পাওলো কোয়েলহোর (Paulo Coelho) দ্য আলকেমিস্ট (The Alchemist) পড়ার সময় পাঠকদের একটা ভাবনা আসে, যে, এই উপন্যাসে এত আরবীয় উপাদান কেন। এর উত্তর পেতে আমাদের যেতে হবে ইসলামের স্বর্ণযুগে যখন বনি উমাইয়া গোত্র শৌর্য-বীর্যে আরবের সব গোত্রকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল, আর সমগ্র আরবকে একসূত্রে গেঁথেছিল—সেই সময়ে। ইবনে খালদুনের আল-মুকাদ্দিমায় এই গোত্রপ্রীতি ও ইসলামের বিশ্বজয়ের বিষয়টি সবিস্তারে এসেছে। আগ্রহীরা আল-মুকাদ্দিমা পড়লে জানতে পারবেন। বনি উমাইয়া গোত্র আরবকে ধর্ম ও রাজশক্তির অধীনে নিয়ে আসার পর উমাইয়ারা বিশ্বজয়ের দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠে। আর তাদের গোত্রেরই একটি অংশ স্পেনের আন্দালুস দখল করে ও সেখানকার রাজশক্তির অধিকারী হয়। যে আন্দালুস থেকে পাওলো কোয়েলহো তার দ্য আলকেমিস্ট উপন্যাস শুরু করেছেন। খালদুনের মতে আরবরা রোম ও পারস্যও অধিকার করেছিল এই ধর্ম ও গোত্রপ্রীতির শক্তিতে।
ফাতিমা অপেক্ষা করেও, প্রতিদিন মরুভূমির দিকে সে তাকিয়ে থাকে, তার বিশ্বাস সান্তিয়াগো আবার ফিরবে। আর সান্তিয়াগো জানে যা তার নিজের তা কখনও হারাবে না, ফাতিমা যদি সত্যিই তার হয়ে থাকে তাহলে সে তাকে আবারও ফিরে পাবে। প্রেমের জন্য লক্ষ্যকে ভুলে যাওয়া ধ্বংসই ডেকে আনবে কেবল তার ও ফাতিমা দু’জনের জন্য।
এ তো ইসলামের প্রতাপের সঙ্গে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস, কিন্তু পাওলো কোয়েলহোর দ্য আলকেমিস্ট-এর মরুভূমি ও লক্ষ্যাভিমুখী তরুণ চরিত্রটির বিলাস-ব্যসনের দিকে মনোযোগ না দিয়ে জীবনের লক্ষ্য অর্জনে স্বর্বস্ব নিয়োগ করার শক্তি এল কোথা থেকে? এর উত্তরটাও জানতে যেতে হবে আরবের বেদুঈনদের কাছে। কারণ বনি উমাইয়াদের যে অংশ আন্দালুসের রাজশক্তির অধিকারী হয়েছিল, তারা মূল আরবের উমাইয়াদের মতোই বেদুঈন জীবন থেকে এসেছিল। কম খাবার তৃপ্তিসহযোগে খাওয়া, সহজ জীবন, বিলাস-ব্যসনে মনোযোগ না দেওয়া, লক্ষ্যের দিকে পূর্ণ মনোযোগ, সদা সতর্কতা—এসবই গহীন মরুর বেদুঈনদের বৈশিষ্ট্য। ঊষর প্রান্তরের যে দূর প্রান্তে ধূ ধূ বালিতে ক্যাকটাস ছাড়া আর কিছুই বেঁচে থাকতে পারে না, সেই অংশে ব্যতিক্রম হিসেবে শুধু উট আর তাদের মালিক বেদুঈনরাই বেঁচে থাকতে পারে। বেদুঈনদেরও মাত্রাভেদ আছে শুধু আরব বেদুঈনরাই মরুভূমির এই গভীরতর অংশে যায়, অন্য বেদুঈনরা যেমন তুর্কি, বারবাররা নয় কারণ তারা ভেড়া ও অন্য পশু চারণ করে বলে এতদূর যেতে হয় না। আরবের পল্লী ও নগরবাসী কেউ এই প্রান্তরে টিকে থাকার কথা ভাবতেও পারে না। আর এই মরুতেই গোত্রপ্রীতির জন্ম ও পরবর্তীতে ইসলামের আবির্ভাবের পর গোত্রশক্তিতে ধর্মের শক্তির প্রবেশ ও ইসলামের বিশ্বজয়ের ইতিহাস। তাই দ্য আলকেমিস্টে বারেবারে দূর যাত্রা ও উঠের কথা পাই আমরা। এর প্রধান চরিত্রও ভেড়ার পালের রাখাল। আর বইয়ের নামে যে আলকেমি তার জ্ঞানেও আরবদের অবদান অনস্বীকার্য।
কোয়েলহোর দ্য আলকেমিস্ট ১৯৮৮ সালে প্রকাশের পর যখন হারপার কলিন্স থেকে এর ইংরেজি অনুবাদ (১৯৯৩) প্রকাশিত হলো তখন থেকেই আন্তর্জাতিক বেস্টসেলারের তকমা পেয়েছে। এবং এখনও বইটি জনপ্রিয়। ক্লাসিকের মর্যাদা পেতে বোধহয় আর বেশি দেরি নেই। এই বইটির জনপ্রিয়তা হারুকি মুরাকামির উপন্যাসগুলোর সঙ্গেই করা যায় কেবল। বইটি বাংলাতেও অনেকে অনুবাদ করেছেন তবে সবচেয়ে ভালো অনুবাদ দুইটি হলো মাকসুদুজ্জামান খান ও জ্যোতির্ময় নন্দী’র। মাকসুদুজ্জমানের অনুবাদটি অনেকটাই কাব্যিক আর নন্দীরটা নিরেট গদ্যে, কিন্তু কোয়েলহোর রচনার রহস্যময়তা দুইটি অনুবাদেই রয়েছে।
পাওলো কোয়েলহোর অন্যসব বই, দ্য পিলগ্রিমেজ (১৯৮৭), মাকতুব (১৯৯৪), ইলেভেন মিনিটস (২০০৩), ভেরোনিকা ডিসাইসডস টু ডাই (১৯৯৮) থেকে দ্য আলকেমিস্ট কেন জনপ্রিয় তার কারণটাও অনুসন্ধান করে দেখা যেতে পারে এবার। একবাক্যে বললে এই উপন্যাসটির মধ্যে একটি ‘যাত্রা’ দেখতে পাই আমরা, যা একে লেখকের অন্য সব রচনা থেকে ভিন্ন করে তোলেছে। এই ‘যাত্রা’ মহাকাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, ফলে এই উপন্যাসটিও মহাকাব্যিক অবয়ব পেয়েছে।
দ্য আলকেমিস্ট-এর আখ্যানভাগটি একটু দেখে নেওয়া যাক, আন্দালুসের তরুণ রাখাল সান্তিয়াগো এক গীর্জার ধ্বংসাবশেষ থেকে বেড়ে ওঠা সিকামোর গাছের (চিনার গাছ) নিচে যখন প্রতিদিন ঘুমায়, তখন সে একটি পুনরাবৃত্ত স্বপ্ন দেখে প্রতিদিন, সে দেখে, একটি বালক তাকে বলে মিশরীয় পিরামিডের গোড়ায় গুপ্তধনের সন্ধানে যেতে। এই স্বপ্নটি সান্তিয়াগোর এতই গভীর থেকে আসা যে সে সেটি এড়াতে পারে না। সে এক বৃদ্ধা জিপসি স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারীর সঙ্গে আলোচনা করে স্বপ্নটি নিয়ে। এবং একসময় বেরিয়ে পড়ে অ্যাডভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে। বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায় সে, যেমন বিচ্ছিন্ন কয়েকটি চিত্রে তুলে ধরা যাক তার অ্যাডভেঞ্চারপর্বটি, সে পিরামিড দেখতে আসা ভ্রমণকারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এক দোকানে চাকরি নেয়, এবং দোকানটির স্থান বদলে সমতল থেকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ায় অবদান রাখে, এবং পরিণামে দোকানটিই বদলে যায়। আবার সে পথিমধ্যে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে যায়, বণিকদের সঙ্গে থেকে। একজন আলকেমিস্ট তাকে ঘোড়া ও উটের পার্থক্য বিষয়ে বলে। গোত্রযুদ্ধ এড়াতে একসময় যেখানে তার ক্যারাভান থামে সেখানে এক মরুদ্যানে সে খোঁজ পায় তার প্রেয়সী ফাতিমার। তাদের প্রথম পরিচয় পর্বের বর্ণনা মাকসুদুজ্জামান ও জ্যোতির্ময় নন্দীর অনুবাদে পাই,
“ ‘রাখাল ছেলেরাও যে বই পড়তে পারে তাতো জানতাম না।’ পিছন থেকে বলে উঠল মেয়েটা।
আন্দালুসিয়ার সাধারণ বেশভূষার এক মেয়ে। ঢেউ খেলানো চুল আছে তার। চোখদুটো দেখলে ঠিক ঠিক মুরিশ শাসকদের কথা মনে পড়ে যাবে।
‘আসলে আমি বই থেকে যতটা শিখি তারচে বেশি শিখি ভেড়াগুলোর কাছ থেকে।’
(দ্য এ্যালকেমিস্ট, অনুবাদ: মাকসুদুজ্জামান খান)
“এমন সময় তার পেছন থেকে একটা মেয়ে বলে উঠল, ‘ভেড়ার রাখালও যে লেখাপড়া জানতে পারে সেটা তো আমার জানা ছিল না!’
মেয়েটা একেবারে পাক্কা আন্দালুসীয় মেয়েদের মতোই—কালো লম্বা চুল, আর চোখদুটো অস্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয় মুর বিজেতাদের কথা।
জবাবে ছেলেটা বলল, ‘আসলে আমি বই থেকেও বেশি শিখি আমার ভেড়াদের কাছ থেকেই।’”
(দ্য আলকেমিস্ট, অনুবাদ: জ্যোতির্ময় নন্দী)
সান্তিয়াগো দীর্ঘদিন সেই জায়গায় আরাম-আয়েসে বাস করে একসময় তার লক্ষ্যকেই ভুলে যায়। কোয়েলহো উপন্যাসটিতে আমাদের অনেক প্রাকৃতিক সংকেতের কথা বলেন, যেগুলো সান্তিয়াগো নজর রাখার উপদেশ পেয়েছে। কিন্তু একসময় সে জানতে পারে জীবনের লক্ষ্য থেকে একজন মানুষ যত দূরে সরে যেতে থাকে, অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে লক্ষ্য ভুলে যেতে থাকে ততই সেইসব সংকেত কমে যেতে থাকে, আর একসময় চিরতরে হারিয়ে যায়। সান্তিয়াগোর এখন অর্থকষ্ট নেই, তাহলে তার গুপ্তধনের কী দরকার? এরকম একটা ভাবনা আসতেই পারে। কিন্তু ভুললে চলবে না এই গুপ্তধনই তাকে পথে নামিয়েছিল, আর এতসব বিচিত্র অভিজ্ঞতা সে এর জন্যই পেয়েছে, এমনকি ফাতিমাকেও। তাই সে সব ছেড়ে গুপ্তধনের সন্ধানে আবার পথে নেমে পড়ে, ফাতিমাকে বলে তার জন্য অপেক্ষা করতে। ফাতিমা অপেক্ষা করেও, প্রতিদিন মরুভূমির দিকে সে তাকিয়ে থাকে, তার বিশ্বাস সান্তিয়াগো আবার ফিরবে। আর সান্তিয়াগো জানে যা তার নিজের তা কখনও হারাবে না, ফাতিমা যদি সত্যিই তার হয়ে থাকে তাহলে সে তাকে আবারও ফিরে পাবে। প্রেমের জন্য লক্ষ্যকে ভুলে যাওয়া ধ্বংসই ডেকে আনবে কেবল তার ও ফাতিমা দু’জনের জন্য।
এই হচ্ছে পাওলো কোয়েলহোর দ্য আলকেমিস্ট-্এর আখ্যানভাগ। উপন্যাসটির এই অ্যাডভেঞ্চার সি. পি. কাভাফির বিখ্যাত কবিতা ইথাকা’র কথা মনে করিয়ে দেয়। ইউলিসিসও ট্রয় যুদ্ধের পর তার জন্মদ্বীপ ইথাকায় ফেরার জন্য পৃথিবী ঘুরেছিল, বিভিন্ন দেশের বন্দরে এতসব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করেছিল ও সম্পদের মধ্য দিয়ে সে গিয়েছিল, কাভাফির ভাষায়, তা ইউলিসিসের দ্বারা সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র ইথাকারই জন্য। সান্তিয়াগোও পিরামিডের গোড়ায় গুপ্তধনের সন্ধানে বেরিয়ে যেসব অভিজ্ঞতা পেয়েছে তা যারা স্বপ্নে পাওয়া গুপ্তধনের খুঁজে বেরোয়নি তাদের জন্য পাওয়া অসম্ভব। তারা তাদের উদ্দেশ্যে আসা প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক সংকেতগুলো পড়তে ও বুঝতেও চেষ্টা করেনি। দুয়ার পেরিয়ে স্বপ্নের খোঁজে বেরোনোর আহ্বান পাই আমরা সর্বত্রই। কোয়েলহোর এই গুপ্তধন একটি রূপক, এর মানে হচ্ছে প্রত্যেক মানুষেরই একটি করে স্বপ্ন আছে, একটি করে লক্ষ্য আছে, কিন্তু সান্তিয়াগোর মতো কতজন তার সন্ধানে সর্বস্ব নিয়োগ করেছে, করে? খুবই অল্পজন। এই উপন্যাসেই তাদের এক-দুইজনের সাক্ষাৎ দেন কোয়েলহো। পথেই যাবতীয় সুখ ও আনন্দ, গুপ্তধন সেই যাত্রার শেষ গন্তব্য। ভিন্নভাবে এই একই যাত্রার দেখা পাই আমরা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি-এর মধ্যে, কাকতালীয়ভাবে উপন্যাস দু’টির প্রধান চরিত্রের নাম একই। দ্য আলকেমিস্ট-এর সান্তিয়াগোর মতো দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি-এর বুড়ো সান্তিয়াগোও হাল ছাড়ে না, বিপর্যয়, বাধা কিছুই তাকে টলাতে পারে না। এর কারণ তারা দুইজনই স্বপ্নের বাস্তবায়ন যে সম্ভব তা নিয়ে কোনো সংশয়ে ভোগে না, তারা নিশ্চিত তাদের স্বপ্নের ও লক্ষ্যের সত্যতা বিষয়ে। বলা যায় এই হচ্ছে মানব জীবন আর আমাদের সভ্যতাও এইসব নাছোড়বান্দা সান্তিয়াগোদেরই দান। যারা স্বপ্নের পৃথিবীর খোঁজে বেরিয়েছিল। এখনও যাদের প্রেরণা আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে, আমাদের মধ্যে সান্তিয়াগোকে জাগাতেই কোয়েলহো দ্য আলকেমিস্টের অবতারণা করেছেন।
দ্য আলকেমিস্ট
লেখক: পাওলো কোয়েলহো
বিষয়: উপন্যাস
প্রকাশকাল: ১৯৮৮ সাল।
ইংরেজি অনুবাদ সংস্করণ: ১৯৯৩ সাল।
জ্যোতির্ময় নন্দীর অনুবাদে পাওলো কোয়েলহোর দ্য আলকেমিস্ট (বাতিঘর সংস্করণ) বইটি কিনতে চাইলে।
মাকসুদুজ্জামান খানের অনুবাদে পাওলো কোয়েলহোর দ্য এ্যালকেমিস্ট (রোদেলা প্রকাশনী সংস্করণ) বইটি কিনতে পারেন।
