জহির রায়হানের শেষ বিকেলের মেয়ে উপন্যাস রিভিউয়ের প্রচ্ছদ

জহির রায়হানের শেষ বিকেলের মেয়ে: জীবনের একটি অত্যাবশ্যকীয় উত্তরের সন্ধান

জহির রায়হানের শেষ বিকেলের মেয়ে তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, এবং আদ্যোপান্ত রোমান্টিক উপন্যাসটির চিঠির যুগের সময়কে দারুণ মুন্সিয়ানায় তুলে ধরার পাশাপাশি পরবর্তী বাংলা রোমান্টিক কথাসাহিত্যে অবদান অকল্পনীয়। আর উপন্যাসের নামের মধ্যে যেরকম ক্ষয়ের বোধ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন জহির রায়হান, তার চেয়ে সম্পর্ণ ভিন্ন ও আশাপ্রদ একটি সমাপ্তি তিনি পাঠকদের উপহার দিয়েছেন। বরং বলা যায় একটি উত্তরের সন্ধান করেছেন তিনি উপন্যাস জুড়ে। উত্তরটি হলো, আমরা যাদের ভালোবাসি তারা আমাদের জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নাকি তারা গুরুত্বপূর্ণ যারা আমাদেরকে ভালোবাসে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম দিনের সূর্য যেভাবে “কে তুমি?” বলে প্রশ্ন করেছিল, সেরকম জহির রায়হানও তার রোমান্টিক এই উপন্যাসে প্রশ্ন করেছেন, আমাদের সত্তার উত্তরণের জন্য, পরিপূর্ণতার জন্য কে বেশি প্রয়োজনীয়?। আর সেই প্রশ্ন-উত্তরের যাত্রায় আমরাও জড়িয়ে পড়ি আলগোছে, কেননা আমাদেরও উত্তরটি জানবার বড় প্রয়োজন, এই বোধ প্রেমের উপন্যাসটিতে শিল্পের মোড়কে জহির রায়হান আমাদের মধ্যে চারিয়ে দেন।

তেমনি আবেগের বহিঃপ্রকাশে বৃষ্টিকেও বারবার ব্যবহার করেছেন। আবার বহু রঙের যথার্থতার পক্ষাবলম্বন করতে একজনের অপরাধে অন্যজন যেন শাস্তি না পায় তারও একটা যুক্তিবিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন জহির রায়হান। জাহানারাকে না পেয়ে কাসেদ যখন ক্ষণিকের জন্য পুরো নারী জাতিকেই এক পাল্লায় মাপতে শুরু করে তখন সে-ই বুঝতে পারে আসলে সবাই একরম নয়, শিউলির সঙ্গে সালমার একটা প্রভেদ রয়েছে, তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অভিজ্ঞতা, মনন ও স্বভাব দিয়ে আলাদা। পাঠকরা তখন শুরুর বাক্যকটির গুঢ়ার্থ বুঝতে পারেন, তারা আসলে একটি নয়, অনেকগুলো রঙ।

কাঠামো ও বিষয়গত দিক দিয়ে জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে উপন্যাসের একদম বিপরীত শেষ বিকেলের মেয়ে, হাজার বছর ধরে উপন্যাসে তিনি যেভাবে একটি অঞ্চল ও তার অধিবাসীদের জীবনকে ভাষা দিতে চেয়েছেন যা চিরাচরিত বাংলাদেশেরই রূপক হয়ে উঠেছে। আমাদের বর্তমান আলোচ্য উপন্যাসটি তার একদম বিপরীত, এখানে রোমান্টিক এক নাগরিক যুবকের দেখা পাই আমরা, যে জীবনের ক্ষয় থেকে বাঁচতে প্রেমের মধ্যে নিজেকে সঁপে দিতে চায়। সমাজের প্রথাগত বিবাহিত এক সুখী জীবনের প্রত্যাশী সে। এই উপন্যাসটি তার বায়ান্ন নিয়ে লেখা উপন্যাস আরেক ফাল্গুন থেকেও ভিন্ন, যদিও দুইয়েই প্রেম ও ক্ষয়ের দেখা মেলে কিন্তু প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। জহির রায়হান যে প্রতিটি কাজেই নিজেকে নবায়ন করেছেন, নতুনত্ব এনেছেন, জীবনের বহুঅর্থবোধকতার সন্ধান করেছেন, এই তিনটি উপন্যাস পাশাপাশি রাখলেই তা বোঝা যায়।

উপন্যাসের আখ্যানভাগটি এরকম, কাসেদ নামে পিতৃহীন এক যুবক জাহানারা নামে এক মেয়েকে ভালোবাসে। তাকে বিয়ে করে সুখী এক জীবনের স্বপ্ন দেখে সে। কাসেদ ছোট একটা চাকরি করে, এবং তার অন্য যোগ্যতাটি হলো, সে কবি। ফলে সে খুবই কল্পনাপ্রবণ, আমরা দেখতে পাই প্রায়ই সে তার মনে জাহানারাকে নিয়ে বিভিন্ন কল্পনার জাল বুনে। মনে হয় সে জীবনের বেশিরভাগই কল্পনায় কাটাচ্ছে। তার সঙ্গে মা ও নাহার নামে তার এক দূর সম্পর্কের বোন থাকে। নাহারের মা নেই, বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন, ভিন্ন ভিন্ন দেশে তার পোস্টিং, মেয়েকে কাসেদের মা-বাবার কাছে রেখে গিয়েছিলেন, দূর দূর দেশ থেকে তিনি চিঠি লিখতেন মেয়েকে, সর্বশেষ চিঠি লিখেছিলেন আরাকান থেকে। একদিন সেই চিঠি আসা বন্ধ হলো, কোন সে যুদ্ধ তা লেখক না জানালেও বোঝা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যুদ্ধ শেষে সবাই যখন ফিরে আসছিল নাহারের বাবা তাদের মধ্যে ছিলেন না, তাই সবাই ধরে নিলো জাপানিরা তাকে ধরে নিয়ে গেছে, তিনি মারা গেছেন। তখন কাসেদের বাবা-মা নাহারকে কন্যারূপে গ্রহণ করে নিলেন।

কাসেদের জীবনে শিউলি, সালমাসহ অনেকেই আসে, কিন্তু কাসেদ জাহানারাকেই সবচেয়ে গভীরভাবে ভালোবাসে। তবে শিউলি সালমা সবার প্রতিই তার দুর্বলতা আছে বৈকি। কিন্তু মানুষ যা চায় তা সবসময় পায় না, অনেক সময় উল্টোটাই হয়, আর আমরা দেখতে পাই কাসেদও জাহানারাকে পায় না। তার জীবনের যে পূর্ণতা সে চেয়েছিল, তা তো পায়ই না বরং ক্ষয় বাড়তে থাকে। এমন সময় কাসেদের মা মারা যান, জানা যায়, যে নাহার কাসেদকে ঘিরে ছিল প্রতিমুহূর্তে, কাসেদের খাওয়া না হলে নিজে খেত না কখনও, তারও বিয়ের কথা চলছে অন্য এক জায়গায়। একসময় দেখা যায় কাসেদের মায়ের মৃত্যুর পর তাদের খালু নাহারকে নিয়ে যান, পরদিন তার বিয়ে। কাসেদ এই পৃথিবীতে তখন কার্যতই সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।

তখনই উপন্যাসটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জহির রায়হান একদম ভিন্ন এক উপসংহার উপহার দেন আমাদের। না হলে উপন্যাসটি সম্পূর্ণও হতো না। আমরা দেখতে পাই, কাসেদ জীবনের সুখের যে আলকেমির জন্য দূর-দূরান্তে ঘুরেছে সারাজীবন সেই আলকেমি আসলে তার নিজের কাছেই ছিল।

জহির রায়হান শেষ বিকেলের মেয়ে উপন্যাসটিতে মানব মনের জটিলতার পরতগুলো একে একে খুলে দেখিয়েছেন। এর জন্য মনের একটি বাহ্যিক প্রতিরূপ গড়তে প্রকৃতির বদলে যাওয়ার বর্ণনা দেন তিনি আমাদের, যেমন, উপন্যাসের শুরুর বাক্যগুলোতেই বলেন,

আকাশের রঙ বুঝি বারবার বদলায়। কখনও নীল। কখনও হলুদ। কখনো আবার টকটকে লাল। মাঝে মাঝে যখন সাদা কালো মেঘগুলো ইতি-উতি ছড়িয়ে থাকে আর সোনালি সূরের আভা ঈষৎ বাঁকা হয়ে সহস্র মেঘের গায়ে লুটিয়ে পড়ে তখন মনে হয়, এর রঙ একটি নয়, অনেক।

(শেষ বিকেলের মেয়ে, জহির রায়হান)

শুরুর এই বর্ণনাটিই উপন্যাসের মেজাজ গড়ে দেয়, পরবর্তীতে আমরা বুঝতে পারি এটি মানুষের মনের বর্ণনা। উপন্যাসের চরিত্রগুলো এই অনেকগুলো রঙের মধ্যেই তাদের ঈপ্সিত প্রাপ্তির তালাশ করে।

তেমনি আবেগের বহিঃপ্রকাশে বৃষ্টিকেও বারবার ব্যবহার করেছেন। আবার বহু রঙের যথার্থতার পক্ষাবলম্বন করতে একজনের অপরাধে অন্যজন যেন শাস্তি না পায় তারও একটা যুক্তিবিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন জহির রায়হান। জাহানারাকে না পেয়ে কাসেদ যখন ক্ষণিকের জন্য পুরো নারী জাতিকেই এক পাল্লায় মাপতে শুরু করে তখন সে-ই বুঝতে পারে আসলে সবাই একরম নয়, শিউলির সঙ্গে সালমার একটা প্রভেদ রয়েছে, তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অভিজ্ঞতা, মনন ও স্বভাব দিয়ে আলাদা। পাঠকরা তখন শুরুর বাক্যকটির গুঢ়ার্থ বুঝতে পারেন, তারা আসলে একটি নয়, অনেকগুলো রঙ। তবে আশ্চর্যের বিষয় কাসেদ কখনওই নাহারকে বিবেচনা করেনি, তার মায়েরও ইচ্ছা ছিল জাহানারাকে ছেলের স্ত্রী করে আনেন, কাসেদের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি। উপন্যাসের শেষ অবধি কাসেদের মতো আমরাও জানতে পারি না, শেষ বিকেলের মেয়ে আদতে কে, আর যখনই তার দেখা মেলে তখনই উপন্যাসটির সেই সোনালি সুরের আভা বা কেন্দ্রবিন্দুকে পেয়ে চমকে উঠি। তখনই উপন্যাসের ভরকেন্দ্র সম্পূর্ণ হয়। কাসেদের অবচেতন তাকে ভালোবাসত, কিন্তু তার সচেতন মন কখনও সেই খবর তাকে জানতে দেয়নি। এই গোপন খবরটি পেতে তাকে পেরিয়ে আসতে হয়েছে এতটা মরুপথ।

জহির রায়হানের শেষ বিকেলের মেয়ে উপন্যাসটির ভাষাও জটিলতাহীন, স্বচ্ছ, যা বাংলাদেশের পরবর্তী জনপ্রিয় উপন্যাসের ভিত্তি গড়তে ভীষণ প্রভাববিস্তারী হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্যে নিজস্ব ভাষা নির্মাণে যে পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন এবং যা তাকে বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম সাহিত্যিক বানিয়েছে, তার একটা ইঙ্গিত এই উপন্যাসেও পাওয়া যায়। আর উপন্যাসটির প্রকাশের এত বছর পরও—যখন আমাদের চারপাশ ও সম্পর্কের ধরণ আমূল বদলে গেছে বলে আমরা মনে করি—যখন আমাদের কাসেদের হৃদয়বাহিত অনুভূতি, তার ভঙ্গুরতা, কাউকে আকড়ে ধরে পতন থেকে উদ্ধারের বাসনা ও নাহারের উপস্থিতি, স্বার্থহীনতা স্পর্শ করে, তখন লেখক হিসেবে জহির রায়হান সার্থক হয়ে উঠেন, তিনি বাংলা সাহিত্যে তার যোগ্য আসন দাবী করেন।

শেষ বিকেলের মেয়ে উপন্যাসের একটি কথোপকথন দিয়ে আমাদের আলোচনা শেষ করি।

“সালমা: কেরানীর অত দেমাক কেন?

কাসেদ: কবি বলে।”

(ঐ)

শেষ বিকেলের মেয়ে
লেখক: জহির রায়হান
বিষয়: উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ: ১৯৬০ সাল।

শেষ বিকেলের মেয়ে উপন্যাসটি কিনতে চাইলে।

মন্তব্য করুন

🛒 Cart 0