বাহিরানা ডেস্ক
মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বাংলা ভাষার থ্রিলারে সবচেয়ে অগ্রগণ্যদের একজন। তার ‘বেগ-বাস্টার্ড’ সিরিজের বইগুলো এবং ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে খেতে আসেননি’ থ্রিলার জগতকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল, করে চলেছে। শুধু বাংলাদেশ না পশ্চিমবঙ্গেও ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে খেতে আসেননি’ সমানভাবে জনপ্রিয়। এই উপন্যাস নিয়ে ওয়েব সিরিজও নির্মাণ হয়েছে।
তার নতুন উপন্যাস ‘অগোচরা’ একজন ভাগ্যাহত স্নাইপার শুটারকে নিয়ে। উপন্যাসের মূল গল্প এরকম, মূল চরিত্র সামাদ একজন প্রতিভাবান শুটার, যার আন্তর্জাতিক পদক-স্বীকৃতি পাওয়ার কথা, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে জড়িয়ে পড়ে সে। এর পেছনে যেমন অর্থনৈতিক, সামাজিক বা পারিবারিক কারণ জড়িত, রাজনৈতিক কারণও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট, পুরান ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের বলি হয়। কিন্তু এই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার আগে একটা বিশেষ ঘটনা ঘটে যেটা তার জীবনের বাস্তবতাকে আমূল বদলে দেয়। ঘটনাটি হলো ‘সালেকীন’ নামে একজন শুটার এশিয়ান গেমসের ৫০ মিটারের দূর পাল্লার শুটিং-এ অংশগ্রহণ করে, সামাদ সেখানে অংশগ্রহণ তো দূরের কথা, তাকে কখনও শুটিং ক্লাবের মেম্বারশিপই দেওয়া হয়নি।
তারা যান্ত্রিকতা মুক্ত এবং একইসাথে বুদ্ধিদীপ্ত, তাই তাদের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় পাঠকদেরও প্রভাবিত করে, ধরে রাখে টানটান সুতোয়। কলেজের এক ছাত্রনেতা বড়ভাই ‘সজল’ এর সাথে সংক্ষিপ্ত কথোপকথন চলাকালে সজল যা বলে আর সামাদ যে সামান্য কয়েকটি বাক্য ভাবে, এই কয়েকটি বাক্যেই উপন্যাসটি পাঠকদেরকে বলে দেয় কী ঘটতে চলেছে
সালেকীন যোগ্যতায় সামাদের চেয়ে ঊন, কিন্তু তার মামা একজন মন্ত্রী। এই যোগ্যতাই তাকে এগিয়ে দেয়। আর এখানেই ঘটনাটা অন্ধাকারের দিকে মোড় নেয়। সামাদ পরিবার আর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাড়ি ছাড়ার পর তাকে আশ্রয় দেয় তার শৈশবের বন্ধু মুন্না, এইভাবে একে একে আসতে থাকে আরো অনেক চরিত্র। আর ক্রমেই কলেজ রাজনীতির কোন্দল থেকে গ্যাংযুদ্ধের গভীরে জড়িয়ে পড়তে থাকে সামাদ। তার দক্ষতা এক জায়গাতেই, সেটা হলো স্নাইপার শুটিং। একে পুঁজি করেই সে এগুতে থাকে, তবে তার মুক্তিও নিহিত এই শুটিংয়েই। তার প্রেমিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, শুটিংয়ে তাকে যিনি এনেছিলেন তার মৃত্যু। এমনসব বৈপরীত্যের ঘনঘটার মাঝে তার স্বাধীনতার স্বপ্ন যেন ক্রমেই দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে সবকিছুর সমাধান করবেই, এরকম এক পণ আছে তার ভেতর। সাধারণভাবে সব প্রোটাগনিস্টের মতোই সামাদও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ আর আনুধাবনে দারুণভাবে সক্ষম, তাই সে বুঝতে পারে কী ঘটছে। স্নাইপার রাইফেল আর এই দক্ষতাই তার বেঁচে ফেরার চাবি।
নাজিম উদ্দিনের ”অগোচরা” আশির দশকের বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক চমকপ্রদ রূপায়ণ। উপন্যাসটির উৎকর্ষের সবচেয়ে বড় কারণ, নাজিম উদ্দিন তার চরিত্রদের বিশ্বাসযোগ্য করতে, তাদেরকে সব ভালো-মন্দ মিলিয়ে নির্মাণ করেছেন। আর, তারা যান্ত্রিকতা মুক্ত এবং একইসাথে বুদ্ধিদীপ্ত, তাই তাদের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় পাঠকদেরও প্রভাবিত করে, ধরে রাখে টানটান সুতোয়। কলেজের এক ছাত্রনেতা বড়ভাই ‘সজল’ এর সাথে সংক্ষিপ্ত কথোপকথন চলাকালে সজল যা বলে আর সামাদ যে সামান্য কয়েকটি বাক্য ভাবে, এই কয়েকটি বাক্যেই উপন্যাসটি পাঠকদেরকে বলে দেয় কী ঘটতে চলেছে, আর কী ঘটেছিল, এরপর শুরু হয় সেই ভবিষ্যতকে জানার পর্ব, যেখানে কিছুই নিশ্চিত নয়—
“ “তোর মতো শুটাররে কেমনে বাদ দিলো হারামজাদারা!”
আমার কাঁধে স্নেহময় হাত রেখে আক্ষেপের ভঙ্গিতে বলেছিল।
“সালেকিনের মামুর আরেক ভাইগ্না আজগর কলেজে ভর্তি হইছে…মামুর জোরে আমাগো পার্টিতে হান্দাইছে।”
বুঝতে পারলাম, সালেকীনের মামা আমার সাথে যা করেছে, সজল ভাইদের সঙ্গেও তাই করেছে।
…
“ওরে খায়া ফালাইতে অইবো।”
আমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলেছিল। যেন যুগ যুগ ধরে আমরা দুজনে মিলে ‘খেয়ে’ ফেলার কাজটা করছি একসঙ্গে।”
টানটান উত্তেজনার মাঝ দিয়ে নাজিম উদ্দিন সন্তর্পণে তার পাঠকদেরকে এক অত্যাশ্চর্য ভ্রমণে নিয়ে যান। পাঠকরা ‘অগোচরা’র বাস্তবতায়, সুখ, দু:খ আর স্বপ্নে নিজেদের একাত্ব করে ফেলেন।
অগোচরা
মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
অগোচরা (হার্ডকভার)
প্রকাশক: বাতিঘর প্রকাশনী
প্রকাশসাল: ২০২৩
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৭৬
দাম: ২৬০ টাকা।