সেই টেলিফোন আর চিঠির যুগের উপন্যাস হুমায়ূন আহমেদের অপেক্ষা। যখন মানুষ মানুষকে মনের কথা বলতে ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করতো, মোবাইল না থাকায় টেলিফোন, আর যাদের টেলিফোন নেই তাদের কাছে চিঠি লেখা। আর চিঠি লিখে উত্তরের জন্য অপেক্ষা। যেমন যেমন হুমায়ুন আহমেদের অপেক্ষা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুরাইয়াও করে। তার স্বামী হাসানুজ্জামানকে অফিসের টেলিফোনে কল দিয়ে ছেলে ইমনের দাঁত পড়ার খবর দিতে, দেবরের জল বসন্ত ও এম এ পরীক্ষা না দেওয়ার খবর জানাতে। এই ছোট ছোট অপেক্ষাগুলোকেই আমরা বলি সুখ, কল দেবে কি দেবে না করে অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে খবরগুলো স্বামীর কাছে জানাতে পেরে সুরাইয়া যে অদ্ভুত আনন্দ পায়। আসলে এইগুলোই একজীবনের সুখস্মৃতি হয়ে থাকে। যদি ভেবে দেখি একটি সাধারণ-স্বাভাবিক জীবনের প্রাপ্তি আদতে এই অপেক্ষার পর পাওয়া সুখগুলোই।
কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ যদি এখানেই ইতি টানতেন? যদি তিনি অপেক্ষার ছোট ছোট সুখগুলোই দেখাতেন আমাদের? তাহলে আমরা বৃহত্তর জীবনকে দেখতে পেতাম না উপন্যাসটিতে। কারণ অপেক্ষার যন্ত্রণা আছে, এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে আশাও। যে আশা যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে জীবনের বৃহত্তর পরিসরে দেখায়, জীবনকে ভীষণ কঠোর পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে শেখায়। এই জায়গা থেকেই উপন্যাসটি শুরু হয়। হুমায়ূন আহমেদের অপেক্ষা উপন্যাসটির শুরুর পর্বটি দ্রুতই শেষ হয়, যখন সুরাইয়া তার স্বামীকে ছেলের দাঁত পড়ার কথা জানায়, যখন মনে হয় খুবই সুখী এক পরিবার সুরাইয়ার, ছেলে, স্বামী আর দেবর ফিরোজকে নিয়ে। আর বছরে একমাস তার শাশুড়িও বেড়াতে আসেন। দাদীর সঙ্গে ছেলে ইমনের খুব ভাব। এরকম যখন মনে হচ্ছে—ওইদিনই রাতে সুরাইয়ার স্বামী বাড়ি ফেরে না। সুরাইয়া অস্থির হয়ে পায়চারি করে, ফিরোজকে বলে, সুরাইয়ার বড় ভাই যিনি ব্যবসায় ছাড়া আর কিছু বুঝেন না, তাকে জানায়। কিন্তু তার স্বামী বাড়ি ফেরে না, ফিরোজ থানাসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে, এমনকি আত্মার সাথে কথা বলতে পারে এমন এক সংঘের সঙ্গেও যোগাযোগ করে। কিন্তু শত চেষ্টাতেও হাসানুজ্জামান মাসের পর মাস লাপাত্তাই থাকে। তো তখন সুরাইয়ার গর্ভে তাদের অনাগত সন্তান, সুরাইয়া এক মেয়ে সন্তান জন্ম দেয়, তার নাম রাখে সুপ্রভা।
হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু আমার ধারণা, হুমায়ূন আহমেদ একটি বিষয় আবিষ্কার করেছিলেন, তা হলো বাঙালির বোহেমিয়ান সত্তা। সবার মধ্যে থেকেও না থাকার অনুভব, দুঃখ থেকে পালিয়ে যেতে চেয়ে দুঃখকেই বরণ করা।
একসময় স্বামীর ভাড়া বাসা ছেড়ে সে গিয়ে ওঠে তার ব্যবসায়ী বড় ভাই জমিলুর রহমানের বাসায়। বড় ভাই তার জন্য বিভিন্ন পাত্র দেখেন, কিন্তু সুরাইয়া বিয়েতে রাজী হয় না। তার মেজাজ খিটখিটে হতে শুরু করে। কারো সঙ্গেই মানিয়ে নিতে পারে না, পৃথিবী অসহ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সে বেঁচে থাকে, কারণ তার দৃঢ় বিশ্বাস তার স্বামী একদিন ফিরে আসবে। এই অপেক্ষাই তাকে মরতে দেয় না।
উপন্যাসটিতে সুরাইয়ার অপরপিঠে আরেকটি চরিত্র এঁকেছেন হুমায়ূন আহমেদ, সে হলো সুরারইয়ার বড় ছেলে ইমন। সে তার মায়ের একদম বিপরীত। সে অপেক্ষা করে না। জীবন তার কাছে দুর্বিষহ, সে অপেক্ষার বদলে পর্যবেক্ষণ করে। সে অনেকটাই আবেগের বশে চলে, সমাজের সাধারণ নিয়মনীতির পরোয়া করে না। বিষয়টি আমরা দেখতে পাই যখন খুনের দায়ে মামত ভাই শোভন জেলে যায়, সেই মামাত ভাইয়ের খোঁজ নেয় না কেউ কিন্তু ইমন নেয়। সে তার সঙ্গে দেখা করে, সঙ্গ দেয়। ইমনকে ছাত্রী নবনী ভালোবাসে, কয়েকদিনের বড় মামাত বোন মিতু তাকে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু ইমন সচেতন এক দূরত্ব রচনা করে রাখে নিজের চারপাশে। সে আসলে জীবন থেকে পালিয়ে যেতে চায়, সে তার বোন সুপ্রভাকে হারিয়েছে, চাচাকে হারিয়েছে, তার বাবা ফেরেনি আর। তার জীবনের সব অবলম্বনই কোথায় যেন তার অজান্তেই হারিয়ে গেছে। তার মা বিশ্বাস করে তার বাবা ফিরবে কিন্তু সে মনে করে এ অসম্ভব। ফলে সে জানে পাওয়ার কিছু নেই, তাই অপেক্ষারও নেই কিছু। কিন্তু সে ঠিকই জানে অপেক্ষার গুরুত্ব, সে তার মৃত বোনের কাছে একটি চিঠি লেখে, তার এক জায়গায় বলে,
“মা’র শরীরের যে অবস্থা তাতে তাঁর বেঁচে থাকার কথা না, তারপরেও আমার ধারণা তিনি দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকবেন কারণ তিনি অপেক্ষা করছেন। বড় মামা বেশী দিন বাঁচবেন না, কারণ তিনি এখন কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছেন না।” (অপেক্ষা, হুমায়ূন আহমেদ)
হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু আমার ধারণা, হুমায়ূন আহমেদ একটি বিষয় আবিষ্কার করেছিলেন, তা হলো বাঙালির বোহেমিয়ান সত্তা। সবার মধ্যে থেকেও না থাকার অনুভব, দুঃখ থেকে পালিয়ে যেতে চেয়ে দুঃখকেই বরণ করা। এই কারণেই তার চরিত্ররা কঠিন পরিস্থিতিতে হেয়ালি করে, যা অদ্ভুত বলে বোধ হয়, কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় বাংলাদেশের গ্রাম ব্যবস্থা ভারতবর্ষের গ্রাম ব্যবস্থার চেয়ে ভিন্ন ছিল, গ্রামের জড় ও জমাট ভাবটি ছিল না, তার বদলে ছিল নিঃসঙ্গতায় আকীর্ণ ও নিঃসঙ্গ মানুষদের, এই কারণেই এখানে বাউলেরা দূর দূরান্তে ঘুরে বেড়ায়, গৃহত্যাগী হয় অনেক মানুষ। এই হুমায়ূন আহমেদের প্রস্থানের বহু পরেও, বিভিন্ন আকৃতির সেই গৃহত্যাগ রয়েছে আমাদের মধ্যে অনেকের, যা চট করে ধরা যায় না। হুমায়ূন বাংলাদেশের সেই আদিম আত্মাটিকে ধরতে পেরেছিলেন, তার দুঃখটিকে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তার দুঃখটি কী? তা সে জানে না, আর জানেনা বলেই জীবনকে পৃথিবীর অন্য ভূখণ্ডের চেয়ে ভিন্নভাবে দেখে এখানকার মানুষ, তার ভেতর এক সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসীনী আছে। এক অচিনপুর আছে তার ভেতর, হুমায়ূনই এক উপন্যাস লিখেছিলেন এই নামে। আর আছে অপেক্ষা। যে উপন্যাসে বাঙালিকে সম্পূর্ণ করে পাওয়া যায় তার অপূর্ণতার ভেতর। উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি।
আহমদ ছফা যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝির হোসেন মিয়া চরিত্রটিকে নিয়ে বলেছিলেন মানিক এই হোসেন মিয়াকে আদতে ইতিহাস হিসেবেই নির্মাণ করেছিলেন, হুমায়ূন আহমেদের অপেক্ষা উপন্যাসের সুরাইয়াও আসলে আর কেউ নয় তাকে হুমায়ূন অপেক্ষা বস্তুটির মানুষরূপ করে এঁকেছেন। সে বাঙালির অপেক্ষর রূপ। পুরো উপন্যাসের সব চরিত্রই কোনো না কোনোভাবে অপেক্ষা করছে, সুরাইয়ার বড় ভাই যিনি একসময় অপেক্ষা করা ছেড়ে দিয়েছেন উচ্ছন্নে যাওয়া দুই সন্তানের কারণে, তিনিও অপেক্ষাই করছেন, সেই অপেক্ষা ইমনের চিঠিতেই আছে, মৃত্যুর। ইমনের ছোটবোন সুপ্রভা যে সবাইকে আপন করে নিতো, যাকে সবাই খুব ভালোবাসত, সে পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করায় মায়ের বকুনি খেয়ে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেয়, সেও কী মরণেরই অপেক্ষা করছিল না? আর সবচেয়ে রসহ্য যে মানুষটিকে নিয়ে, সুরাইয়ার স্বামী হাসানুজ্জামান, উপন্যাসের শুরুতেই তাকে এক সুখী স্বামী ও বাবা হিসেবে দেখি আমরা, সে কেন কোনো পূর্ব ঘোষণা না দিয়েই হারিয়ে গেল? তার কোনো শত্রুর খোঁজও পাওয়া যায় না, হুমায়ূন এর ভেতর দিয়ে আমাদের ইঙ্গিত দেন সে হয়তো অবশেষে সমাজ সংসারের গৎবাঁধা জীবন থেকে পলায়ন করতে পেরেছিল, কিন্তু সে কি ফিরবে? এই দোলাচলটিই তো উপন্যাসটিকে শুরু থেকে শেষ অবধি তাড়িয়ে নিয়ে যায়। আসলেই কী তাই? সেই রহস্য না ঘুচিয়ে আমাদের উপরেই সিদ্ধান্তের ভার চাপিয়ে দেন হুমায়ূন।
তবে এই প্রশ্নটি থেকে যায়, যে, কে জিতেছিল? অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে যারা, যাদের মধ্যে পড়ে হাসানুজ্জামান আর তার মেয়ে সুপ্রভা (ফেরা নিয়ে হাসানুজ্জামান বিষয়ে আগে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত টানা না গেলেও সুপ্রভা অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পৃথিবীর ’পার চলে গেছে চিরতরে।) নাকি সুরাইয়া, যে কখনও অপেক্ষা থেকে অবসর নেয় না। এই প্রশ্নটির উত্তর আমাদের নিজের জীবনে পরখ করেই বের করতে হবে। কারণ আমরাও অপেক্ষা করি, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ অপেক্ষার অবসান ঘটায়। তবে আমরা দেখতে পাই, সুরাইয়া তার ভাইয়ের মেয়ে মিতুর সঙ্গে তার ছেলে ইমনের বিয়ের দিন শান্তি খুঁজে পেয়েছিল। সুরাইয়া ওইদিন সব ভাবনার সঙ্গে সন্ধি করে ফেলে, জীবনকে গভীর থেকে দেখে ও অনুভব করে। সুরাইয়া যেন হেরমান হেসের সেই সিদ্ধার্থ উপন্যাসের সিদ্ধার্থের মতো নির্বাণ খুঁজে পায়। তবে ভিন্নভাবে, সিদ্ধার্থ মানুষকে নদী পারাপার করিয়ে নির্বাণ পেয়েছিলেন আর সুরাইয়া পায় জীবনভর অপেক্ষা দিয়ে। আর অপেক্ষাকে যদি কেউ পাগলামী মনে করেন তাহলে হুমায়ূন আহমেদই তার চরিত্রের মাধ্যমে আমাদের জনাচ্ছেন, “মিতুর ধারণা সব মানুষের মধ্যে কিছু কিছু পাগলামী আছে—তার মধ্যেও আছে।” (ঐ)
অপেক্ষা
লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
প্রকাশকাল: প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ১৯৯৭
আফসার ব্রাদার্স সংস্করণ: ২০২৩ (৩২তম সংস্করণ)
মূল্য: ৪০০ টাকা।
