বাহিরানা

আহমদ ছফার সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস: ভিন্ন আঙ্গিকে ইংরেজ শাসনামলের সবচেয়ে বড় বিদ্রোহকে দেখা

আহমদ ছফার সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস বই রিভিউয়ের প্রচ্ছদ

আহমদ ছফার প্রবন্ধ, গবেষণা, বাঙালি মুসলমানের মন, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, উপন্যাস, গাভী বিত্তান্ত, গল্প, ওঙ্কার, অনুবাদ, গ্যায়েটের ফাউস্ট যতটা খ্যাত ততটা নয় তার সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস (১৯৭৯) বইটি। বইটি আহমদ ছফা বিএ পরীক্ষার পর মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে লিখলেও প্রকাশ করেন দীর্ঘকাল পর ১৯৭৯ সালে। সিপাহী বিদ্রোহ ছিল ভারতে বৃটিশ শাসন শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ, যা আদতে সিপাহীদের বিদ্রোহ হলেও তাতে জড়িয়ে গিয়েছিল পুরো উপমহাদেশটির সবগুলো শ্রেণী। ব্রিটিশ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল এটি। যে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও বদলে দিয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের অনেককিছু। ১৮৫৭ সালের সেই বিদ্রোহ নিয়েই আহমদ ছফার সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস বইটি। তবে তিনি এই অভূতপূর্ব ইতিহাসকে অন্যদের চেয়ে ভিন্নভাবে দেখেছেন, এবং তার বইটি এই অবিস্মরণীয় দ্রোহের ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশে প্রথমদিককার লেখা।

মার্ক্সের সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নিলে আমরা দেখতে পাই ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো বিদ্রোহই সব জনগণকে একযোগে কেনো লক্ষ্য সাধনে দীর্ঘকাল ধরে রাখতে পারে না, এর কারণ সেচ ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকায় ঐতিহাসিকভাবেই জনগণের সমবায় সম্মিলন গড়ে উঠতে পারেনি। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা যে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করেছিল তার কারণও জনগণের একাত্মতার অভাব।

চর্বিমাখানো বন্দুকের টোটার কারণেই সিপাহী বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল বলেই আমরা জানি। কিন্তু আহমদ ছফা বলছেন এর পেছনের কারণ এত সহজ নয়, আরো গভীর, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ইংরেজ রাজ কর্তৃক সৈনিকদের ব্যবহার করে ভারতের একের পর এক স্বাধীন রাজ্য দখল, বিনিময়ে সৈনিকদের কিছু পাওয়া তো নয়ই বরং তাদেরই স্বদেশ ও মানুষের বিরুদ্ধে বৃটিশরা তাদের যে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল—এসবই সিপাহী বিদ্রোহের পেছনের মূল কারণ। পলাশীর যুদ্ধের ১৭৫৭ সাল ধরে এগুলে ১৮৫৭ সালে হয় এই বিদ্রোহ, আহমদ ছফার মতে এই পুরো সময়ে ব্রিটিশরা ভারবর্ষের যে যে অঞ্চল দখল করেছে তার সবই এই সেপাইদের মাধ্যমে। বিদ্রোহের মূল কারণ চিহ্নিতের পাশাপাশি এর মধ্যে অংশগ্রহণকারী ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত ও অন্যান্য কুশীলবদের বিষয়ও এসেছে বইটিতে। সামন্ত প্রভুদের বিষয়ে আহমদ ছফা ভূমিকাতে এই যুদ্ধের তাৎপর্য বিষয়ে কুরু-পাণ্ডব যুদ্ধের একটি অসাধারণ তুলনা টেনেছেন,

“সিপাহী যুদ্ধের ঘটনাটি ব্যাপ্তিতে এবং গভীরতায় ভারতবর্ষের ইতিহাসে অতুলনীয়। এই যুদ্ধের গুরুত্ব মহাভারতের কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধের মতোই ভয়াবহ এবং তাৎপর্য সম্পন্ন। এই যুদ্ধের ফলে ভারতের সামন্ত প্রভুরা ঝাড়ে বংশে ধ্বংস হয়েছে এবং বৃটিশ শাসন সম্পূর্ণরূপে নিষ্কন্টক হয়েছে।” (সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস, আহমদ ছফা)

এর কারণও বলছেন তিনি, যে, প্রযুক্তিগতভাবে ও আধুনিক কৌশলের কাছে সামন্তরা (দিল্লির নওয়াব ও ভারতের বিভিন্ন অংশের রাজাসহ সামন্ত শ্রেণীর আরো যারা ছিলেন) ইংরেজদের কাছে হেরে গিয়েছিল। এর একমাত্র ব্যাতিক্রম মহীশূরের শার্দুল টিপু সুলতান, তিনি ইংরেজদের সমরবিদ্যা, আধুনিক শাসনকৌশল ও সামরিক কলা রপ্ত করেছিলেন বলেই দীর্ঘকাল অজেয় ছিলেন। তাকে হারাতে অনেক কসরত করতে হয়েছে ইংরেজদের।

বইটির একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আহমদ ছফার পর্যবেক্ষণ, সিপাহী বিদ্রোহের সবগুলো দিক তিনি ভিন্নভাবে দেখেছেন। ইতিহাস স্থির নির্দিষ্ট কিছু নয়, বরং পরবর্তী কালের ব্যাখ্যায় ইতিহাস নতুন নতুন রূপ নেয়। এই বইটিতে তা দেখা যায়। এই বিদ্রোহে মুসলমান সৈনিকরা, তাদের সঙ্গে মুসলিম সামন্তরা যেমন যোগ দিয়েছিলেন তেমনি হিন্দু সৈনিক ও সামন্তরাও অনেক ছিলেন। ওহাবী-সিপাহীদের যৌথতাও ঘটেছিল এই যুদ্ধে। আবার ঝাঁসির রাণীও জড়িয়েছিলেন। ফলে এটা সত্যেন সেনের মহাবিদ্রোহের কাহিনী হয়ে উঠেছিল। বইটিতে আমরা ভূমিকা বাদে অধ্যায় পাই সাতটি, যথা, “বিদ্রোহের কারণ-বীজ”, “ঘটনা পরম্পরা”, “এ সে দিল্লী-এই সে নগরী”, “কানপুর: ধাবমান দাবানল”, “অযোধ্যা: গজল কাননের অগ্নি-গোধূলি”, “বিহার: ওহাবী-সিপাহী সম্মিলন” ও “মেরে ঝাঁসি নেহী দেওঙ্গী”।

অধ্যায়গুলোর নামেই ধারণা করায় যায় বইটিতে নীরস ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেননি ছফা, তিনি তথ্যগুলোয় সাহিত্যের রসায়ন যুক্ত করেছেন। তাই দ্রুত পড়া গেলেও মনে রেশ রেখে যায়, তাতে রয়ে যায় বেদনার ও ক্ষয়ের বোধও। মোগলদের শেষ নামমাত্র (কারণ তার সব ক্ষমতাই ব্রিটিশরা কেড়ে নিয়েছিল) সম্রাট বাহাদুর শাহ্‌কে নিয়ে বর্ণনায় তার নাম উল্লেখের আগে পুরো এক পাতা খরচ করেছেন ছফা। কিন্তু তা অর্থহীন কথায় নয়, পুরোটাই দরকারি কথা, এরপর এসেছে তার নাম। ব্রিটিশরা তখন পর্যন্ত পুরো ভারতের সব বড় রাজাদের উচ্ছেদ করতে পারলেও মোগল বংশকে তখনও তারা উচ্ছেদ করতে পারেনি পুরোপুরি। কেন পারেনি, ও কী করার পরিকল্পনা, তাই নিয়ে বলেছেন তিনি। কারণ কোম্পানীর বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তেই বাহাদুর শাহের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল তখনও।

তৈমুর লঙয়ের যে বংশের আকবর, বাবর ভারত শাসন করেছেন, সেই বংশের বাহাদুর শাহ্ এবং তার পিতা শাহজাহানও কোম্পানির দেওয়া পেনশনে চলতেন। এ এক নির্মম ইতিহাস। বাহাদুর শাহ্‌ সম্রাট হয়েছিলেন ১৮৩৭ সালে আর সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিল ১৮৫৭ সালে এই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির এই সম্রাট সিপাহীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, এও এক অভূতপূর্ব ঘটনা।

সিপাহী বিদ্রোহ কীভাবে অগ্রসর হযেছিল এবং তার পরিণতি কী হয়েছিল, সবই তুলে এনেছেন ছফা। তার লেখায় ইংরেজদের পুঁজিবাদী নতুন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভারতের পুরনো সামন্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কীভাবে শেষবার প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল সিপাইদের সঙ্গে যোগ দিয়ে এবং ব্যর্থ হয়েছিল—তা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ইংরেজ পূর্ব সময়ের ভারতীয় সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ে কার্ল মার্ক্সের “ভারতে ব্রিটিশ শাসন” লেখাটি সামন্তদের ব্যর্থ হওয়ার বিষয়ে আমাদের ঐতিহাসিক তথ্যপুর্ণ বিশ্লেষণ দিতে পারে। এই লেখাটিতে মার্ক্স ভারতের গ্রাম কাঠামো ও স্বৈরাচারী শাসনপদ্ধতি গড়ে ওঠার পেছনে এক নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। তা ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বে থাকা জমির সেচপদ্ধতি। এই পদ্ধতি যা ইউরোপের চেয়ে সম্পূর্ণই ভিন্ন। মার্ক্সের সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নিলে আমরা দেখতে পাই ভারতীয় উপমহাদেশে কোনো বিদ্রোহই সব জনগণকে একযোগে কেনো লক্ষ্য সাধনে দীর্ঘকাল ধরে রাখতে পারে না, এর কারণ সেচ ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকায় ঐতিহাসিকভাবেই জনগণের সমবায় সম্মিলন গড়ে উঠতে পারেনি। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা যে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করেছিল তার কারণও জনগণের একাত্মতার অভাব।

তবে ব্যতিক্রম বাংলাদেশের পরবর্তী ইতিহাস। পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধের বিনিময়ে হওয়া স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ, তা ওই জনগণের একাত্মতার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছিল। সিপাহী বিদ্রোহে যে একাত্মতা ছিল তার আরো সংহত ও পরিণত রূপ দেখা দিয়েছিল বাংলাদেশে। তবে সিপাহী বিদ্রোহের পর কী হয়েছিল সেই বিষয়টিও আহমদ ছফা তুলে ধরেছেন বইটিতে। বিদ্রোহ সফল না হলেও তা ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস আমূল পাল্টে দিয়েছিল, কেননা এরপরই ভারতে সব সামন্ত রাজা, জমিদারেরা ইংরেজদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়, কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে। আবার ইংরেজ শাসনের মধ্যেও বিশাল পরিবর্তন আনে এই বিদ্রোহ।

সিপাহী বিদ্রোহ ও ভারতে ইংরেজ শাসনের ইতিহাস জানতে আগ্রহীদের ইতিহাস জানানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন আঙ্গিকে ইতিাহাস বর্ণনা ও ভিন্নভাবে দেখার জন্যও আহমদ ছফার সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস বইটি গুরুপূর্ণ।

সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস
লেখক: আহমদ ছফা
বিষয়: ইতিহাস
প্রকাশক: প্রথম প্রকাশক বুক-সোসাইটি
বর্তমান প্রকাশক, হাওলাদার প্রকাশনী
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ ১৯৭৯ সাল
হাওলাদার সংস্করণ, ২০১৮ ও ২০২৩ সাল।
মূল্য:৪৫০টাকা।


মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত লেখাগুলো

বাহিরানায় জনপ্রিয়

বাহিরানায় বিভাগসমূহ