মানুষের চিন্তার সূত্রপাত হয়েছিল একা একা মানুষদের দ্বারা, যারা কোনো নিরালায় জীবনের অসীমতার কাছে কাবু হতে হতেও হার মানতে না চাইতে চিন্তার দ্বারস্থ হতো, তখন তারা তাদের গোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতো, যেহেতু চিন্তার স্বভাবই এই। আর এই গভীর ভাবনাই তাদের মধ্যে কিছু মানুষকে অন্য অন্য বস্তুর সঙ্গে একাত্ম করত, আর তারা হয়ে উঠত তা-ই, সেই বস্তু, অন্য মানুষ, কোনো পাখি, বা সমগ্র বস্তুজগতের মধ্যে যা যা নাম আসে। আর এরাই অভিধা পেত জাদুকর ও কবি হিসেবে। যাদের উত্তরসূরীরা এখন একটামাত্র নামের অধীন, শুধু কবি নামে মিশে গেছেন, শুধু জাদুকরই না, কবির মধ্যে বাস করে একইসঙ্গে কথাসাহিত্য, চিত্রশিল্প ও চলচ্চিত্রের অন্ত:সার। উপরোক্ত কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হলো এসবগুলোরই সত্যতা প্রতিপন্ন হয় দ্বিতীয় দশকের কবি উপল বড়ুয়ার যেখানে জঙ্গলের শুরু বই রিভিউয়ের প্রচ্ছদ কবিতার বইয়ে। কবিতাগুলোয় নগরজীবনের বৈপরীত্যে তারই পূর্বগামী কিন্তু আধুনিক মানুষের ডিএনএতে থাকা অন্তহীন জঙ্গলের নবতর স্মৃতি বাংলা কবিতায় দেখতে পেলাম আমরা। সেই সঙ্গে একটি নতুন দর্শনও।
উপল বড়ুয়ার কবিতা শব্দকে স্পর্শের অনুভূতি জাগায়, বিশেষ করে এই বইটিতে। হয়তো বোঝাতে পারিনি, এভাবে দেখা যেতে পারে, আমরা জানি শব্দের কাজ বস্তুকে ফুটিয়ে তোলা ও ভাব প্রকাশ করা, উপল বড়ুয়ার কবিতায় এই কাজগুলো তো আছেই তবে একটু এগিয়ে তার ব্যবহৃত শব্দ নিজেই বিষয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেমন এই বইটির উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে, জঙ্গল নিয়ে কবিতায় যে শব্দগুলো আসছে তা শব্দগতভাবেই জঙ্গলের অনুভূতি জাগায়, এখানে কবির ভাষাগত মিতব্যয়ীতা যেমন আছে তেমনি কবির পক্ষ থেকে খানিকটা সচেতনাও লক্ষণীয়, তিনি তার অবচেতনকে হয়তো সেভাবেই নির্দেশ দিয়ে রাখেন বিষয়ানুযায়ী শব্দ ব্যবহারের, ফলে আশ্চর্যভাবে জঙ্গলের কবিতায় জঙ্গল স্বয়ম্ভর হয়ে ওঠে।
বাংলা কবিতায় ব্যক্তির সঙ্গে শুধু নগর ও গ্রামই গুরুত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। উপল বড়ুয়ার যেখানে জঙ্গলের শুরু তাতে এক ব্যতিক্রম। জঙ্গল নিয়ে যে কবিতা লেখা হয়নি তা কোনোভাবেই আমাদের বলার উদ্দেশ্য নয়, হয়েছে তো অবশ্যই, কিন্তু পুরো একটি বইতেই অরণ্যের বিস্তারের বিষয়টিতে দৃষ্টিপাত করতে চাইছি এখানে। শুধু তাই নয় বইটিতে কবি একটি নতুন সীমানা ও অর্থও নির্মাণ করতে চাইছেন, আধুনিক মানুষ যেভাবে জঙ্গলের অর্থ নির্মাণ করে তার সীমা ও এরপর আরেকটি অর্থ, যেটি উপল বড়ুয়ার কবিতা আমাদের অভিহিত করছে, যে সীমাটি সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে ও তাই অর্থটি নতুন। যেমন বইয়ের একটি কবিতার একটি অসাধারণ পঙ্ক্তিতেই বিষয়টি দেখা যেতে পারে,
“পাতাবিহীন এক গাছকে কি আমরা বলব না গাছ, পাতাঝরা গাছ!”
(গাছ ও পাখি, যেখানে জঙ্গলের শুরু)
কিন্তু বইটিতে আধুনিক নগর কী নেই? আছে এবং এই কবিতাগুলো একজন আধুনিক কবিরই লেখা, আধুনিকতার চরম অর্থহীনতার দেখা পেতে একটি কবিতার কাছে যেতে পারি আমরা, ‘কয়েকটি মৃত্যু’ শিরোনামে এই কবিতা কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনার সমষ্টি,
“লোকটি মারা গেল ঘুমের ভেতরে। ভোর রাতে। কেউ ছিল না পাশে।
বালিশ থেকে নেমে পড়েছিল মাথা। কাঁথা ছিল জড়ানো। কী যেন বলতে
চাওয়া জিহ্বা। অর্ধেক খোলা মুখ। লোকটি আচমকা মারা গেল ঘুমের
মধ্যে।”
(কয়েকটি মৃত্যু, ঐ)
কবিতাটি উপল বড়ুয়ার কবিতার যে দর্শন তার অবয়ব সবচেয়ে সুন্দরভাবে ধরে রেখেছে যে কবিতাগুলো, তার একটি নিঃসন্দেহে। তার কবিতার মর্মমূলে ব্যক্তিকে সভ্যতার উপহার দেওয়া নির্দয়তার বিষয়ে সচেতনতা দেখা যায়, এমনকি যেখানে তিনি আনন্দ উদযাপন করছেন সেখানেও এই সচেতনতার অন্তঃস্রোত রয়ে যায়। যেখানে জঙ্গলের শুরু নামেই প্রকাশিত দেখতে পাই যেখানে নগরের শেষ, নগরকে সহনীয় করার একটা ঝোঁক রয়েছে এখানে। আবার দুইটি জগতই কী পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে না? নগর ও অরণ্য? এরও কবিতা বইটি। এবার বই থেকে কয়েকটি কবিতার পঙ্ক্তি দেখা যাক,
“জঙ্গলের দিকে যেতে যেতে তোমার কথা মনে পড়ল
পাতায় মর্মর উঠলে সচকিত হরিণ যেভাবে দৌড়ায়
স্মৃতিরা অবিকল তেমন—আচমকা এসে কানে কানে
বলে, ‘ভুলে গেছ, ভুলে গেছ!”
(জঙ্গলের দিকে, ঐ)
“জানে সে কীভাবে ভুলে যেতে হয় অতীত
স্মৃতি, হেমন্তের হাওয়া আর জঙ্গলের দিন
ছেঁড়া ঘাসের ঘ্রাণ যদি সে ফিরে পায় খুঁজে
হঠাৎ বেজে উঠে যদি পুরোনো ভায়োলিন!”
(পুরনো গান, ঐ)
“এমন ডিসেম্বরের রাতে এই একাকী পাহাড়ে
কেবল তোমার আত্মার সঙ্গে কথা হচ্ছে আজ”
(ক্যাপ্টেন জোন্সের ভাঙা দালানে, ঐ)
এই পঙ্ক্তিগুলো অন্য এক জগতের ছবি স্পষ্ট করে, যা উপল বড়ুয়ার সাক্ষ্য ধরে আছে ও আমাদের কাছে নতুন। এবং কবিতাগুলোর ভাষাও সতেজ, যাতে পুরনোর ভার নেই বরং নবতর নির্মাণ আছে এবং বাংলা কবিতার ঐতিহ্য পরম্পরা বহন করছে, এই পরম্পরা বইটির প্রায় সব কবিতাই বহন করছে।
উপল বড়ুয়ার কবিতা শব্দকে স্পর্শের অনুভূতি জাগায়, বিশেষ করে এই বইটিতে। হয়তো বোঝাতে পারিনি, এভাবে দেখা যেতে পারে, আমরা জানি শব্দের কাজ বস্তুকে ফুটিয়ে তোলা ও ভাব প্রকাশ করা, উপল বড়ুয়ার কবিতায় এই কাজগুলো তো আছেই তবে একটু এগিয়ে তার ব্যবহৃত শব্দ নিজেই বিষয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেমন এই বইটির উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে, জঙ্গল নিয়ে কবিতায় যে শব্দগুলো আসছে তা শব্দগতভাবেই জঙ্গলের অনুভূতি জাগায়, এখানে কবির ভাষাগত মিতব্যয়ীতা যেমন আছে তেমনি কবির পক্ষ থেকে খানিকটা সচেতনাও লক্ষণীয়, তিনি তার অবচেতনকে হয়তো সেভাবেই নির্দেশ দিয়ে রাখেন বিষয়ানুযায়ী শব্দ ব্যবহারের, ফলে আশ্চর্যভাবে জঙ্গলের কবিতায় জঙ্গল স্বয়ম্ভর হয়ে ওঠে। আর কবির অবচেতন কবিতার মূল আশ্রয় এ তো আমরা অস্বীকার করতে পারি না। এই গুণটি আবার তাকে বিষয়ে লীন হতে সাহায্য করে, যেমন বইটিতে ক্যাপ্টেন জোন্সকে নিয়ে অসাধারণ দুইটি কবিতায় এটা আমরা দেখতে পেয়েছি, জোন্স যেন সর্বকালেই জীবন্ত হয়ে উঠলেন, নতুন রূপে, ভাষায়। এই লীন হওয়ার ক্ষমতা উপল বড়ুয়ার কল্পনাকে পাঠকদের বিশ্বাসের গণ্ডিতে নিয়ে আসে, কবিতার একটি বড় কাজ হলো যাপনযোগ্যতা, যার ফলে কবিতা সংক্রমণযোগ্য হয়, পাঠককে আবিষ্ট করে, সরলভাবে বলতে গেলে, কবি যা লিখেছেন তা তিনি বিশ্বাস করেন এই বোধ পাঠকদের মধ্যে জাগানো, এতে আবার কোনো জোরও চলে না, এ এক অসম্ভব কাজ আবার সহজাতও, অকবি ও কবির পার্থক্যও এর মাধ্যমে টানা সম্ভব। উপল বড়ুয়া আমাদের বিশ্বাস করান যে তিনি যা বলছেন তা সত্য, তার সুন্দর ও অসুন্দের বর্ণনাও সত্য, এ এক বড় গুণ তার কবিতার।
মানব সমাজের অবচেতনে একত্রবাসের জঙ্গলের স্মৃতি রয়ে গেছে, পৃথিবীর যত গোপন ও নির্জন প্রান্ত ও প্রান্তর আছে তার সবই এই চিন্তা ও সৃজনশীলতার সাক্ষ্য বহন করছে আজও। উপল বড়ুয়ার যেখানে জঙ্গলের শুরু কবিতার বইয়ে সেই যৌথবাসের একাকীত্বের চিহ্নগুলো ফুটে আছে। আধুনিকতাকে এর ঠিক বিপরীত দিক থেকে পরখ করাটা—যেহেতু প্রথমেই বলেছি একজন আধুনিক মানুষেরই জঙ্গল দর্শন এই কবিতাগুলো—বাংলা কবিতায় নতুন সংযোজন বলা যায় নিঃসন্দেহে। নগর ও গ্রামের বাইরে ভিন্ন একটি ভাষাকে জীবন পেতে দেখা গেল যেখানে জঙ্গলের শুরু’তে। বই থেকে একটি কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি দিয়ে আলোচনা শেষ করি,
“একদিন কোন বই পড়তে পড়তে মারা গেল সে? তার বইয়ের
গন্ধমাখা কবরে বসে কে বই পড়ে এখন?
….
তার কবরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এক নিঃসঙ্গ বইবৃক্ষ। তাতে
থোকা থোকা ঝুলছে টসটসে বই।”
(তরুণ বুকিশের জন্য এলিজি, ঐ)
যেখানে জঙ্গলের শুরু
লেখক: উপল বড়ুয়া
বিষয়: কবিতা
প্রকাশক: বুকিশ পাবলিকেশন্স
প্রকাশকাল: ২০২৫
মূল্য: ২৪০ টাকা।
যেখানে জঙ্গলের শুরু বইটি কিনতে চাইলে
সোহেল হাসান গালিবের পায়ে বিঁধেছে হসন্ত কবিতার বইয়ের রিভিউ পড়তে পারেন
শুভ্র সরকারের সূর্যঘরের টাবাইনে কবিতার বইয়ের রিভিউ পড়তে পারেন
রনক জামানের এই গ্রাম কুড়িয়ে পেয়েছি কবিতার বইয়ের রিভিউ পড়তে পারেন
