একটা বিশ্ববিদ্যালয়, এর উপাচার্য এবং শিক্ষক-ছাত্র রাজনীতির অধঃপতন ও দুর্নীতি নিয়ে একটি উপন্যাস শুরু করার পর শেষ না করে থামা যায় না। বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১), বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৭২), সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস (১৯৭৯)-এর লেখক আহমদ ছফার গাভী বিত্তান্ত এত নীরস বিষয়ের উপর কিন্তু পাঠকদের আদ্যোপান্ত টেনে রাখে এরকম উপন্যাস কয়টি আছে বাংলাদেশে ও বিশ্বসাহিত্যে তা ধারণা করা কঠিন। বাংলাদেশে তো নেইই, বিশ্বসাহিত্য নিয়ে বলা দুষ্কর। তার মানে দাঁড়াচ্ছে নীরস বলে মনে হলেও বিষয়গুলো আদতে অত নীরস নয়, কারণও পরিষ্কার, বিশ্ববিদ্যালয়টি যেনতেন কোনো শিক্ষাকেন্দ্র নয়, ব্রিটিশ আমলে জন্ম নিয়ে—বাংলাদেশ হওয়ার আগের ও পরের—বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি জাতীয় সংকট মুহূর্তে এর ভূমিকা ছিল। কিন্তু এটা কোনো উপন্যাসের বিষয় হিসেবে এলেও—যেমন জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছে তবু ৫২-এর অভিঘাতই সেখানে মূখ্য আবার পরবর্তী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে বিশ্বজিৎ চৌধুরীর অভিযুক্ত উপন্যাসেও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রীক রাজনীতির দেখা পাই তবু বিশ্ববিদ্যালয়টি মূল ভূমিকায় নয়—শুধু কোনো ঘটনা সংঘটনের কেন্দ্র হওয়ার জন্য ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিল্পে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিতে পারে না। কিন্তু শিল্পে ভূমিকা নিতে পারে রূপক, ঠিক এই কারণেই আহমদ ছফার গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসের গাভী রূপকের আনয়ন। আর এই রূপকের মাধ্যমেই উপন্যাসটিতে নীরস বিষয়গুলো এতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, এখানে ছফা গাভী বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নয়, এর উপাচার্য আবু জুনায়েদকে বুঝিয়েছেন, আর এই উপাচার্যের অবস্থার বর্ণনাতেই—গাভীটি কীভাবে তৈরি হলো—বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থার চিত্র তুলে এনেছেন। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের পুরো রাষ্ট্রকাঠামোটাই এই গাভী তৈরির সঙ্গে যুক্ত বলে ছফা আমাদের দেখাচ্ছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যেটি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তির কেন্দ্র ছিল একসময় তার বিবর্তন ও অধঃপতনের কারণগুলোর অবিশ্বাস্যরকম সত্য পর্যবেক্ষণ নিয়ে আহমদ ছফার গাভী বিত্তান্ত উপন্যাস। তবে ছফা এই কারণগুলো দেখিয়েছেন শিল্পের মানদণ্ডে, ফলে এর প্রভাবও গভীরতর।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষমতাসীন দলের বাইরে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবে এবং এতেই এর উৎকর্ষ ও প্রতিবাদী সত্তা প্রকাশিত হবে, কিন্তু আমরা প্রথমেই উপাচার্য বিষয়ে জানতে পারি তিনি নির্বিরোধ, “তবে খুব গোপন একটি তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। গোয়েন্দা রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, আবু জুনায়েদ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু করা দূরে থাকুক, জীবনে সভা-সমিতির ধার দিয়েও যাননি।” (গাভী বিত্তান্ত, আহমদ ছফা), এর মানে দাঁড়াচ্ছে আবু জোনায়েদকে নিয়ে সরকারের ভয়ের কিছু নেই, যেমন তার গাভী দুলালীকেও দেখতে পাই সে যাকেই সামনে পায় তাকেই চেটে দেয়, এখানে তাদের দুইজনের চরিত্রের দারুণ মিল। কিন্তু তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়টির অতীত গৌরবের পোষাকী অনুকরণ করতে চান, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হওয়ার মূল কারণ এর বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতাটিকেই বাদ দিয়ে
মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়া ও তৎপরবর্তী ঘটনাবলি নিয়ে আহমদ ছফার গাভী বিত্তান্ত উপন্যাস। সুন্দরী শিক্ষিকা দিলরুবা খানম আগের উপাচার্যর প্রিয় তরুণ এক শিক্ষকের প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডোরাকাটা দলে অত্যধিক তৎপর হওয়ার ফলেই নির্বিরোধ আবু জুনায়েদ হঠাতই উপাচার্য হন, ফলে তার উপাচার্য হওয়ার পেছনে সব কৃতিত্ব দিলরুবা খানমের। উপাচার্য হওয়ার পর আবু জুনায়েদের স্ত্রী নুরুন্নাহার বানু দিলরুবার সঙ্গে আবু জুনায়েদের সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েন, তাদের সংসারে এ নিয়ে বিভিন্ন ঝামেলা হয়। নুরুন্নাহার বেগমের কন্ট্রাক্টর বাবা আবু জুনায়েদকে নিজ খরচে পড়াশোনা করিয়েছিলেন, এ নিয়ে আবু জোনায়েদকে খোঁচা দিতে তিনি খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এইরকম টালমাটাল অবস্থায় ও হঠাতই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া আবু জুনায়েদের একটি গাভী পালনের ইচ্ছা হয়। তার শশুরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একজন কন্ট্রাক্টর শেখ তবারক আলী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন স্থাপনার কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করেন, শেখ তবারক আলীকেও জুনায়েদের শশুর কপর্দকশূন্য অবস্থা থেকে তুলে এনে কন্ট্রাক্টর বানিয়েছিলেন। শেখ তবারক আলী আবু জুনায়েদের জন্য গাভী রাখার একটি গোয়াল ঘর তৈরি করে দেন। এবং অবশেষে ষোলকলা পূর্ণ করে দুলালী নামে একটি গাভী আসে উপাচার্য আবু জুনায়েদের বাসভবনে।
আবু জুনায়েদের উপাচার্য হওয়া ও গাভী দুলালীকে বাসভবনে নিয়ে আসা, এই ঘটনাপরিসরের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালটির ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি, ঘুষবাণিজ্য, বিভিন্ন ছাত্রদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম, ধর্মীয় রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তির উৎকর্ষের ও গবেষণার বিপরীতে শিক্ষকদের বস্তুগত চাহিদা পূরণে অত্যধিক আগ্রহ এবং এসবের সঙ্গে উপাচার্য আবু জুনায়েদের কাউকে মনঃক্ষুণ্ন না করে তাল মিলিয়ে চলা ও স্ত্রীর চেয়ে নীচু অবস্থান থেকে আসার হীনমন্যতা—এসবই উপন্যাসটিকে রুদ্ধশ্বাস ও নাটকীয় করে তোলে। আহমদ ছফ যা যা উপন্যাসটিতে বলেছেন তার সবই সত্য, তিনি সত্যগুলোকেই বিভিন্ন ঘটনা ও চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে এক জায়গায় বলছেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় বারশ শিক্ষক। এখন শিক্ষকসমাজ বলতে কিছু নেই। আছে হলুদ, ডোরাকাটা, বেগুনি এসব দল।” (ঐ)
বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষমতাসীন দলের বাইরে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবে এবং এতেই এর উৎকর্ষ ও প্রতিবাদী সত্তা প্রকাশিত হবে, কিন্তু আমরা প্রথমেই উপাচার্য বিষয়ে জানতে পারি তিনি নির্বিরোধ, “তবে খুব গোপন একটি তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। গোয়েন্দা রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, আবু জুনায়েদ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু করা দূরে থাকুক, জীবনে সভা-সমিতির ধার দিয়েও যাননি।” (গাভী বিত্তান্ত, আহমদ ছফা), এর মানে দাঁড়াচ্ছে আবু জোনায়েদকে নিয়ে সরকারের ভয়ের কিছু নেই, যেমন তার গাভী দুলালীকেও দেখতে পাই সে যাকেই সামনে পায় তাকেই চেটে দেয়, এখানে তাদের দুইজনের চরিত্রের দারুণ মিল। কিন্তু তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়টির অতীত গৌরবের পোষাকী অনুকরণ করতে চান, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হওয়ার মূল কারণ এর বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতাটিকেই বাদ দিয়ে,
“আবু জুনায়েদ মাঝে-মধ্যে ধূমপান করেন। কিন্তু শুনেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজ উপাচার্য লরেন্স সাহেব সব সময় পাইপ টানতেন। পাইপ মুখে থাকলে লরেন্স সাহেবের মুখমণ্ডল ভেদ করে আশ্চর্য একটা ব্যক্তিত্বের প্রভা বিকিরিত হতো। তিনি সামনের দেয়ালে উপাচার্যের প্রতিকৃতিসমূহের মধ্য থেকে পাইপ মুখে দণ্ডায়মান লরেন্স সাহেবের সঙ্গে মনে মনে নিজের তুলনা করছিলেন।” (ঐ)
আর তার স্ত্রী সৌন্দর্যতত্ত্ব ধারণ করা বলতে যা বোঝায় তার একদম বিপরীত, তিনি তার নতুন বাসভবনের সামনে গোলাপের বদলে বেগুন ও মরিচ চাষ করতে করতে চান, তিনি বাগানের দায়িত্বে থাকা লোকটিকে গোলাপ বিষয়ে বলেন,
“নুরুন্নাহার বানু তোড়াটা নিলেন, কিন্তু বিশেষ খুশি হতে পারলেন না। সেটা তার ভাব ভঙ্গিতে প্রকাশ পেল।
তোমরা এতগুলো মানুষ সব বেহুদা পাতাপুতা লতা এসব লাগিয়ে গোটা জমিটাই ভরিয়ে রেখেছ। ওগুলো কোন কাজে আসবে? সব কেটে ফেলবে। এপাশে লাগাবে ঢেঁড়শ, ওপাশে বরবটি আর ওই যে খালি জায়াগাটা রয়েছে ওখানে লাগাবে বেগুন এবং সুরমাই মরিচের চারা। বাজারে চারা পাওয়া না গেলে বলবে, আমার বড় বোনের বাড়িতে অনেক আছে, এনে দেব।” (ঐ)
রাষ্ট্রে কবিদের প্রতিবাদী ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম, সব সরকারই কবি ও সাহিত্যিকদের সন্দেহের চোখে দেখে, ছফা উপন্যাসটিতে কবিদের হালচালও তুলে ধরেছেন,
“যেহেতু রাজনীতি সমাজের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, তাই কবিদেরও রাজনৈতিক ছাতার আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়। বিরোধী দলীয় কবিদের সুবিধে একটু বেশি। কারণ দেশের প্রতিষ্ঠিত সরকারকে আক্রমণ করা সহজ এবং তা করে অনায়াসে পাঠক বাহবা লাভ করা যায়। বিরোধী দলের কবিরা যদি স্লোগান দেয় কবিতা মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা রুখতে পারে। সরকার ঘেঁষা কবিরা আরো মনকাড়া স্লোগান উচ্চারণ করেন, প্রকৃত কবিতা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকিয়ে দিতে পারে।” (ঐ)
উপন্যাসটিতে শেখ তবারক আলী চরিত্রটি সবচেয়ে রহস্যময়, তিনি একজন কন্ট্রাক্টর, তবে তার সব কাজই চাঁদা, ঘুষ ও অন্যদেরকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে করতে হয়। ইঞ্জিনিয়ার থেকে একাউন্ট্যান্ট কেউই এই ঘুষের বাইরে না। বাংলাদেশের কন্ট্রাক্টরি নিয়ে যাদের সামান্য অভিজ্ঞতাও আছে তারা জানেন এখানে সবই ঘুষের উপর চলে। ছফা এই শেখ তবারক আলী চরিত্রটিকে একজন এজেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, তবারক আলী রাষ্ট্রের উন্নয়ন কার্যক্রমের একজন সম্মুখসারির এজেন্ট। আমাদের চারপাশের যত সরকারী স্থাপনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম দেখি তার সবই হয়েছে বা হয় এই কন্ট্রাক্টরদের দ্বারা, তাই এই চরিত্রটি দিয়ে ছফা বুঝিয়েছেন সেইসব উন্নয়ন আসলে কিভাবে সাধিত হয়েছে, মাঠ পর্যায়ের ক্ষুদ্র নেতার চাঁদা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সরকারের লুটপাট পর্যন্ত এর শেকড় বিস্তৃত, মাঝে ইঞ্জিনিয়ার ও আমলাতান্ত্রিক ঘুষ বাণিজ্য তো উপরে বলা হয়েছেই। আর বাংলাদেশের জনগণ এই অসাধু চক্রের মধ্যে না চাইলেও জড়িত হতে বাধ্য, তবে পার্থক্য হলো, জেনে-বুঝে শেখ তবারক আলী ও উপাচার্য আবু জুনায়েদ এতে জড়িয়েছেন।
আবু জুনায়েদের শশুর ছাড়াও তার স্ত্রী নুরুন্নাহারের বড় ভাইও একজন প্রথম শ্রেণীর কন্ট্রাক্টর। ফলে এজেন্টদের কার্যক্রমটি বিরাট লাভজনক এতে সন্দেহ নেই। আর আমরা তাদেরকে এজেন্ট বলছি এই কারণে যে, ছফা উপন্যাসে তিনজন কন্ট্রাক্টরকে তুলে ধরেছেন, নুরুন্নাহারের বড় ভাই চাকরীজীবি হতে পারতো কিন্তু তিনি তা না হয়ে বাবার পেশাকেই বেছে নিয়েছেন। তবারক আলী ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েও এই পেশাতে লাভের মুখ দেখেন বলেই এটা ছাড়েন না। কারণটা খুবই সহজ, বাংলাদেশে এই এজেন্টদের ছাড়া সরকার কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম করতে পারে না, আবার যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখন সব দোষ এই এজেন্টরূপী কন্ট্রাক্টরদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া সহজ। এ এক দুধারী তরোয়াল। ছফা আমাদেরকে একটি দেশের অবনতির উপসর্গগুলো দিয়েই ক্ষান্ত হননি, এর কারণগুলোও নির্দেশ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন সামনে যাকে দেখছি মানে কন্ট্রাক্টরকে সে শুধু একটি মুখোশ, তার মুখোশের পেছনে আছে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, ঘুষখোর, ফাইল বাণিজ্য ও দুর্নীতির দীর্ঘ সারি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো বাংলাদেশের পতনের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ, এখানে যা যা ঘটছে তার সবই সমগ্র বাংলাদেশে ঘটছে। এখানে যে বস্তুগত সাফল্যের জন্য অসততার পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে তার ফলাফল সাময়িক অর্জন আর বিনিময়ে ভবিষ্যতকে অন্ধ করে দেওয়া, যেমন গাভী বাচ্চা জন্ম দেয় ঠিকই কিন্তু তার বাচ্চা ও দুধ নিজের অধিকারে থাকে না। গাভী চাটার মাধ্যমে (যেমন উপন্যাসের গাভী দুলালীর স্বভাবে তা আমরা দেখি) এর ফলাফল বদলাতে না পারলেও মানুষ কিন্তু পারে, সেই সদিচ্ছাটা প্রয়োজন। তবে তার পথে সবচেয়ে বড় বাধা যা আহমদ ছফা দেখিয়েছেন সেগুলো হলো হীনমন্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অভাব। ছফা হিউমার ও তীর্যক শ্লেষের মাধ্যমে ক্ষমতার ক্রীড়নকে পড়িণত হওয়া হীনমন্য উপাচার্য আবু জুনায়েদের ইচ্ছার একটি চিত্র উপস্থাপন করেছেন,
“এই ক্ষমতা নিয়ে কী করবেন চিন্তা করতে লাগলেন। এই ক্ষমতা নিয়ে কী করবেন? এই অপার ক্ষমতা দিয়ে যদি তার কোনো একটা শখ পূরণ করতে পারতেন, তাহলে সবচাইতে খুশি হয়ে উঠতে পারতেন। সহসা তার মনে এল, তিনি একটা দুধেল গাই পুষবেন। অঢেল জায়গা, প্রচুর ঘাস। অনায়াসে একটা গাই পোঝা যায় । গাইয়ের কথা মনে হওয়ার পর তার বাপের চেহারাটা চোখের সামনে জেগে উঠল। তার বাবা প্রতিদিন ধলেশ্বরির পাড়ে পাড়ে দড়ি ধরে গাই গরুটা চরাতে নিয়ে যেতেন।” (ঐ)
ছফার শ্লেষটা এখানে যে, উপাচার্য আবু জুনায়েদের ইচ্ছাটা হওয়ার কথা ছিল বিপরীত, তার ইচ্ছা হওয়ার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োগ করা, ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পরিসর তৈরি করা। উপন্যাস পাঠকালে আহমদ ছফার এই শ্লেষটা পাঠকদের চেতনাকে বিদ্ধ করে কারণ বর্তমান অবস্থা আবু জুনায়েদের সময় থেকে এখনও পরিবর্তন হয়নি। তাই আহমদ ছফার গাভী বিত্তান্ত শুধু উপন্যাস হিসেবেই প্রাসঙ্গিক না বরং এর বিষয় হিসেবেও এখনও প্রাসঙ্গিক। আর উপন্যাসটিতে ছফার রসবোধ, সে অতুলনীয়।
গাভী বিত্তান্ত
লেখক: আহমদ ছফা
বিষয়: উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৫ সাল।
গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসটি কিনতে চাইলে।
