২০২৬-এর শুরুতেই অনেক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে লেখকদের সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হয়। প্রকাশকরাও তাদের সারা বছরের সিংহভাগ বই প্রকাশ করেন এই মাসে। তবে ফ্রেব্রুয়ারির আগেই বাহিরানায় তিনটি সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত রিভিউ প্রকাশ করা হলো, পাঠকদের জানানোর জন্য। উপন্যাসের লেখকেরা যেমন একজন থেকে অন্যজন ভিন্ন, তেমনি উপন্যাসগুলোর গঠন ও বিষয়বস্তুও একদমই ভিন্ন-ভিন্ন। এই উপন্যাসগুলোয় পাঠকেরা তিনটি স্বতন্ত্র বিশ্বের খোঁজ পাবেন বলেই আমাদের ধারণা।
রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ: একটি ভয়ার্ত-মিথ্যার ক্ষমতা সম্পর্কিত গুণকথন

আমাদের তালিকার এই বইটি উপন্যাস নয় ঔপন্যাসিকা। মামুন হুসাইন বাংলা সাহিত্যে প্রতীকি গল্প বর্ণনার নতুন ভাষা যোগ করেছেন। তিনি সমসাময়িকতাকে চিরকালীনতার মোড়কে জড়িয়ে নেন, তার বর্ণনায় ইতিহাস মিথে রূপান্তরিত হয়। আমাদের তালিকায় মামুন হুসাইনের রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ: একটি ভয়ার্ত-মিথ্যার ক্ষমতা সম্পর্কিত গুণকথন ঔপন্যাসিকাটি প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। প্রকাশ করেছে পাঠক সমাবেশ। বইটিতে তিনি প্রতীকীভাবে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে তুলে এনেছেন। তিনি স্পষ্ট করে না বললেও তখনকার সংবাদ, ঘটনাপঞ্জি তার মতো করে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন। পুলিশ বাহিনী, বিগত রাষ্ট্রপ্রধানের দেশত্যাগ বইয়ের শুরুর অংশেই নিয়ে এসেছেন। তবে তিনি তাতে না থেমে ২৪ পরবর্তী সময়টিকেও তুলে ধরেছেন, মব জাস্টিসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে বইটিতে। আগামী নিয়ে তার বিভিন্ন ভয়-শঙ্কার ছায়াপাতও দেখা যায়। এবং সঙ্গে পূর্ববর্তী সময়ের পর্যবেক্ষণও। বইয়ের নামে যে রক্ষী-পুরুষ আছে এই নামের সঙ্গে রক্ষী বাহিনীর মিল বা তুলনা পাঠকদের অবচেতনে চলে আসে। পুলিশ বাহিনী, মিছিল, গুলির কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আদেশদাতা কেন্দ্র আর একজন কনস্টেবলের সেই আদেশ পালনের বাধ্যতার বিষয়টি দেখাতে ভুলেন না। তার ২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বরচিত আত্মার পরিত্রাণ ঔপন্যাসিকার সঙ্গে অনেক মিল-অমিল নিয়েও বিষয়গতভাবে দেশীয় ও বৈশ্বিক রাজনীতিকে ধারণে করেছে বর্তমান বইট। বইটি বহুঅর্থবোধক। মামুন হুসাইনের সব বইয়ের মতোই এই বইটিও পাঠে মনোযোগ দাবী করে।
লুকা টি স্টল:

শেখ লুৎফর বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ নাম। তার উল্টোরথ (গল্প) চন্দ্রাবতীর পুত্রগণ (উপন্যাস) বাংলা কথাসাহিত্যে নিজস্ব স্থান করে নিয়েছে। তবে তার প্রতিটি বইই বিষয়বস্তু ও প্রকরণে একটির সঙ্গে অন্যটির পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। ফলে তিনি যাই লেখেন তাতে নতুনত্ব চোখে পড়ার মতো। শেখ লুৎফরের লুকা টি স্টল উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে বছরের শুরুতেই। প্রকাশ করেছে জলধি। উপন্যাসটি লুকা নামে এক আপাত দৃষ্টিতে উন্নাসিক মধ্যবয়সী লোক ও তার চা স্টলকে কেন্দ্র করে লেখা। এর আখ্যানভাগ যত স্পষ্ট বলে মনে হয়, ততটা নয়। উপন্যাসটিতে রয়েছে বিচিত্র সব চরিত্র—তাদের অনেক রকম চাওয়া-পাওয়া, বেদনা-হাসি-কান্নার এক কোরাস রচিত হয় এই গ্রামের চা স্টলটিকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় যেমন সারাদেশের সব বিভাগ ও জেলার সব মানুষ বিচিত্র কাজে এসে মিলিত হয় তেমনি এই লুকার চা স্টলে গ্রামের সব পেশা ও শ্রেণীর মানুষ মিলিত হয়ে। সৈয়দ মুজতবা আলী বাঙালির আড্ডাপ্রিয়তার কথা বলতেন, শেখ লুৎফর তার অন্যরূপ দেখালেন এই উপন্যাসে। উপন্যাসটির ভাষা ও গঠন বাংলা সাহিত্যে অভিনব।
অরণ্য দস্যু:

চাণক্য বাড়ৈ কথাসাহিত্যিক ও কবি। তার গল্প ও উপন্যাসের নিজস্বতা চমকিত করে। এবছর জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে তার উপন্যাস অরণ্য দস্যু। প্রকাশ করেছে প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স। উপন্যাসটি সুন্দর বনের দস্যুদের নিয়ে। এই জলদস্যুদের নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন আমরা পেলেও তাদের জীবন-যাপনের উপর সাহিত্য কমই বা নেই বললেই চলে। সুন্দরবন ও তার দস্যুদের জীবনের গভীর যাতনা, হাসি কান্নার দেখা পাই আমরা উপন্যাসটিতে। সভ্য জগতের রিজন বা যে যুক্তি নিয়ে আমরা বড়াই করি তা খাটে না এই বনের মানুষদের ক্ষেত্রে, তাই তাদের দেখার জন্য পূর্ব সংস্কার ত্যাগ করতে হয়। চাণক্য বাড়ৈ তাই করেছেন। সুন্দরবন সিরিজ নামে একটি কবিতার বইও রয়েছে লেখকের। তিনি সাহিত্যের দুই মাধ্যমেই আমাদের সামনে উন্মুক্ত করতে চান ম্যানগ্রোব বনের রহস্য ও এর মানুষদের।
এই তিনটি সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস আপনার পাঠসঙ্গী হোক।