দিপু চন্দ্র দেব
বাংলাদেশের ইতিহাসের রূপ চিরকালের জন্য পরিবর্তিত করে দেওয়ার জন্য এই জাতির যে সব সংগ্রাম করতে হয়েছে তার মধ্যে সর্ব বৃহৎ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ইতিহাসের অনেকগুলো মুখ ও বাঁক থাকে, থাকে উৎস। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে ইতিহাস লিখিত হলে সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র বিশিষ্টজন ও স্থানের মূল্য ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় তথ্য গৃহীত হয়। তবে, এটি সম্পূর্ণ ইতিহাস নয়, যেমন সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তিনি কীভাবে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন সেটা আমরা জানলেও একইভাবে তার অর্থনৈতিক নীতি-পদ্ধতি কী ছিল? সেটা নিয়েও ইতিহাস লিখিত হওয়া উচিত, হয়েছেও, এরকম আরো বিভিন্ন বিবেচনা থেকেও রচিত হয়েছে। ফলে এত শতাব্দী পরে এতসব ভিন্ন-ভিন্ন দিক থেকে আসা তথ্যসম্বলিত আকরগ্রন্থগুলো থেকে চাইলে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে একটি গ্রন্থ লিখতে পারেন একজন লেখক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কোনো গবেষক লিখতে পারেন, “আকবরের অর্থনীতির মাঝে লুক্কায়িত আধুনিক অর্থনীতির পূর্বরূপ” গবেষণাগ্রন্থ। এরকম শত শত বই লেখা হচ্ছে, হবে, প্রায় সব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সভ্যতার ইভেন্টগুলো ও এর পেছনের মানুষজনদের নিয়ে। এভাবেই জ্ঞান গড়ে ওঠে। ১৯৭১-ও সেরকম একটি ঘটনা, আর ঘটনাটির পূর্ণ ইতিহাস রচনার জন্য প্রয়োজন এর সবদিক নিয়ে তথ্য। আফসান চৌধুরীর সম্পাদনায় “গ্রামের একাত্তর” সেরকমই একটি বই। যা একাত্তরে গ্রামের ভূমিকাকে তুলে ধরেছে।
একাত্তর সালের যুদ্ধকে যদি বাংলাশের একটি গ্রামে সংগঠিত যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেটি একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিচ্ছিন্ন নয়, এরসাথে সারাদেশ ও বহির্বিশ্ব জড়িত। তখন বিভিন্ন শাখ-প্রশাখার উপাদানের মাত্রার তারতম্যের মাধ্যমে এর ব্যাপকতা আবিষ্কার করা যাবে, এবং পরবর্তীতে পাঠকেরা এই ইতিহাসকে জাতীয় ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে নিয়ে যুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি করতে পারবেন। বইটির সম্পাদক আফসান চৌধুরী ও সহ গবেষকবৃন্দ সেই কাজটি করেছেন অত্যন্ত দক্ষ ঐতিহাসিকের মতো।
২০০০ সাল থেকে বইটির তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়, এরপর ২০১৩ সালে প্রকল্পটি বর্তমান বইয়ের নাম পায়, সেখানে বাংলাদেশের তিনটি জেলার বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের জীবন, জীবিকার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর ২০১৬ সালে এলাকা ও ব্যক্তি ভিত্তিক স্টাডি সংগ্রহ করে পূর্ণতা পেয়েছে “গ্রামের একাত্তর” বইটি। এখানে বিশাল ও ক্ষদ্র উপাদানের উপর গবেষণা হয়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য এবং একইসাথে কাজটি শ্রমসাপেক্ষও। বইটিতে অধ্যায় আছে বারোটি। বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি অধ্যায়ের শিরোনাম যেমন, জাতীয় রাজনীতি ও গ্রামের রাজনীতি (চতুর্থ অধ্যায়), মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধারা (ষষ্ঠ অধ্যায়), নির্যাতন (সপ্তম অধ্যায়)।
একাত্তর সালের যুদ্ধকে যদি বাংলাশের একটি গ্রামে সংগঠিত যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেটি একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিচ্ছিন্ন নয়, এরসাথে সারাদেশ ও বহির্বিশ্ব জড়িত। তখন বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার উপাদানের মাত্রার তারতম্যের মাধ্যমে এর ব্যাপকতা আবিষ্কার করা যাবে, এবং পরবর্তীতে পাঠকেরা এই ইতিহাসকে জাতীয় ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে নিয়ে যুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি করতে পারবেন। বইটির সম্পাদক আফসান চৌধুরী ও সহ গবেষকবৃন্দ সেই কাজটি করেছেন অত্যন্ত দক্ষ ঐতিহাসিকের মতো। যেমন, গ্রাম বলতে আমরা বুঝি শান্তিনিবিড় এক স্থান, যেখানে সবাই মিলেমিশে থাকে, কিন্তু যুদ্ধের সময়, বইটি থেকে উদ্ধৃতি দিই, “বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে, এলাকার পাকিস্তানপন্থিরা প্রয়োজনে সেনাদের নিয়ে গেছে বিরোধীপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বা কোনো এলাকার মানুষ বা গোষ্ঠীকে শায়েস্তা করার জন্য” (পাকিস্তানিদের নির্যাতন), এই ঘটনা নিয়ে আফসান চৌধুরী মন্তব্য করছেন, “এতে গ্রামীণ সমাজে যে যৌথ সম্পর্কের কাঠামো ছিল সেটি একাত্তর সালে দুর্বল হয়ে পড়ে।”
ফলে, গ্রামের বিশেষ ধরণের কাঠামোর কারণেই তার একাত্তরের কর্মযজ্ঞের কথা জানা ও এর সঙ্গে জাতীয় ইতিহাসের মেলবন্ধন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। আলোচ্য বইটি সেই চাহিদা পূরণ করেছে, বাঙালির একাত্তরের জাতীয় ইতিহাসকে সম্পূর্ণ রূপ দিতে বইটি বারবার ইতিহাস পাঠক ও গবেষকদের কাছে প্রয়োজনীয় হবে। অত্যন্ত যত্ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে বইটি প্রকাশ করেছে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।
গ্রামের একাত্তর
সম্পাদনা: আফসান চৌধুরী
বিষয়: মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস
প্রকাশকাল: ২০১৯
প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)
দাম: ৪৪০ টাকা ২০% ছাড়ে বাহিরানাতে ৩৫২ টাকা।
বইটি কিনতে চাইলে: