হুয়ান রুলফোর (Juan Rulfo) সেই পেদ্রো পারামো (Pedro Paramo) উপন্যাসের কোমালা নতুন নতুন রূপে বিশ্বসাহিত্যে চেপে বসেছে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের (Gabriel Garcia Marquez) ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড (One Hundred Years of Solitude)-এর মাকোন্দো থেকে কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে উপন্যাসের গ্রামটি কোমালাকে পুনঃপুন নবায়ন করে নিচ্ছে। তবে হাজার বছর ধরে উপন্যাসে বর্ণিত পরীর দীঘির পাড়ে একটি নয় অনেকগুলো গ্রাম। উপন্যাসটি ১৯৬৪ সালে সচিত্র সন্ধানী এর ঈদ সংখ্যার জন্য লিখেছিলেন জহির রায়হান। ঈদ সংখ্যার সঙ্গে বাংলা কথাসাহিত্যের যোগসূত্রটিও বহু পুরনো বোঝাই যাচ্ছে।
এই মকবুলই টুনির প্ররোচনায় আম্বিয়াকে বিয়ে করতে চায়, সে মন্তুর কথা বেলালুল ভুলে যায় তখন। এক অদ্ভুত চরিত্র সে, যেমন টুনির হৃদয়ের ক্ষরণ, মন্তুর অশান্ত আশ্রয়হীন জীবন আমাদের টেনে রাখে তেমনি মকবুল যেন এই উপন্যাসের যুধিষ্টির। সে হাজার বছরের ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠে। বাঙালি মুসলমান সমাজ এরকমভাবে কমই এসেছে সাহিত্যে, এর তুল্য মাহবুব-উল আলমের মফিজন উপন্যাস, সেখানেও গ্রামের মুসলমান সমাজের সংস্কৃতি ও এর জটিলতা দেখতে পাই আমরা, ভিন্নভাবে।
জহির রায়হান উপন্যাসটিকে ইতিহাস ঐহিত্যের যে পথপরিক্রমায় বিস্তৃত করেছেন তার ভাষা আন্দোলন নিয়ে আরেক ফাল্গুন উপন্যাসেও একই ইতিহাস চেতনা দেখতে পাই। অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতা থেকে উপন্যাসটির নামকরণ যেমন করেছেন জহির রায়হান, তেমনি কবিতাটির ইতিহাস চেতনাও ধারণ করেছেন। দেখতে পাই সুলতানী আমলের প্রতি তার একটি পক্ষপাতও রয়েছে। আরেক ফাল্গুন-এর সিপাহী বিদ্রোহের লালবাগ কেল্লার বর্ণনা দিয়ে শুরু করার মতোই এই উপন্যাসেরও প্রথম বাক্যে একটি সড়ক গড়ে উঠার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি আওরঙ্গজেবের ভয়ে শাহ সুজার আরাকান পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটির উল্লেখ করেন। এখানে মনে পড়ে শহিদুল জহীরের ঐ ডলু নদী দেখা যায় গল্পেও আরাকানের প্রসঙ্গ এসেছিল। শরৎচন্দ্র থেকে জহির রায়হানসহ বহু সাহিত্যিকই আরাকানের প্রসঙ্গ এনেছেন সাহিত্যে। সে আরাকানের সঙ্গে তখনকার বাংলার বাণিজ্যিক ও জ্ঞানগত আদান-প্রদানের কারণেই। আলাউল তো আরাকানের সভাকবিই ছিলেন। বর্তমানে আরাকানের অধিবাসীদের রোহিঙ্গা বলে বাংলায় নেতিবাচক অর্থে সম্বোধন করা হয়, ইতিহাসের বাঁকবদল এখানেও লক্ষ্য করা যায়।
জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে উপন্যাসের গ্রামটি পরীর দীঘির পাড়ে গড়ে উঠেছে, সেই দীঘির নির্মাণ নিয়ে
লোকগল্পের আদলে তিনি আমাদের জানান,
“তখন গ্রাম ছিল না। সড়ক ছিল না। কিছুই ছিলো না এখানে। শুধু মাঠ, মাঠ আর মাঠ। সীমাহীন প্রান্তর।
বৈশাখী পূর্ণিমা রাতে, পরীরা নেমে আসতো এই পৃথিবীতে। ওরা নাচতো গাইতো খেলতো।”
(হাজার বছর ধরে, জহির রায়হান)
এরপর তার থেকে জানতে পারি, পরীদের দীঘি কাটার ইচ্ছের কথা, জ্যোৎস্না রাতে তারা দীঘি কাটা শুরু করে আর ভোর হবার আগেই দীঘি খনন হয়ে যায় তাদের খন্তা কোদালের সমন্বয়ে। সবাই তাদের অগ্রজদের মুখেই কেবল দীঘিটির ইতিহাসের কথা শুনেছে, কিন্তু লেখক জানান পুঁথিতে নাকি লেখা আছে সব। এর মধ্য দিয়ে বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে এক জাদুবাস্তব যোগাযোগ রচনা করেন জহির রায়হান। তবে উপন্যাসে সেই গ্রামের যে বাড়িটির কথা লেখক আমাদের বলছেন সেই বাড়িটির বয়স নব্বই বছর, তেরশ’ সনের সব ভাসিয়ে দেওয়া বন্যার পর এই বাড়ি তৈরি হয়েছিল। গ্রামটির বয়স যদিও কেউ জানে না। তখন কাশেম শিকদার আর তার স্ত্রী ছমিরন বিবি বন্যায় কলার ভেলায় ভেসে কলসি ভরতি টাকা পয়সা নিয়ে পরীর দীঘির পাড়ের এই গ্রামে এসে ভিড়েছিল। সেখানেই জমি পছন্দ হওয়ায় কয়েক বিঘা জমি কিনে ফেললো কাশেম শিকদার। তারা নিঃসন্তান, একদিন ছমিরন বিবি স্বামীকে আরেকটি বিয়ে দিয়ে পুকুর পাড়ে চারটি ধুতুরা ফুল খেয়ে শুয়ে পড়েন, আর জাগেননি। আর এ বাড়িতেই হাজার বছর বছর ধরে উপন্যাসের সব চরিত্রদের এঁকেছেন জহির রায়হান।
হাজার বছর ধরে উপন্যাসে চিরায়ত গ্রামের আখ্যান তুলে ধরতে গিয়ে জহির রায়হান বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় নির্মাণ বুড়ো মকবুল চরিত্রকে উপহার দিয়েছেন আমাদের। বিশ্বসাহিত্যে যার তুলনা চলে রুলফোর পেদ্রো পারামোর সঙ্গে। স্বভাব চরিত্রে মানবিকতা ও আবেগহীনতা স্বংমিশ্রণ, বাস্তবমুখিনতায় মকবুল অনেকটাই পেদ্রো পারামেরা সমগোত্রীয়।
স্বল্পায়তানের উপন্যাসটির আখ্যানভাগ খুবই ছোট, আটঘর লোকের এক বাড়ির মধ্যেই জহির রায়হান গ্রাম বাংলার হাজার বছরের গল্প বুনেছেন। সেই বাড়িরই বুড়ো মকবুলের তিন স্ত্রী, আমেনা, ফাতেমা ও টুনি। বড় এবং ছোট স্ত্রী টুনি ও আমেনা, তাদের দিয়ে সে রাতভর ধান ভানায়। মেঝ স্ত্রী পেটের পীড়ায় ভোগে, কখনও স্বামীর বাড়ি কখনও বাপের বাড়িতে থাকে। মকবুল বিয়েও করেছে তার স্ত্রীদের দিয়ে এই ধান ভানার জন্যেই। আর বড় দুই স্ত্রী চাটাইও বানায়, যা মকবুলের সংসারে ভালো অর্থের যোগান দেয়। তবে এখানেই তার বিয়ের পালা শেষ হলো কীনা তা সঠিক করে বলা সম্ভব নয়। যেমন উপন্যাসের শুরুতেই আমরা দেখতে পাই সতের-আঠারো বছরের আম্বিয়ার দ্রুত তালে ধান ভানার শব্দে সে শিহরিত হয়। শিকদার বাড়ির মানুষদের নাম ও একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়েছেন জহির রায়হান। বাড়ির দক্ষিণে সবচেয়ে ছোট ঘরটির মালিক মা-বাবাহীন মন্তু। সবাই তাকে জন্তুর সাথেই তুলনা করে, কিন্তু টুনির কাছে সে মাটির মানুষ। এই বাড়িতে মনু, সুরত আলী, গনু মোল্লা, ফকিরে মা, আবুল, রশিদ, মকবুলের বড় স্ত্রীর মেয়ে হীরন আরো অনেকেই আছে। এদের দিয়ে যেন চিরায়ত গ্রামের এক একটি চরিত্র ফুঁটিয়ে তুলছেন তিনি।
উপন্যাসটিতে মকবুলের তের-চৌদ্দ বছরের বালিকা স্ত্রী টুনি, তার গায়ের রঙ কৃষ্ণবর্ণ, আর টুনির খেলার সাথী মন্তু, তারা এই পরীর দিঘীর পাড়েই খেলেছে একসাথে। টুনি ও মন্তুর সম্পর্কের অনবদ্য মিথষ্ক্রিয়া জহির রায়হান তুলে ধরেন আমাদের সামনে। ক্রমেই আমরা দেখতে পাই তাদের সম্পর্কটি একসময় প্রেম ও ঈর্ষায় রূপ নেয়। মন্তু আর টুনি মকবুলের শাসনের তোয়াক্কা না করে রাতের আধারে মাছ ধরতে যায়। তাদের যোগাযোগের ধরণও ভিন্ন, একটা সবার সামনে, অন্যটি সবার আড়ালে। একসময় মন্তু করিমের বোন আম্বিয়াকে বিয়ে করতে চাইতেই তাদের সম্পর্ক বদলে যায়, টুনি ঈর্ষান্বিত হয়, তাদের সম্পর্কের চেনা ছক বদলে যায়। সে তখন মন্তুর বদলে মকবুলকে আম্বিয়ার সঙ্গে বিয়ে দিতে তৎপর হয়। এ নিয়ে বিশাল এক ঝামেলা বাঁধে। একসময় দেখা যায়, মন্তুর বিয়ের প্রস্তাবের বদলে মকবুল নিজের বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আসে। মন্তুও হাল ছাড়ার পাত্র নয়, টুনির সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে আম্বিয়ার সঙ্গে সে সম্পর্ক বজায় রাখে। কিন্তু টুনি কেন এরকম করে? কারণটা আর কিছুই নয়, সে মন্তুকে কোনোভাবেই হারাতে চায় না। কারণ এই পৃথিবীতে মন্তুই তার একমাত্র প্রিয়জন, যাকে হারিয়ে ফেলার কথা সে ভাবতেই পারে না। এভাবে আখ্যান এগুতে এগুতেই একদিন মকবুল জ্বরে পড়ে, আর মত্যু হয় তার। মানব সম্পর্কের এক চিলতে জটিলতা উপহার দেন পাঠকদের জহির রায়হান, এই প্রেম-যৌনতা ও ঈর্ষার মিলিত ঘটনাটির মধ্য দিয়ে।
যখন মকবুল মারা যায় এর তিনদিন পর টুনি আর মন্তুকে দেখা যায়। টুনি অনেক শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে কালি পড়েছে, মকবুলের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই বাড়ির সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। মন্তু যখন নৌকা নিয়ে বেরিয়ে যাবার উপক্রম করছে তখন সে মন্তুকে দাঁড় করায়, বলে,
“আমার একটা কথা রাইখবা?
মন্তু বললো, কও।
মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলো টুনি। তারপর আস্তে করে বললো, আমারে একদিন সময় কইরা আমাগো বাড়ি পৌঁছায়া দিয়ে আইবা?”
(ঐ)
টুনির এই কথাটার মধ্য দিয়ে এক ট্রাজিক প্রেমের শেষ দৃশ্যের অবতারণা করেন জহির রায়হান। তখন এক অবিস্মরণীয় চরিত্র বুড়ো মকবুলের অধ্যায়ের সমাপ্তি আর তারই ছায়ায় টুনি মন্তুর প্রেম-বিরহের সমাপ্তির হাহাকার চেপে বসে আমাদের মনে।
উপন্যাসের আবুল চরিত্রটির নৃশংসতার বিপরীতে মকবুলের মানবপ্রেমের দৃশ্য মনে গেঁথে থাকবে আমাদের। আবুল যখন তার স্ত্রী হালিমাকে প্রহার করে তখন মকবুলই নিজের অসম্মান মেনে তাকে বাঁধা দিয়েছিল। আবুলের আগের তরফের দুই স্ত্রীও এই প্রহারের কারণে মারা গিয়েছিল। আর তার চরিত্রের বৈপরীত্য এই যে, এই মকবুলই টুনির প্ররোচনায় আম্বিয়াকে বিয়ে করতে চায়, সে মন্তুর কথা বেলালুল ভুলে যায় তখন। এক অদ্ভুত চরিত্র সে, যেমন টুনির হৃদয়ের ক্ষরণ, মন্তুর অশান্ত আশ্রয়হীন জীবন আমাদের টেনে রাখে তেমনি মকবুল যেন এই উপন্যাসের যুধিষ্টির। সে হাজার বছরের ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠে। বাঙালি মুসলমান সমাজ এরকমভাবে কমই এসেছে সাহিত্যে, এর তুল্য মাহবুব-উল আলমের মফিজন উপন্যাস, সেখানেও গ্রামের মুসলমান সমাজের সংস্কৃতি ও এর জটিলতা দেখতে পাই আমরা, ভিন্নভাবে।
পূর্ব বাংলার গ্রাম সমাজের জটিলতাকে এরকম শিল্পসফলভাবে তুলে আনার জন্য জহির রায়হান বাংলাসাহিত্যে চিরস্থায়ী আসন যে পেয়েছেন তা অস্বীকার করার পথ নেই, আর আসনটি ভবিষ্যতেও টলবে বলে মনে হয় না। এর শিল্পসফলতার আরেকটি কারণ এর স্বচ্ছ, নির্মেদ ভাষা, যার তুলনা উপন্যাসটি নিজেই। উপন্যাসের শেষে প্রবাদ বাক্যের মতো জহির রায়হান আমাদের শোনান,
“সুরত আলীর ছেলেটা তখনও একটানা পুঁথি পড়ে গেলো
কি কহিব ভেলোয়ার রূপের বাখান।
দেখিতে সুন্দর অতিরে রসিকের পরাণ।
আকাশের চন্দ্র যেনরে ভেলুয়া সুন্দরী
দূরে থাকি লাগে যেন ইন্দ্রকূপের পরী।
সুর করে ঢুলে একমনে পুঁথি পড়ছে সে। রাত বাড়ছে। হাজার বছরের পুরনো সেই রাত।
এই সুরত আলীর ছেলেটি ও নতুন প্রজন্মের অন্যদের আরেকটি গল্প-পুঁথির শুরু হবে পরীর দিঘীর পাড়ে, সেই পুরনো হাজার বছরের গ্রামের ঐতিহ্যেই, এই পুঁথিপড়া ও বাক্যকটিতে তারই ইঙ্গিত রেখেছেন লেখক।
হাজার বছর ধরে
লেখক: জহির রায়হান
বিষয়: উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৪ সাল।
হাজার বছর ধরে উপন্যাসটি কিনতে চাইলে।
জহির রায়হানের শেষ বিকেলের মেয়ে উপন্যাসের রিভিউ।
