বাহিরানা

আমি যে মরি না তাই— বায়েজিদ বোস্তামী— কবিতার অনিঃশেষ অর্থের দিকে


যে কবিতা নিজের স্থিরতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে সেই কবিতা পাঠকদের নতুন নিশানা দেয়, যেখান থেকে অভিজ্ঞতার নতুন, নতুন অর্থ তৈরি হয়। কবিতা যেমন ব্যক্তিইতিহাস তুলে ধরে তেমনি সেই ব্যক্তির ভেতর লুকনো দেশকেও একইসাথে প্রকাশ করে। এই ব্যক্তি অসংখ্য পাঠকদের সাথে একাকার হয়ে যান। কিন্তু ভাষার ভেতর ভিন্নভাবে নিজেকেও অক্ষত রাখেন। বায়েজিদ বোস্তামীও যেন‌ ‘আমি যে মরি না তাই’-এ জীবনের মৃত্যু না হওয়া প্রাত্যহিক ইতিহাস বিধৃত করেছেন। যেখানে চিরকালের জীবন তার অবলোকনের ভিন্নতায় তীর্যকভাবে ধরা দিয়েছে, একচল্লিশটি কবিতায়।
পৃথিবীকে দেখার ভার তিনি কবিতা দিয়ে বহন করছেন। আর অবলোকন করে জানাচ্ছেন,

“কেন্দ্রের বিন্দুটির সাথে মিলে যাবে বলে, দ্যাখো, ডানা গুটিয়ে নিচ্ছে পৃথিবী।”
(আমি যে মরি না তাই)

বায়েজিদ বোস্তামীর কবিতার নিজস্ব জগৎ আছে, তাই তার কবিতার ভাষা তার নিজস্বতাচিহ্নিত। এর সাথে বিশেষভাবে অংশগ্রহণমূলক একটি বৈশিষ্ট্য আছে তার কবিতায়, তার বলার ভঙ্গিটি এরকম যে, যেন তিনি পাঠকদের আহ্বান জানাচ্ছেন কবিতাটি সম্পূর্ণ করতে। এই ভঙ্গিটির ফলে একটি সম্পূর্ণ কবিতা অনিঃশেষের দিকে যাত্রা করছে। বৈশিষ্ট্যটি আধুনিক কবিতার তত্ত্ববিশ্বের বিপরীত

তার বলার ভঙ্গিটি সহজাত, সুক্ষ্ণ অনুভবগুলোকে সহজ ভাষায় প্রকাশে দক্ষ তিনি। আবার অন্যভাবে দেখতে গেলে তার ভাষা সহজ নয়, কিন্তু বলার ভঙ্গিতে একটা অনায়াস স্বতস্ফুর্ততা আছে, যার কারণে ভাষাটিকেও সহজ মনে হয়। এর ফলে পূর্বে বলা নিজস্ব অবলোকনের ভার বহনে সক্ষম হয়ে উঠেছে তার কবিতা। এটি বায়েজিদ বোস্তামীর দ্বিতীয় কবিতার বই, অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তার কবিতার এই দিকটি তার প্রথম বই ‘পাপের পুরাণ’-এ প্রথম সফলভাবে দৃশ্যমান হয়েছিল, দ্বিতীয় বইয়ে এসে আরও গতি পেয়েছে।

তার কবিতার ইশারা-ইঙ্গিতগুলোকে স্পর্শ করার জন্য বইটি থেকে কয়েকটি কবিতাংশ পড়ে দেখা যাক :

“নগরীর চারিদিকে পরিখা নাই
দেওয়ালের সুরক্ষা দিতে

ফটক ভেঙে শত্রু ঢোকে না কোনও
আমিই শত্রু তাঁবুর দিকে ছুটে যাই”
(বেকুব ঘোড়ারে আমার নিশিতে পায়, ঐ)

“ঘুঘুর মর্সিয়া-ক্লান্তি নিয়ে বিকেল
গড়ায় সন্ধ্যার দিকে”
(আমাদের দিবারাত্রি নাই, ঐ)

“তোমাকে চেয়ে
চৌপর দিন
আমি কোনও
একা-বোকা ফিঙে

অপেক্ষার মেঘ
মুখে মেখে নিয়ে
দীর্ঘ বিষণ্ণ দিন”
(তোমাকে চেয়ে, ঐ)

এরকম অসংখ্য পঙ্‌ক্তি আছে বইটিতে যেখানে নতুনত্বের সাথে এক নতুন ভাষারও সন্ধান মেলে। কবিতাগুলোতে শব্দের পরিমিতি লক্ষ্যণীয়, এমনকি প্রেমের রহস্যেমোড়া কবিতাতেও, যা বলার শুধু তাই তিনি বলেন, জড়তাহীন, স্পষ্টতা নিয়ে।
“খোলা প্রান্তরে গিয়ে ডাক ছাড়ি কত— কুসুম! কুসুম!
ধ্বনিরে ব্যঙ্গ করা ইকোটি আসে ফিরি— কুসুম! কুসুম!”
(তোমারে কুসুম কোথাও পাই না, ঐ)

‘‘আমার মরে যাওয়া দরকার
অথচ মরিবার মুরোদটি নাই

এহেন দশায়, আমারে, বুচ্ছেন
বিবিধ মশকারি নিয়ে বেঁচে থাকা লাগে’’
(আমি যে মরি না তাই, ঐ)

নাম কবিতার এই “বু্চ্ছেন” বলে যেন তিনি বিবিধ “মশকারি” নিয়ে পাঠকদের ব্যক্তিগত ঘটমান আর ঘটিতব্য বাস্তবতার কবিতার কথা বলছেন, সেখানে যেন পাঠকরাও অনায়াসে জড়িয়ে পড়েন তাদের জীবন নিয়ে। এই ‘‘বুচ্ছেন’’ কবিতার ভাষাকেও চাবকে নতুন কিছু নিংড়ে বের করে আনতে চায়। বায়েজিদ বোস্তামীর কবিতার নিজস্ব জগৎ আছে, তাই তার কবিতার ভাষা তার নিজস্বতাচিহ্নিত। এর সাথে বিশেষভাবে অংশগ্রহণমূলক একটি বৈশিষ্ট্য আছে তার কবিতায়, তার বলার ভঙ্গিটি এরকম যে, যেন তিনি পাঠকদের আহ্বান জানাচ্ছেন কবিতাটি সম্পূর্ণ করতে। এই ভঙ্গিটির ফলে একটি সম্পূর্ণ কবিতা অনিঃশেষের দিকে যাত্রা করছে। বৈশিষ্ট্যটি আধুনিক কবিতার তত্ত্ববিশ্বের বিপরীত, আমরা আবার এর নতুন তত্ত্বায়নে না যাই। আলোচনাটি শেষ করি বই থেকে একটি কবিতার কয়েকটি বাক্য দিয়ে,

“দুর্বাঘাসের বুকে বুনেছে মায়াজাল, আদিম তন্তুবায়, গতরাতে
শিশির জমেছে তাতে; রোদ উঠে গেল, চলো, নীলকান্তমণির খোঁজে যাই,
কেবল হিম ঝরুক হেমন্তের উঠোনে পড়ে-থাকা জীবনানন্দের লাশে!”
(নীলকান্তমণির খোঁজে যাই, ঐ)

এই নীলকান্তমণির খোঁজেই সভ্যতা গড়ে উঠেছে, এই মণি গন্তব্যের ভ্রান্তির রূপক হয়ে এসেছে এখানে, কাভাফির ‘ইথাকা’ কবিতাটিসহ সব মহাকাব্যেরই গন্তব্যেল উদ্দেশ্যে ভ্রমণ নয় কি এ? যেখানে ভ্রমণই মূল, মৃতসঞ্জীবনী, রত্ন, সারত্সার। ‘আমি যে মরি না তাই’ পাঠকদের নতুন কবিতার, জগতকে ভিন্নভাবে দেখারও ভ্রমণের দিকে নিয়ে যাবে এটা বলা যায়।

আমি যে মরি না তাই
বায়েজিদ বোস্তামী
প্রকাশক : বৈভব
প্রকাশকাল : প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর, ২০২১, দ্বিতীয় মুদ্রণ মে, ২০২২
দাম: ২০০টাকা।

(Visited 34 times, 1 visits today)

Leave a Comment