আত্মজীবনীতে সর্বাংশে সত্য বলা যায় না, কিছু মিথ্যা সেখানে আলগোছে ঢুকে পড়ে। কারণ মানুষের স্মৃতি বড় নির্মম, স্মৃতি থেকে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। কিন্তু সত্যের প্রতি নিষ্ঠ থাকার জন্য আত্মজীবনী কখনও মানা করে না, রুশোও তার আত্মজীবনী আমি রুশো বলছি-এর ভূমিকায় তা স্বীকার করেছেন। তিনি সত্যের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থেকেছেন, তার জীবন ও কালকে তুলে এনেছেন সম্পূর্ণভাবে স্মৃতির উপর নির্ভর করে। যা আজও আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। আকবর আলি খানের পুরনো সেই দিনের কথা আত্মজীবনীটিও রুশোর মতো সত্যের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। এর চেয়েও বেশি তার সত্যের প্রতি নিষ্ঠা তার চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সততার প্রমাণ দেয় আমাদের কাছে। এই প্রমাণ পাওয়া যায় যখন তিনি তার বংশবৃত্তান্তের শুরুতেই তাদের নবীনগরের রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা বামুন খাঁ’র মহাজন বা সুদের ব্যবসায়ী হওয়ার কথা বলেন। তিনি ব্রাহ্মণ থেকে মুসলমান হয়েছিলেন বলে তার সুদের ব্যবসায়কে অন্য মুসলমানরা খারাপভাবে নেয়নি—যদিও এও যোগ করেছেন। এই অকপট সত্যনিষ্ঠতাই আকবর আলি খানের আত্মজীবনীটিকে আলাদা করে দিয়েছে। আর এই মহাজনী ব্যবসার সঙ্গে ব্রিটিশদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটি বিরাট যোগসাজশ ছিল, আকবর আলী খান তাও দেখিয়েছেন, এ বিষয়টি বদরুদ্দীন উমরের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলার কৃষক বইটিতে সবিস্তারে এসেছে, আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। বংশবৃত্তান্ত অংশটিতে বামুন খাঁ’র সময়ে সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নবীনগর থানা এই অঞ্চলগুলোতে মুসলমানদের শতকরা হারও তুলে ধরেছেন তিনি, ফলে তার আত্মজীবনীটি যে সমাজ-ইতিহাস বহির্ভূত স্মৃতি থেকে তিনি শুরু করেননি তার প্রমাণকে শক্ত জমির উপর দাঁড় করায়। বংশধারার সূত্রের সন্ধান করতে করতে তিনি পলাশী যুদ্ধ, ব্রিটিশদের শাসন এবং এর পূর্বে মুসলমান শাসকদের কারণে অনেক উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণ পর্যন্ত ইতিহাস তুলে এনেছেন। সেই সময়ে পঞ্চদশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথের পরিবার যে পিরআলী ব্রাহ্মণ উপাধি পেয়েছিল তারও রসজ্ঞ বর্ণনা দিয়েছেন। আকবর আলি খানের লেখায় রবীন্দ্রনাথ থাকবেনই তার আত্মজীবনীতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
হবিগঞ্জে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেখেন হবিগঞ্জে তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল রয়েছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান এম এ রব তাকে তার দায়িত্ব পালনে প্রভূত সাহায্য করেন, ফলে এই কোন্দল তার বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ রব ছিলেন আকবর আলি খানের চাচাত ভাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর শওকত আলী খাঁন-এর ব্যাচম্যাট। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের সম্পর্ক আরো প্রগাঢ় হয়েছিল।
আকবর আলি খানের পরার্থপরতার অর্থনীতি, আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি বই দুটি থেকে পুরনো সেই দিনের কথা বইটি বিষয়গত কারণেই ভিন্ন। তবে, মিল রয়েছে লেখার শৈলি ও রসবোধে, আর এই বইটিতেও মাঝে মাঝেই অর্থনীতি এসেছে প্রসঙ্গক্রমে। নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেনের মিত্রপক্ষের গুলি তত্ত্বটির দারুণ অবতারণা করেছেন তিনি তার মহকুমা প্রসাশক হিসেবে সিলেটের হবিগঞ্জে মহকুমা হাকিমের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা বর্ণনার সময়। তখন দুধে পানি মেশানোর উপর মামলার সংখ্যা হঠাৎই বেড়ে গিয়েছিল, এর থেকেই তিনি মিত্রপক্ষের গুলি তত্ত্বটির সাক্ষাৎ পান। আকবর আলি খান হবিগঞ্জের ঘটনাটিকে বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক দুই জায়গাতেই দেখতে পেয়েছেন। তত্ত্বটি হলো, অনেক সময় আমাদের ক্ষতি শত্রুরা করে না করে মিত্ররা। যাইহোক, এই কোর্ট পরিচালনার সময়েই পেশকারদের ঘুষ খাওয়া নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হাজির করেছেন তিনি, যা তখনকার বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তিনি ধারণা করেছেন। বিষয়টি হলো মামলা জিতিয়ে দেওয়ায় অনেক সময় হাকিম ও পেশকারের যোগসাজশ আবার কখনও পেশকারের মামলার অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে মামলা জেতার অনুমানের উপর ঘুষ খাওয়া—কিন্তু দেখা গেছে এই ঘুষ একটি চক্র তৈরি করে। এমনকি তখন উকিলদের পর্যন্ত পেশকারদের ঘুষ দিতে হতো মামলার নথিপত্র লিখিয়ে নিতে। পেশকারদের ঘুষ খাওয়া অবশ্য আগের মতোই আছে কিন্তু এই যে নির্ভরশীলতার কারণে ঘুষের উৎপত্তি, একেই মূল দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন আকবর আলি খান। যা বাংলাদেশে মহামারীর আকারে রয়েছে এখনও। মহকুমা প্রশাসক হিসেবে হবিগঞ্জে বিচিত্র কাজ করতে হয়েছে তাকে, প্রশাসনের নিত্যনৈমিত্তিক কাজের বাইরেও প্রায় ৯মাস ৩টি চা-বাগানের দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে, মামলা পরিচালনার কথা উপরে বলা হয়েছেই। তবে আত্মজীবনীর এই অংশটিতে ব্রিটিশ আমলে পুলিশ বাহিনী গড়ে ওঠার ইতিহাসসহ আরো বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করলেও পাকিস্তান আমলের প্রশাসনিক ব্যবস্থাটি অনবদ্য সংক্ষিপ্ততায় খুঁটিনাটিসহ তুলে ধরেছেন তিনি। যা বইটিতে অন্যরকম গুরুত্ব যুক্ত করেছে।
আকবর আলি খানের পুরনো সেই দিনের কথা পড়ার সময় দুইটি বিষয় চোখে পড়ে, এক, এর মধ্যে থাকা নিরেট ইতিহাস, আর অন্যটি, তার ব্যক্তি অভিজ্ঞতালব্ধ ঘটনাবলী, নিরেট ইতিহাস এসেছে তার ব্যক্তি অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের সাহায্যকারী হিসেবে। বইটির মূল বিষয়বস্তুতে রয়েছে, তার নবীনগরের রসুল্লাবাদ খাঁ বাড়ীর পূর্বপুরুষদের ইতিহাস, তার শৈশব-কৈশোর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন, সিভিল সার্ভিসে যোগদান, শিক্ষানবিশকাল, হবিগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক হিসেবে যোগদান, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে তার জীবন—এসব নিয়েই পুরনো সেই দিনের কথা। মুক্তিযুদ্ধের আগে সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক হিসেবে ১৯৬৯ সালে দায়িত্ব নেন আকবর আলি খান। এটা তার প্রথম কর্মস্থল এবং এখান থেকেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের মার্চের ভাষণও এখানেই শুনেন রেডিওর মাধ্যমে, সারাদেশেই ভাষণটি ছড়িয়ে গিয়েছিল রেডিওতে। হবিগঞ্জে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেখেন হবিগঞ্জে তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল রয়েছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান এম এ রব তাকে তার দায়িত্ব পালনে প্রভূত সাহায্য করেন, ফলে এই কোন্দল তার বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ রব ছিলেন আকবর আলি খানের চাচাত ভাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর শওকত আলী খাঁন-এর ব্যাচম্যাট। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের সম্পর্ক আরো প্রগাঢ় হয়েছিল। বইটিতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে, মুক্ত হবিগঞ্জ, আগরতলায় মুক্তিযুদ্ধ, কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ শিরোনামে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের ও পরের ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে অধ্যায়গুলোতে।
১৫টি অধ্যায়ে পুরনো সেই দিনের কথা আত্মজীবনীটিতে আকবর আলি খান তার জীবনের ২৯ বছরের অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। তার এই অভিজ্ঞতা স্বর্ণসম, যারা তার প্রবন্ধের পাঠক, তার অর্থনীতি ও গবেষণাধর্মী বইয়ের পাঠক তারা যেমন আকবর আলি খানের লেখার প্রেরণার বিষয়ে জানতে পারবেন সেইসাথে বইটি আরেকটি কারণেও গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো এর ভেতরে থাকা মহামূল্যবান ইতিহাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, তার জন্মঅঞ্চলে ধর্মগুরুদের মধ্যে ধর্মান্ধতার বীজ তবু সবন্বয়বাদী সুফী ধর্মপ্রচারকদেরও থাকার কথা, হিন্দু জমিদারদের মুসলমান প্রজা শোষণ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মহাজনী সুদের ব্যবসায় তো প্রথমে বলেছি—এসবই তার নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। নিজের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস বিষয়ে এই নিরপেক্ষতা বইটিকে সত্যের মর্মমূলে প্রবেশ করিয়েছে। বইয়ের উপসংহারে তার আরেকটি পরিচয় পাই আমরা, সেটি হলো জীবনে এত এত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেও তিনি যে লেখক হয়ে উঠেছিলেন তার পটভূমির কথা এবং তিনি যে তার প্রতিটি বইয়ের জন্য বহু বহু বছরের গবেষণার কথা। বই যে শৌখিনতা নয় তার শ্রম ও গবেষণা তার প্রমাণ দেয়। “রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা শুরু করি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে। ভাবনা ও দুর্ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রকাশিত হয় ৫৮ বছর পর–২০১৯ সালে। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা শুরু করি ১৯৮০ সালে। ডিসকভারি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে–প্রায় ১৬ বছর পর।”
(পুরনো সেই দিনে কথা, আকবর আলি খান)
আর একটি আক্ষেপও এসেছে বইয়ের উপসংহারে,
“প্রথম ২৯ বছর বয়সে আমার জীবনে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। প্রথম ঘটনা হলো বিএ অনার্স ও এমএ পরীক্ষায় খুব উঁচু নম্বর পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করা সত্ত্বেও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাইনি। আমার আগে পাঁচ বছর ধরে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন, তাঁদের সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের কাজ করেছেন এবং পরবর্তীকালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগ দিয়েছেন। আমার ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয়নি। তার কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি এবং বিভাগীয় রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ওসমান গণি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক করতে রাজি ছিলেন না।”
(ঐ)
তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না পাওয়ার পেছনের রাজনীতি অতটা আশ্চর্য করে না, যখন লুই আলথুসেরের আইডিওলজিকাল স্টেট এ্যাপারেটাস তত্ত্বের কারণে জানি রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন দল সবসময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার আদর্শের বিস্তার চায়, তখন পাকিস্তান পিরিয়ড, আর আকবর আলি খান তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে এই আত্মজীবনীতেই গর্ববোধ করেছেন। তবে আকবর আলি খানের মতো বিরোধী মতের জ্ঞানীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না দিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়টিকে যে পাকিস্তান সরকার পুরোপুরি কুক্ষিগত করতে পারেনি তার প্রমাণ তো মুক্তিযুদ্ধ স্বয়ং।
দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো একটি তার অন্তর্দ্বন্দ্ব, বামরাজনীতি ও বিলাসবহুল জীবনের দ্বন্দ্ব নিয়ে, এই বিষয়টি আকবর আলি খানের সত্তাকে দারুণভাবে প্রকাশ করে, এবং তিনি এখানে সততার প্রমাণ রেখেছেন, সম্পূর্ণ অংশটিই তুলে দিচ্ছি এখানে,
“দ্বিতীয়ত, চাকরি না পাওয়ায় আমার জীবনে একটি বড় দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। আমি একদিকে ছাত্র ইউনিয়ন করতাম এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা ভাবতাম। অন্যদিকে আমি বিলাসী জীবনযাপন করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে আমি চেইন স্মোকার হয়ে যাই। সিগারেটের জন্য আমার প্রচুর টাকা লাগত। আমি বিদেশি বই কিনি। তার জন্য আমার টাকা লাগত। আমি ভালো খাবারদাবার পছন্দ করতাম, তার জন্য আমার টাকা লাগত। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না পাওয়ায় এসবই আমার বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সহৃদয় আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় আমি সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার আগপর্যন্ত টিকে ছিলাম। তখন আমি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি, হয় আমার বামপন্থী রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া উচিত, নয় আমার বিলাসবহুল জীবন প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নেমে আসা উচিত। আমি শ্রেণিচ্যুত হতে রাজি হইনি, আবার বাম রাজনীতির প্রতি আনুগত্যও ছুঁড়ে ফেলতে পারিনি। এই দ্বন্দ্ব আমাকে সারা জীবন ভুগিয়েছে।”
(ঐ)
বইয়ের এই উপসংহারটি নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে অকপটে তার জীবনের মোড় ঘুরানো ঘটনাগুলো ও কর্মের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রেষণার কথা উঠে এসেছে। তিনি যেমন সংক্ষেপে তার কাজের পেছনে থাকা মোটিভ তুলে ধরেছেন এবং তিনি কেন ভিন্ন তাও এই উপসংহারে বোঝা যায় ভালোভাবে। হবিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক থাকাকালীনই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উপলব্ধি দিয়ে শেষ করি আলোচনা।
“এই সময়ে আমার জীবনের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো মুক্তিযুদ্ধে আমার অংশগ্রহণ। আমি ছিলাম পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সদস্য। সিএসপি ছিল পাকিস্তানের স্টিল ফ্রেম। সিএসপিরাই এক হাজার মাইলের ব্যবধানে। অবস্থিত দুটি অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগণকে এক রাষ্ট্রে ধরে রেখেছিল। তবু আমি এই স্টিল ফ্রেম থেকে বেরিয়ে যেতে দ্বিধাবোধ করিনি। তার কারণ হলো মানুষের তৈরি আইনের ওপরেও আইন রয়েছে। সেটি হলো খোদার আইন বা প্রকৃতির আইন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে নৃশংসতার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে তাদের দখল প্রলম্বিত করেছিল, তা পৃথিবীর যেকোনো আইনের পরিপন্থী। এ ধরনের আইনবহির্ভূত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার কোনো দায়িত্ব আমার ছিল বলে আমি মনে করি না।”
(ঐ)
এই উপলব্ধিই তার চালিকাশক্তি নিঃসন্দেহে, কারণ তার প্রতিটি লেখা ও গবেষণায় বাংলাদেশের প্রতি দরদ যে দেখতে পাই আমরা, এর উৎস বাংলাদেশ ও এর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। আকবর আলি খানের পুরনো সেই দিনের কথা শুধু তাকেই নয় তার সময়কেও উন্মোচিত করেছে, আর তার সময়টি যেহেতু বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই বইটিও গুরুত্বপূর্ণ।
পুরনো সেই দিনের কথা
লেখক: আকবর আলি খান
বিষয়: আত্মজীবনী
প্রকাশনী: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশকাল: ২০২২ সাল।
পুরনো সেই দিনের কথা বইটি কিনতে চাইলে।
