পায়ে বিঁধেছে হসন্ত কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ

সোহেল হাসান গালিবের পায়ে বিঁধেছে হসন্ত: রাজনীতির দ্বিরালাপে কাব্যিক দিশা পায়ে বিঁধেছে হসন্ত

শূন্য দশকের কবি সোহেল হাসান গালিবের পায়ে বিঁধেছে হসন্ত ২০২৫ সালে প্রকাশিত কবিতার বই । বইটি নানা কারণেই বিশেষ। আমরা কবির এই সর্বশেষ প্রকাশিত বইটি নিয়ে কিছু কথা বলবো, বিশেষ করে বইয়ের কবিতাগুলোয় কী কী নতুনত্ব রয়েছে সেগুলো বিবেচনা করব। দেখবো কবিতাগুলোর স্বরূপ, কবির দৃষ্টিভঙ্গি ও কবিতার বিষয়-প্রকরণ।

এই বইয়ে সোহেল হাসান গালিবের কবিতার ভাষা তার নিজস্ব ভঙ্গি, গঠন, রূপকল্প—হিউমার, পরিহাসেও যেমন তিনি সিদ্ধহস্ত তা এই বইয়ের কবিতাগুলোয় গুরুত্বপূর্ণভাবে এসেছে—অটুট রেখেও ভিন্ন এক দিকে মোড় নিয়েছে, মোড়টি হলো রাজনীতি, যেখানে অর্থের প্রকাশ ও অপ্রকাশের দ্বন্দ্ব, রূপক, উপমা, হিউমার ও প্রচলিত প্রতীকের অর্থকে ভগ্ন করে ভিন্ন অর্থ দেওয়া—এসব উপাদান সম্পূর্ণ বইটিতেই সোহেল হাসান গালিবের ইতোমধ্যে অর্জিত কাব্যভাষার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে। কবিতাগুলো সম্পূর্ণ নতুন এক প্রান্তরে উপস্থিত করে পাঠকদের, যেখানে রাজনীতি নতুন ভাষা ও আঙ্গিকে প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়হীনভাবে কবিতার কবিতা হওয়া মানে কবিতা বিচারের যে মানদণ্ড আমরা ব্যবহার করি সেখানে চিত্রকল্প, ছন্দ, উপমা, প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে থাকে, কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে এই শিল্পকৌশলগুলো একটি আধারে জড়ো হয়, তার নাম ভাষা, প্রত্যেক বড় কবির একটি নিজস্ব কাব্যভাষা থাকে, জগৎ থাকে, সোহেল হাসান গালিবের সেই ভাষা আছে এবং তিনি বাংলা কবিতায় ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই বইয়ের কবিতাগুলোতে তিনি তার ভাষায় নতুন দিক যোগ করেছেন, অভিনব চিত্রকল্প, উপমা, প্রতীক তো আছেই, তবে বইটিতে তিনি বিষয় হিসেবে রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন বাংলা কবিতায়। আমার আলোচনায় কবিতাগুলোর রাজনৈতিক গুণ চিহ্নিত করার দিকে ঝুঁক বেশি দেখা যাচ্ছে, তার কারণ বইয়ের বেশিরভাগ কবিতা বিষয় হিসেবে রাজনীতিকে বেছে নিয়েছে, এবং রাজনৈতিক কবিতার প্রচল নির্মাণপদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে নতুন গঠনভঙ্গি নিয়ে এসেছে। সেই নতুনত্বকে ধরতে চাওয়ার একটা আগ্রহ আছে আমার। তবে বইয়ে শুধু রাজনীতি নিয়েই কবিতা আছে তা নয়, সব বিষয়ের উপরেই কবিতা আছে। বিশেষ করে বইয়ের প্রথম পর্বের অনবদ্য সংহত, নতুন চিত্রকল্প ও মাপা শব্দের কবিতাগুলো, বইটির পূর্ণ সত্তাকে স্পর্শ করতে সেসবও আমাদের আলোচনায় আসবে।

শাহবাগের কথা মনে হতে হতেই দেখতে পাচ্ছি সমস্ত পাখিই এখন আর বিচার চাইছে না, মানে শাহবাগের বিরোধীপক্ষও বিচার চাইছে না। এরপরই বারামখানায় গুরু ও শিষ্যের পরম্পরাটি চিরায়ত ভাবধারা নিয়ে আসছে, কিন্তু এখানে কৃষ্ণকে উন্মুক্ত অর্থের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখছেন সোহেল হাসান গালিব, এখানে কবিতাটি তার অর্থকে অতিক্রম করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষমতা ও ক্ষমতার বিষ (মহাদেব?) মুখ্য হয়ে উঠছে কবিতাটায়, প্রকৃত ক্ষমতা এখানে শিশ্ন, যা গুরু শিষ্যদের আনুগত্য লাভের জন্য নিজেই কর্তন করছেন, কিন্তু তবু তিনি তাদের আস্থাভাজন হতে পারছেন না। এখানেই আসে বাংলাদেশের স্বৈরশাসকদের জন্ম দিয়েছে কোন সূত্র? তার প্রশ্ন, জনগণের মধ্যেই কী পপুলিজমের বীজ থাকে না? প্রত্যেক স্বৈরশাসকই পপুলিজমের চর্চা করেন, আর তৃতীয়বিশ্বের বাংলাদেশের মতো দেশে স্বৈরশাসনের ভূমি কখনও কমেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে এরকম কবিতা কয়টি রচিত হয়েছে? হাতে গোনা। শাহবাগ ও শাপলা থেকে শেকড় বিস্তৃত করে বাংলার দেহাত্মবাদী ধারা পর্যন্ত পৌঁছেছে কবিতাটি।

বাংলাদেশ পূর্ব বাঙলা বা পূর্ব বঙ্গ (বৃটিশ আমল), পূর্ব পাকিস্তান, এর পূর্বে সুলতানী আমল, হিন্দু আমল, বৌদ্ধ আমল—এসব আমলের রাজনৈতিক কালপরিক্রমায় এগুলেও এসব পর্বের সব ইতিহাস নিয়ে এখনও ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পারিনি আমরা, কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে ওইসব আমল বিশেষ করে ব্রিটিশ আমল পূর্বের দর্শন (ব্রিটিশ আমলও), লোকগাথা, পুরাণ, সুফিতত্ত্ব, ভাববাদ, বৌদ্ধদর্শন আমাদের রাজনৈতিক ও বস্তুগত চেতনা নির্মাণ করেছে। বাঙালি যেমন মিশ্র জাতি তার চেতনাতেও এই মিশ্রতা রয়েছে, এবং চেতনার কথা বললে বৈশ্বিকভাবেই সভ্যতা মিশ্রতার অধিকারী, কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক কবিতায় এই মিশ্র চেতনার নিদর্শন আমরা তেমন পাইনি, ‘তেমন’ বলছি কারণ আমাদের রাজনৈতিক কবিতা ব্রিটিশ ভাবধারায় লেখা, যা যুক্তি প্রমাণের সরলরৈখিক বোধগম্যতার শর্ত মেনে রচিত, আর এখানেই সোহেল হাসান গালিবের এই কবিতাগুলো ভিন্ন—আমি বিষয় বলছি, কারণ কোনো পাঠক বিষয় হিসেবে রাজনীতিকে উহ্য রাখলেও কবিতার রসগ্রহণে বিন্দুমাত্র বাধা তৈরি হয় না, কবিতাগুলোর এও এক বিশেষত্ব, আর রাজনীতি এখানে কবিতাগুলোর একটি বিশেষ গুণ—তিনি রাজনৈতিক কবিতায় মিশ্র চেতনার যে যে উপাদান বললাম যেমন পুরাণ, ধর্ম, ভাববাদ—এসব সফলভাবে নিয়ে এসেছেন, তাই এই কবিতাগুলো কবিতার সব শর্ত পূর্ণ করেই রাজনৈতিক কবিতা হিসেবে নতুন পথের সূচনা করেছে। যেখানে মিশ্রতার মধ্য দিয়ে বহুরৈখিকতার সম্মিলন ঘটেছে। ফলাফলের নতুনত্ব হলো রাজনীতি এখানে একমুখী অর্থের বদলে বহুমুখী অর্থে স্থানান্তরিত হয়েছে। আমাদের সময় যেমন বহুঅর্থবোধক, এই বইয়ের কবিতাগুলোও তাই। আর শুধু বিষয় হিসেবে রাজনীতিই নয়, বইটির সব বিষয়ের উপর লিখিত কবিতাই বহুঅর্থবোধতার জন্ম দেয়। যা আমরা দেখব। আর বহুঅর্থবোধকতা বললে সোহেল হাসান গালিবের সব বইয়েই কমবেশি এটা আমরা দেখেছি। তবে এবার বইয়ের প্রথম পর্বের কয়েকটি কবিতাংশ পড়া যাক। বইয়ের শুরুতেই থাকা কবিতাটি আমাকে স্পর্শ করেছে,

“যে মুহূর্তে কোনো পাপড়ি খসে পড়ে
উঁচু ডাল থেকে—স্লো-মোশন হাওয়ায় ভেসে ভেসে—

দৃশ্যটি সবচে সুন্দর লাগে
আমার কাছে, সম্ভবত
কাঁচপোকাটির কাছেও।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমি যে ঝরে পড়ছি ক্রমশ
ধুলায়—অন্ধকারে—সপ্তর্ষির নিচে—

দেখতে কি ভালো লাগছে তোমার?

যদি নাই লাগে, নিস্তরঙ্গ জলের দিকে চাও—
প্রথম বৃষ্টির ফোঁটায় মৃদু তরঙ্গ আজ
বুকে জাগাও।”

(দৃশ্যোপমা, একচক্ষু আকাশের নিচে, পায়ে বিঁধেছে হসন্ত)

স্লো মোশনেই যে পাপড়ি ঝরে যাচ্ছে তা কী তোমাকে একটুও সিক্ত করছে না! যদি তাই হয়, না করে থাকে, তাহলে আমার আহ্বানে বুকে তরঙ্গ জাগাও বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা দিয়ে। এই যে ‘আমি’কে অবলীলায় সম্পর্কযুক্ত করা ‘তুমি’ উল্লেখের মাধ্যমে, তাকে আহ্বান করা, এটা সোহেল হাসান গালিব অভিনব প্রকরণে প্রকাশ করেছেন। পতন নিয়ে চিরাচরিত ভাবনাটিকেই তিনি নতুনদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। পতন যে ব্যক্তিক নয়, বরং মহাজাগতিক এবং পৃথিবীরও যে পতন ঘটে ব্যক্তির সঙ্গে, আর একটি পাপড়ির পতনেও একইরকম বেদনার ঘটনা ঘটে মহাজগতে, আর সেই পতন যে শিল্পও হয় (এই পতনের শিল্প কী ব্যোদলেয়ার আমাদের তার ক্লেদজ কুসুম-এর একটি শব কবিতায় জানাননি?), আধুনিক পতনের সেই উৎসবিন্দুকেই গালিব প্রসারিত করে নতুন করে তুললেন, পতনের সামাজিক ও হৃদয়ঘটিত আবেদনকে সামনে নিয়ে এসে। তা করেছেন তিনি অপর এক ‘তুমি’র উপস্থিতি তৈরির মাধ্যমে। আবার তুমি’র জানাকে কিন্তু কবি জানেন না, তবে তার হৃদয়ের প্রতি আবেদন রাখেন, তাই বলেন, ‘দেখতে কী ভালো লাগছে?’ একবাক্য পরেই এই না জানার প্রশ্নকে তিনি নিখাদ অস্তিত্বের প্র্রশ্নে রূপ দিয়েছেন, এই বলে,

“যদি নাই লাগে, নিস্তরঙ্গ জলের দিকে চাও—
প্রথম বৃষ্টির ফোঁটায় মৃদু তরঙ্গ আজ
বুকে জাগাও।”

এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে তিনি কবিতাটিকে রহস্যময় করে তুললেন আবার, এর মাধ্যমে কবিতাটিতে বহুঅর্থবোধকতার জন্ম দিয়েছে। আর নিস্তরঙ্গ জলে এই প্রথম বৃষ্টি ফোঁটার দৃশ্যকল্প আমাদেরও চমকিত করল। কাব্যভাষাটি একান্তই সোহেল হাসান গালিবের। কবিতাটির নাম ‘দৃশ্যোপমা’। দেখতে পাই নামেও তার ভাষাভঙ্গি স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।

“থু’’ কবিতার পঙক্তিগুলোতে সহজেই ধরা পড়ে দেখতে পাচ্ছি নতুন সময়ের নতুন মত-পথ ও অসংখ্য পথ ও মতের ব্যর্থ ইস্তেহারের কথা। কীভাবে বদলে যায় সবকিছু তার কথা, আমরা সহজেই রাষ্ট্রনীতিতে অনেককিছু বদলে ফেলি, আবার অনেক বদল করতে চাওয়া চাপা পড়েও যায়। দেখতে পাই ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি পাশাপাশি রয়েছে এখানে। সেই অনুপাতেই প্রকাশ্যে আছে গালিবের অসম্ভব ঋজু ভাষা,

“আর দ্যাখো, উড়ছে হাওয়ায়
মদিনা-সনদ, গাছে গাছে ম্যাগনাকার্টা।
নয়ানজুলিতে ভাসছে কত
নয়নজুড়ানো ইস্তেহার।”

(থু, বোবা দিন বোবা রাত্রি, ঐ)

প্রথম পর্বের নাম কবিতা “বোবা দিন বোবা রাত্রি” এই কবিতায় নাগরিক পরাধীনতাকে পরখ করা যেতে পারে, আর কী অনবদ্যভাবে হাসিও যে সন্দেহের বস্তু ছিল এককালে বাংলাদেশে তা উঠে এসেছে দেখতে পাই, কিন্তু ২৪-এর পরও এখনও হাসি ফিরেছে সন্দেহের বাইরে? প্রশ্নটি থেকে গেল।

“আমাদের হাসি যদি হয়ে যায় হুংকার
হাসব না তাই কোনদিন নিঃশব্দেও।”

(বোবা দিন বোবা রাত্রি, ঐ)

বিগত আমলের ব্যর্থ নির্বাচন নিয়ে একটি কবিতায় আসছে, দেখি কী অসম্ভব তুলনা করেছেন তিনি, পাখি ও ব্যালট পেপারের, এই তুলনা স্তব্ধ করে, আর প্রকৃত কবিতা তো এমনই স্তব্ধতা আনে বলে জানি। অথচ বিষয়ের কারণেই খুব সাধারণ একটি কবিতা হওয়ার কথা ছিল এর, কিন্তু সোহেল হাসান গালিব একে শিল্পোত্তীর্ণ করে তুলেছেন, আর এতে, ব্যর্থতায় পুড়ে যাওয়া ব্যালট পেপারও প্রাণ পেয়ে বাধা পড়ে গেছে কালোত্তীর্ণে।

“চাকায় পিষ্ট ঘাসে নেমে দেয় ওরা হামাগুড়ি—
লুন্ঠিত সব ব্যালট পেপার।

দু-একটা উড়ে গিয়ে পুড়ে যায়, পাখি নয় তারা।

পাখিরা নিরক্ষর ছিল বটে,
আজকে শিখেছে ভোটের ব্যাপার।”

(সুর্যাস্ত-মলাটে আঁকা, বোবা দিন বোবা রাত্রি, ঐ)

ব্যালট পেপারের অসহায়ত্বকে কবি যে কাব্য রূপ দিয়েছেন, শুধুমাত্র এই বিষয়টির বিবেচনাতেই কবিতাটি রাজনৈতিক কবিতা হিসেবে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। একে তার কবিতা ভাষার নতুন পালক বলতে পারি নিঃসন্দেহে।

এতক্ষণ যাবত যে বিষয়টি বলার জন্য অপেক্ষা করছি এবার আসি বইটির মূল ভরকেন্দ্রে, সোহেল হাসান গালিব পায়ে বিঁধেছে হসন্ত বইয়ের কবিতাগুলোয় যে কাব্যভাষার অবতারণা করেছেন সেটাকে আমি বলবো তার নিজস্ব রাজনৈতিক কাব্যভাষা। আমরা উপরে যে চমকিত করা গভীরতর অর্থের কবিতাগুলো পড়লাম, সেখানেও রাজনীতির প্রচ্ছন্ন অস্তিত্ব দেখতে পেয়েছি। এই বইয়ের দুটো অংশ। একটা হলো “একচক্ষু আকাশের নিচে” আরেকটি অংশ হলো “বোবা দিন বোবা রাত্রি”। শুরুতেই আমরা এই রাজনৈতিক ভাষাটির আভাস পাই “একচক্ষু আকাশের নিচে”-এর শুরুর দিকে। কিন্তু ধীরে ধীরে এটা ঘণীভূত হতে থাকে দ্বিতীয় অংশ “বোবা দিন বোবা রাত্রি” তে। এই অংশটির প্রায় পুরোটাই স্থান পেয়েছে রাজনৈতিক কবিতায়। এই রাজনীতি মুসলিম শাসনামল থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও এর পরবর্তী আওয়ামী শাসনামল থেকে ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত ব্যাপক পরিসরে বিস্তৃত। এর জন্য কবি অবলীলায় মধ্যযুগের বাংলা কবিতার শব্দ নিয়েছেন, ব্যবহার করেছেন মিথ, পুরাণ, নিয়েছেন ধর্ম থেকে, তার বিভিন্ন কবিতায় যে হিউমার দেখতে পাই, তা তো আছেই, এর সঙ্গে নতুন রূপক ও চিত্রকল্প এবং সঙ্গে আমাদের চিরচেনা প্রতীকগুলোর অর্থ বদলে দেওয়ার বিষয়টিও লক্ষ্য করবার মতো। আর এসবের সহাবস্থান কবিতাগুলোয় অনেক সময়ই বিস্ময় তৈরি করে, যেমন চিরচেনা প্রতীক পাখি বলতে আমরা স্বাধীনতা ও পরাধীনতা বুঝি, কিন্তু জয়বাংলা নামে একটি কবিতায় দেখি এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটি অর্থ প্রকাশ করছে পাখি নামীয় প্রতীকটি, এবং যা সর্বার্থেই নতুন অর্থের যোগান দিচ্ছে। বিনয় মজুমদারের “একটি উজ্জ্বল মাছ” যেমন প্রচলিত কোনো মাছ নয়, সেরকম সোহেল হাসান গালিবের পাখিটিও চিরচেনা পাখি নয়, এ নতুন পাখি। এর উৎস লুকোনো বাংলাদেশের রাজনীতির গভীরে। ফলে এসব কারণেই তার রাজনৈতিক কবিতাগুলোকে কোনোভাবেই প্রচলিত রাজনৈতিক কবিতা বলতে আমরা যা বুঝি, তা বলা যায় না। বহু অর্থবোধকতা তো আছেই সেইসঙ্গে কবিতাগুলো থেকে ইচ্ছেমতো একটি অর্থে নির্দিষ্ট করাও প্রায়শই অসম্ভব হয়ে ওঠে। আগেই যে বললাম রাজনৈতিক কবিতায় যা দৃষ্ট হয়, সোজাসাপ্টা অর্থ, তা এখানে পাওয়া যায় না। অর্থ, উদ্দেশ্য ও প্রকরণ সবদিক দিয়েই একটি নতুন ভাষা সৃষ্টি হয়েছে কবিতাগুলোয়।

“কয়েকটি কবিতা দেখা যেতে পারে,

“ফাঁসি চাইতে চাইতে আমরা যত ইকো-টানেল
আর ধোঁকা-চ্যানেল পেরিয়ে এসেছি।
এখন শুনতে পাচ্ছি, আমলকীডালের
সমস্ত পাখিই গাইছে: ‘বিচার চাই না’।

নীলমণিলতার আড়ালে মিরর ক্যাসেল—
মন চাইছে, ওখানেই ঢুকে পড়ি,
দেখে আসি নাঙা সন্ন্যাসীদের।

কিন্তু বারামখানায় ঢুকবার মুখেই শুনলাম
কোন এক গুহ্য সাধনায়
শিশ্ন কেটে ফেলেছেন
কৃষ্ণ সাঁইজি।”

(শবাসন, বোবা দিন বোবা রাত্রি, ঐ)

এর পরের পঙক্তিতেই বলছেন,

“তবু রক্ত ঝরছে না বলে
ডেয়ো-পিঁপড়ার দল ক্ষিপ্ত ভীষণ—” (ঐ)

শাহবাগের কথা মনে হতে হতেই দেখতে পাচ্ছি সমস্ত পাখিই এখন আর বিচার চাইছে না, মানে শাহবাগের বিরোধীপক্ষও বিচার চাইছে না। এরপরই বারামখানায় গুরু ও শিষ্যের পরম্পরাটি চিরায়ত ভাবধারা নিয়ে আসছে, কিন্তু এখানে কৃষ্ণকে উন্মুক্ত অর্থের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখছেন সোহেল হাসান গালিব, এখানে কবিতাটি তার অর্থকে অতিক্রম করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষমতা ও ক্ষমতার বিষ (মহাদেব?) মুখ্য হয়ে উঠছে কবিতাটায়, প্রকৃত ক্ষমতা এখানে শিশ্ন, যা গুরু শিষ্যদের আনুগত্য লাভের জন্য নিজেই কর্তন করছেন, কিন্তু তবু তিনি তাদের আস্থাভাজন হতে পারছেন না। এখানেই আসে বাংলাদেশের স্বৈরশাসকদের জন্ম দিয়েছে কোন সূত্র? তার প্রশ্ন, জনগণের মধ্যেই কী পপুলিজমের বীজ থাকে না? প্রত্যেক স্বৈরশাসকই পপুলিজমের চর্চা করেন, আর তৃতীয়বিশ্বের বাংলাদেশের মতো দেশে স্বৈরশাসনের ভূমি কখনও কমেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে এরকম কবিতা কয়টি রচিত হয়েছে? হাতে গোনা। শাহবাগ ও শাপলা থেকে শেকড় বিস্তৃত করে বাংলার দেহাত্মবাদী ধারা পর্যন্ত পৌঁছেছে কবিতাটি।

সংজ্ঞা কবিতাটা দেখি,

“মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একটি রাইফেল
এর সামনে যে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়
সেই হলো রাজাকার।”

( সংজ্ঞা, বোবা দিন বোবা রাত্রি, ঐ)

এই লাইনগুলো আমাদের ১৯৭১-এ বাঙালির স্বাধীনতাকামী চেতনার দ্বারা আলোড়িত করে। কিন্তু কোনো কোনো পক্ষের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভুল খাতে প্রবাহিত করার বিষয়টিও কী কবি তুলে ধরছেন না? যখন “রাজাকার” শব্দটা পাই তখন ভেসে ওঠে অন্য চিত্রপট।

এবার সেই পাখি প্রতীকটিকে দেখি “জয়বাংলা” নামের অসাধারণ কবিতাটায়। জয়বাংলা শব্দটি অতিশয় রাজনৈতিক, তাই এর সরল অর্থ করা যাবে না, বা অসম্ভব হবে।

“গ্রেফতারের ভয়ে একটি পাখি
সেই ভোররাতে
উড়ে এসে বসেছে বারান্দায়
ছোট্ট ফুলের টবে।”

(জয়বাংলা, বোবা দিন বোবা রাত্রি, ঐ)

আমরা অনুভব করি এখানে কিছু ঘটমান বিষয়ের সাথে ‘জয়বাংলা’ শব্দটি মিশে গেছে। যে ভাষা কথা কয় কোনো এক ঘটমান সময়ের সাথে। এই ঘটমান সময় এবং জয়বাংলা শব্দটি যে দ্যোতনার ধ্বনি তৈরি করে তা কবিতার শর্ত মেনেই। এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শব্দটিকে ঘিরে পক্ষ-বিপক্ষ ও সাম্প্রতিকতম ঘটনাবলি যে জড়িত সেগুলোকে তুলে ধরেছে কী অবলীলায়, একটি পুরো অবদমনের সময়কে তুলে ধরছে, আশ্চর্য হলো, তাও মাত্র একটি চিত্রকল্পে। শব্দটি খোদ স্বাধীনতাকেই (পাখি) গ্রেফতার করতে চাইছে।

একটি কবিতায় আসছে ক্ষমতার পালাবদল,

“মশলা চিবুতে চিবুতে কোনোদিন ফের মসনদে গদিয়ান হলে
এতদিনকার এই টিকটিকি-লাঞ্চিত দুর্গ-দেয়ালে
মাথা কুটে মরা এক অন্ধযুগের
অন্ধকূপহত্যা আর গুমগুম ঘুমগানের খতিয়ান নিতে
ওই শীতলক্ষ্যা নদীর ওপারে যাদের তুমি
ক্রসফায়ারে পাঠাবে তাদের তালিকাটা
এখনই তৈরি করে রাখো—

জোনাকির চোখ জ্বেলে গাঁজাসন্ন্যাসী
আড়ি পেতে শোনে সব। শোনে আরও কেউ কেউ—
ভোর হলে যারা গণিকার গলার নিচে
নির্মল নোক্তার মতো ফুটে থাকা
তিলটিকেও ভুলে যাবে
তাদেরও লোম খাড়া হয়ে যায়।”

(কালসংক্রান্তি, বোবা দিন বোবা রাত্রি, ঐ)

“তাদেরও লোম খাড়া হয়ে যায়” ক্রসফায়ারের কথা শুনে। ‘রাজা যায় রাজা আসে’ মানে শাসক বদলায় কিন্তু শাসনদণ্ড কী অবিকল থেকে যাবার সম্ভাবনা থাকে না? ২৪ পরবর্তী বিভিন্ন ভাঙচুরের ঘটনায় সেই সম্ভাবনার সত্যরূপ দেখতে পাচ্ছি আমরা।

ক্ষমতায় কীভাবে অসুর বিনাশীনির সঙ্গে পুঁজির দুর্গের ও আর্যসভ্যতার মিশ্রণ হলো তা নিয়ে কালসংক্রান্তি কবিতাটারই শেষের একটি অনবদ্য অংশ দিয়ে আলোচনা শেষ করি।

“শুক বলে, ক্ষমতাই সুখ। বলে কটাক্ষ-কৌতুকে—
তবেই না দুর্গ ও দুর্গার—দুর্নিবার স্তনযুগ—
হাতের মুঠোয় পাওয়া।
সূচের ইঙ্গিতে তাই নাচে সুতো, দোলে
পাতার সম্পুটে রক্তজবা।
এই জবা রাত্রিবেলা ফোটে।”
(ঐ)

চিরায়ত পথে কবি মন সব সময় ক্ষমতার সমালোচক, চর্যাগীতিকা থেকে আধুনিক বাংলা কবিতার সব বড় কবিই ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এ অবজ্ঞা ও সমালোচনা শিল্পের চন্দনে প্রস্ফুটিত রক্তগোলাপ। আমি তাই মনে করি। সোহেল হাসান গালিব তার কাব্যভাষায় বাংলাদেশের ক্ষমতার বলয়কে চিহ্নিত করেছেন।

ইতিহাস ও রাজনীতি সচেতনতা এক ধরণের বোধের জন্ম দেয়। সৃষ্টির চেতনা বা বোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো রাজনীতি। রাষ্ট্র গঠনের সমপর্বের পর আমরা চাইলেও আর এর বাইরে যেতে পারি না। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী থেকে কথাসাহিত্যে যদি তাকাই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এমনকী কমল কুমার মজুমদারের রচনাও এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য। কবি সোহেল হাসান গালিব পায়ে বিঁধেছে হসন্ত’তে যে অভিনব কবিতা পড়িয়েছেন তা আমাদের ইতিহাসকেই নতুনভাবে দেখাচ্ছে। সোহেল হাসান গালিবের কবিতা যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ যেমন তেমনি বাংলা সাহিত্যেও গুরুত্বপূর্ণ পায়ে বিঁধেছে হসন্ত। আধুনিক সভ্যতাকে ইতিহাসে পাওয়া যাবে না ভালো করে, পাওয়া যাবে সাহিত্যে, এ প্রসঙ্গে কাফকার সাহিত্যের প্রসঙ্গ এনেছিলেন একজন সমালোচক। আমাদের সময়কেও ইতিহাস নয় সাহিত্যেই পাওয়া যাবে, এ ধ্রুব সত্য। পায়ে বিঁধেছে হসন্ত সেই সময়েরই এক ঘন অরণ্য, যেখানে বিভিন্ন বাঁকে, রহস্যে মুড়ে আছে আমাদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, কবিতায়। আর কবিতা বলতে কী বোঝায়? কবিতা মানেই যা নতুন, এই বইটিও তাই। শুধু নতুন নয়, এর মধ্যে কালোত্তীর্ণ হবার লক্ষণও ফুটে আছে স্পষ্ট হয়ে।

পায়ে বিঁধেছে হসন্ত
লেখক: সোহেল হাসান গালিব
বিষয়: কবিতা
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী, ২০২৫
প্রকাশক: বুনন
মূল্য: ২৫০ টাকা।

পায়ে বিঁধেছে হসন্ত কবিতার বইটি কিনতে চাইলে।

মন্তব্য করুন

🛒 Cart 0