান্টোর টানটান ভাষাগঠনকে অবিকল রেখে, ভঙ্গী ও সুর যতদূর পারা যায় অক্ষুণ্ন রেখে অনুবাদ করা হয়েছে এখানে। ফলে পাঠকালে মান্টোকে অনুভব করা যায়। আর আরেকটি বিষয় বলা যায়, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যকাণ্ড নিয়ে অনেকেই জানেন না যে, সংবাদসংস্থা রয়টার্স মানবতার বিরুদ্ধে এরকম মর্মান্তিক অপরাধটির সংবাদ ঘটনা ঘটে যাওয়ার প্রায় সাত মাস পর বিশ্বের সামনে এনেছিল।
বইটি বাংলায় সাদাত হাসান মান্টো চর্চাকে আরো ভালোভাবে প্রোথিত করবে, আর জ্যোতির্ময় নন্দীর “মান্টো ও তার সাহিত্যকর্ম” নামে দীর্ঘ ও তথ্যবহুল ভূমিকাগদ্যটিও অসামান্য এক কথাসাহিত্যিকের সাথে বোঝাপড়া বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
কালো সালোয়ার ও অন্যান্য গল্প
লেখক: সাদাত হাসান মান্টো
অনুবাদ: জ্যোতির্ময় নন্দী
বিষয়: অনুবাদ, ছোটগল্প
প্রকাশকাল: ২০২৪
প্রকাশক: বাতিঘর
মূল্য: ৩৫০ টাকা ২০% ছাড়ে বাহিরানাতে ২৮০ টাকা।
বইটি কিনতে চাইলে:
কালো সালোয়ার ও অন্যান্য গল্প – বাহিরানা