হারুকি মুরাকামির সাউথ অব দ্য বর্ডার ওয়েস্ট অব দ্য সান উপন্যাস রিভিউয়ের প্রচ্ছদ

হারুকি মুরাকামির সাউথ অব দ্য বর্ডার ওয়েস্ট অব দ্য সান: প্রেম ও জীবনের নবায়নযোগ্যতা নিয়ে তদন্ত

হারুকি মুরাকামির উপন্যাসে কথার মধ্যে লুকোনো একটি না বলা কথা থাকে, যেন সব বলে দিচ্ছেন কিন্তু এর ভেতরেই রয়ে গেল না বলা শব্দ। সাধারণভাবে বিষয়টি চরম আকার ধারণ করে যখন কোনো লেখক তার চরিত্রদের অনুভূতিকে ভাষা দিতে চান, কিন্তু কী হবে যদি চরিত্র নিজেই না জানে যে তার মনের ভেতর কী চলছে? আর তখনই মুরাকামির নিজস্ব ভাষাবয়নের মুন্সিয়ানা দেখা যায়। এই কথাগুলো বিশেষ করে খাটে হারুকি মুরাকামির সাউথ অব দ্য বর্ডার ওয়েস্ট অব দ্য সান উপন্যাসের বেলায়। তার নরওয়েজিয়ান ওড-এ যেমন তরু ওয়াতানাবে মেলানকোয়িলায় আক্রান্ত এক বিষণ্ণ ভাষায় তার গল্প বলে, কিন্তু তখন তার মনোভাব আমরা বুঝতে পারি, তবে সাউথ অব দ্য বর্ডার ওয়েস্ট অব দ্য সান-এ হাজিমে ও শিমামোতোর সম্পর্ক যা একটি ফটোগ্রাফের ছেড়া অংশগুলোর মতো, তা সেই ফটোগ্রাফকে জোড়া দেওয়ার (ঘটনাবলির) ভাষায় লেখা, আর এই জোড়া দেওয়াকে অসম্ভব সব আকস্মিকতায় পূর্ণ করে তুলেছেন মুরাকামি। ফলে উত্তম পুরুষে হাজিমে যখন তার গল্প বলা শুরু করে যেমন, “আমার জন্ম ১৯৫১ সালে, জানুয়ারি মাসের চার তারিখে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ মাত্র শেষ হয়েছে।…জাপানিজে ‘হাজিমে’ অর্থ হলো শুরু।” (সাউথ অব দ্য বর্ডার ওয়েস্ট অব দ্য সান, অনুবাদ: আলভী আহমেদ), তখন তার জীবনের প্রথমদিককার ঘটনাগুলো যে বিমূর্তভাবে তার অবচেতনে আস্তানা গেড়ে ভবিষ্যতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে, পাঠকরা সেসব একসময় আবিষ্কার করতে পারেন উপন্যাস বিস্তারের পর। আর অন্যদিকে দেখি মুরাকামি উপন্যাসটিতে যৌনতার বর্ণনা দিতেও প্রচল নীতিনৈতিকতার ধার ধারেননি, জীবনের অন্যসব স্বাভাবিকতার মতোই এর বর্ণনা দিয়েছেন। বইটি বাংলায় অসম্ভব সুন্দর অনুবাদ করেছেন আলভী আহমেদ, তার কাছ থেকে হারুকি মুরাকামির সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিকথার অনুবাদও পেয়েছি আমরা।

মুরাকামির উপন্যাসটিতে স্কট ফিটজেরাল্ডের দ্য গ্রেট গেটসবি’র প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়, এই জায়গায় যে, গেটসবিও তার অতীত প্রেমিকাকে পেতে সময়কে বদলে ফেলতে চায়, তার ধারণা সবকিছু সে আগের মতো নির্মাণ করতে পারবে। হাজিমের মধ্যেও শিমামোতোকে নিয়ে নতুন করে সুখী হওয়ার ভাবনাটি দেখা যায়। যেন সে তার আগের জীবনে ফিরতে চায় যেখানে ১২ বছর বয়সী একটি পোলিও আক্রান্ত মেয়ে ও একটি নিঃসঙ্গ ছেলে পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে সুখী হয়েছিল।

জিমি কেনেডি (Jimmy Kennedy) ও মিখায়েল কার (Michael Carr)-এর লেখা ‘সাউথ অব দ্য বর্ডার ডাওন মেক্সিকো সিটি’ গানটির নামের প্রথম অংশ ও সাইবেরিয়ার কৃষকদের একটি চিরায়ত অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে মুরাকামি উপন্যাসের নামকরণ করেছেন। নামটি উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হাজিমে ও শিমামোতোর মানসিক ও বাস্তবিক জীবনের সাথে সুন্দর খাপ খেয়েছে। তবে মুরাকামির উপন্যাসে সাউথ অব দ্য বর্ডার এসেছে ন্যাট কিং কোল (Nat King Cole)-এর সূত্র ধরে।

উপন্যাসের আখ্যানভাগে আমরা দেখি, ৩৭ বছর বয়সী হাজিমে তার স্ত্রী ইউকিকোকে নিয়ে সুন্দর সংসার করছে। তার স্ত্রী ও শশুর তাকে নিয়ে বেজায় সুখী। হাজিমে তার স্ত্রীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সুন্দর জীবনের স্বার্থে ব্যবসায়েও বিনিয়োগ করে, সে দুইটি জ্যাজ বারের মালিক। কিন্তু এসবই বদলে যায় যখন একদিন তার পুরনো প্রেমিকা শিমামোতোর সাথে দীর্ঘকাল পর তার দেখা হয়। তখন হাজিমের সামাজিক সাফল্য যেমন সুখী পরিবার, সুন্দরী স্ত্রী, অর্থনৈতিকা নিরাপত্তার বিপরীতে তার ব্যক্তিগত সুখ, সাফল্যের দিকে দৃষ্টি পড়ে। অকস্মাৎ ঘটে এসব. যেন কোনো উপকূলীয় ঝড় তার মনের তীরে আছড়ে পড়ে সব উত্তর নিয়ে। শিমামোতোর পোলিও ছিল যখন হাজিমের সঙ্গে তার প্রথমবার পরিচয় হয়েছিল, আর হাজিমে ছিল তার বাবামায়ের একমাত্র সন্তান, যে কারণে সে অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশতে পারত না, সে নিজেই বলে, “আমার চেনা দুনিয়ায় এ রকম একটা ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান বেশি আদরে নষ্ট হয়ে যায়। তারা দুর্বল মনের হয়।” অদ্ভুত মনে হলেও তখনকার জাপানে কোনো পরিবারে এক বাচ্চা বেমানান ছিল। তো, শিমামতোর সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও পরবর্তীতে সেটি হাজিমের মনে রোমান্টিক সম্পর্কের দিকে মোড় নেয়। আর একদিন হাজিমের পরিবার অন্যত্র চলে যায়। শিমামতো ও হাজিমের বিচ্ছেদ ঘটে। ফলে সে তার নিঃসঙ্গতার আবর্তে পতিত হয় আবার। কিন্তু এতদিন পর আবার শিমামোতোর দেখা পেয়ে এবং দুজনে একটি অন্তরঙ্গ রাত্রি কাটানোর সময় হাজিমে অকপটভাবে তাকে জানায়, সে সুখী নয়। সে শিমামোতোর সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে চায়, এরকম ভাবনা আসতেই পরদিন সে দেখে শিমামোতো চলে গেছে কোনোধরণের যোগস্থাপনের সূত্র না রেখেই। এ যেন ইতিহাসের মৌলিক পরিহাস, প্রথমে গিয়েছিল সে, এবার গেল শিমামোতো। আবার, শিমামোতোর সঙ্গে হাজিমের আর দেখা হবে কীনা তার ঠিক নেই, পূর্বেও এরকমই হয়েছিল। এরপর হাজিমের দিনরাত শিমামতোকে নিয়ে ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তার ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রভাব পড়ে সেটি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। এবার দ্বিতীয়বারের মতো শিমামোতোর সঙ্গে তার বিচ্ছিন্নতা পরবর্তী জীবনের একটি তদন্ত চালাতে থাকেন মুরাকামি, জীবনের স্বাভাবিকতা আর অস্বাভাবিকতার মধ্যে।

সাধারণভাবে এই হলো উপন্যাসটির কাহিনিবিন্যাস, মুরাকামির উপন্যাসটিতে স্কট ফিটজেরাল্ডের দ্য গ্রেট গেটসবি’র প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়, এই জায়গায় যে, গেটসবিও তার অতীত প্রেমিকাকে পেতে সময়কে বদলে ফেলতে চায়, তার ধারণা সবকিছু সে আগের মতো নির্মাণ করতে পারবে। হাজিমের মধ্যেও শিমামোতোকে নিয়ে নতুন করে সুখী হওয়ার ভাবনাটি দেখা যায়। যেন সে তার আগের জীবনে ফিরতে চায় যেখানে ১২ বছর বয়সী একটি পোলিও আক্রান্ত মেয়ে ও একটি নিঃসঙ্গ ছেলে পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে সুখী হয়েছিল। কিন্তু যে সময় গেছে তাকে পুনরায় একইরকমভাবে তৈরি করা কী সম্ভব? এরই একটা উত্তর খোঁজার বিষয় রয়েছে উপন্যাসটিতে। ছোট উপন্যাসটি তাই রুদ্ধশ্বাস এক ভ্রমণের আহ্বান জানায় পাঠকদের কাছে, যে ভ্রমণ আদতে অনুসন্ধানও, জীবনের সুখ ও অ-সুখের মধ্যে, স্বাভাবিক জীবন আর উন্মাদনায় পূর্ণ ক্ষণিকতার মধ্যে, আবার সমাজের প্রচল নীতি-নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দ্বন্দ্বেরও অনুসন্ধান মুরাকামির সাউথ অব দ্য বর্ডার ওয়েস্ট অব দ্য সান, তাই এই নামে আমরা দেখি ভিন্ন দুইটি বিষয়ের যোগসূত্র, একটি গানের খণ্ডাংশ ও সাইবেরিয়ার কৃষকদের মর্মন্তুদ প্রাত্যহিকতায় আক্রান্ত হয়ে অবশ হয়ে যাওয়া চেতনার কথা। এই সিদ্ধান্তকে সত্যের কাছাকাছি লাগে, যে, এই অবশ চেতনা হাজিমের প্রাত্যহিক জীবন যা তাকে জাপানের সমাজ ও রাষ্ট্র উপহার দিয়েছে, আর সাইউ অব দ্য বর্ডার তাকে উপহার দিয়েছে শিমামোতো। আর মুরাকামি আমাদের সামনে প্রেম ও জীবনের নবায়নযোগ্যতা নিয়ে খুঁটিনাটিসহ একটি তদন্ত রিপোর্ট হাজির করেছেন।

সাউথ অব দ্য বর্ডার ওয়েস্ট অব দ্য সান
লেখক: হারুকি মুরাকামি
বিষয়: উপন্যাস
প্রকাশকাল: ১৯৯২ জাপানি ভাষা, ইংরেজি অনুবাদ, ১৯৯৯ সাল।
বাংলা অনুবাদ: আলভী আহমেদ, ২০২৩ সাল।
প্রকাশক: বাতিঘর
মূল্য: ৫০০টাকা।

সাউথ অব দ্য বর্ডার ওয়েস্ট অব দ্য সান উপন্যাসটি কিনতে চাইলে।

ম্যাথিউ কার্ল স্ট্রেচারের হারুকি মুরাকামির সেরা ১০ বই-এর তালিকা পড়তে পারেন।

মন্তব্য করুন

🛒 Cart 0