ইমতিয়ার শামীমের আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক নামের মধ্যেই বাংলাদেশের একটি সময়ের রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সময় প্রকাশিত হয়ে আছে। চিঠিযুগ মানে চিঠির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অপেক্ষার গল্পও, এর মধ্যে একটি রোমান্টিক আবহ আছে, তবে ইমতিয়ার শামীম রোমান্টিকতা অতিক্রান্ত সময়ে বসে সেই সময়কে ধরতে চেয়েছেন যখন বাংলাদেশে সামরিক শাসন চলছে ও সেখানে অপেক্ষা মানে মৃত্যুর বা ক্ষতির একটি পূর্বরাগ। যে অপেক্ষা করছে সে আসলে ধরে নিচ্ছে যার জন্য এই অপেক্ষা সেই ব্যক্তিটি হয়তো বেঁচে নেই, হয়তো ফিরবে না, হয়তো ফিরলেও আর কখনও সে স্বাভাবিক হবে না। যেরকম পূর্বাপর ভুলে যাওয়া এক প্রতীক্ষার চিত্র এঁকেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ তার অপেক্ষা উপন্যাসে, ইমতিয়ার শামীমের উপন্যাসে ‘অপেক্ষা’ শব্দটির অর্থ তার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। একটি শব্দ যে কত বিচিত্র অর্থ ধারণ করতে পারে সময় ও যুগের নির্ভরতায়, এই দুইটি উপন্যাসে তার প্রমাণ মেলে।
উপন্যাসটিতে বারে বারেই চিঠির কথা ঘুরেফিরে আসে, ফলে সেটি একটি প্রতীকে রূপ নিয়েছে। যেমন আমিনুর রহমান তার পরিবারের সবাইকে চিঠি লিখত, নামহীন কথক, ছোটবোন, মা ও অন্য ভাইয়ের কাছে, কেউ বাদ যেত না। ফলে চিঠি তাদের পারিবারিক বন্ধনের এক প্রতীক। এই চিঠি আবার একই সাথে অস্তিত্বেরও প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে, অস্তিত্ব থাকলেই মানুষ চিঠি লেখে। কিন্তু পুরনো চিঠিগুলোর (আমিনুর রহমান ও যারা যারা এইধরণে গুম ও অত্যাচারের শিকার হয়েছিল ও যুগের কাঠামো অনুযায়ী চিঠিই ছিল যাদের সিরিয়াস যোগাযোগের মাধ্যম) মধ্যে তো ধরা আছে অস্তিত্ব থাকার সময়কার স্মৃতিদর্শন ও ইতিহাস।
ইমতিয়ার শামীমের আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক উপন্যাসে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এরশাদের সামরিক শাসনামলের চিত্র ও সমাজবাস্তবতা এসেছে। সেই বর্ণনায় উঠে এসেছে স্বাধীনতার পর একটি দেশের বিবর্তনও। উপন্যাসের শুরুতেই একজন নামহীন কথকের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি, তার বড় ভাই আমিনুর রহমানকে তাদের বাসা থেকে জলপাই রঙা আর্মি তুলে নিয়ে গেছে। এরপর কথক রেল স্টেশনে বসে তার বড় ভাইয়ের উপর কী কী নির্যাতন চলতে পারে তার বিষয়ে টুকরো টুকরো অনুমানগুলো, বলা ভালো ভয়াবহ দৃশ্যকল্পগুলো—যার সবই আর্মি-পুলিশ তাদের রিমান্ড কার্যক্রমের সময় চালায়—ভাবতে থাকে। এরপর তার হওয়া না হওয়া রোমান্টিক সম্পর্কগুলো, কথকের নিজের বর্ণনায় ”চিঠিযুগ” ও তার প্রাত্যহিক বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেই সময়ের বাংলাদেশটি দৃশ্যমান হতে শুরু করে। তখন ক্রসফায়ারসহ মানবাধিকারহীনতার যতগুলো বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এই দেশ ও এর মানুষদের যেতে হয়েছে—তার সবই বর্ণিত হতে থাকে। এভাবে উপন্যাসটির কথকের ব্যক্তি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ইমতিয়ার শামীম সামষ্টিক বয়ান তৈরি করেছেন। এই জায়গাতে আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক এর সামরিক শাসনের সময় ও দমনের সঙ্গে হান কাংয়ের হিউম্যান অ্যাক্টস এর দারুণ মিল রয়েছে। উপন্যাসটিতে ১৯৮০ পরবর্তী সময়ে চু দু-হওয়ান এর সামরিক শাসন ও গণতন্ত্রহীনতায় মানুষের মধ্যে যে বিদ্রোহ ও পরে সেটা ১৯৮৭ সালে অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল তারই আখ্যান তুলে ধরেছেন হান কাং। বাংলাদেশের ১৯৯০ এর অভ্যুত্থানের ঠিক কয়েক বছর আগের ঘটনা এটা। ইমতিয়ার শামীম বাংলাদেশের এই সময়ের অবদমন ও ক্ষমতাকর্তৃক দমনকেই তুলে ধরেছেন।
আর এসবের মধ্যে চোখ না এড়ানো বিষয়টি হচ্ছে, এই উপন্যাসে যে হাহাকারগুলো ভাষার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে, তা যেন হেমন্তের হাওয়ার মতো। নইলে অবশ্য আখ্যানের মধ্যে যে ক্ষয়, তার ভার বহন করা পাঠকদের জন্য কষ্টকর হতো। যে ক্ষয় ও ভাঙনের চিত্র পরবর্তীকালে প্রকাশিত তার গল্পগ্রন্থ শ্যামলতার মৃত্যুশিথান-এও পাওয়া যায়।
“তারপর আবারও আমাদের চিঠিযুগ ফিরে আসে। চিঠিযুগ ফিরে আসে অনবচ্ছিন্ন কুয়াশার ফোঁটা হয়ে, চিঠিযুগ ফিরে আসে শিশিরভেজা পথের মধ্য দিয়ে। যেন হঠাৎই দেখা হয়েছে আমাদের ঘন কুয়াশায়, তেমন কোনো পরিচয়ও নেই, কিন্তু আমরা একটু থামি, একজন আরেকজনের দিকে হাত বাড়িয়ে দেই, চিঠি নেই, চিঠি দেই।” (আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক)
এই বাক্যগুলো অসম্ভব এক ঘোর তৈরি করে, কবিতা ও হাহাকারের বোধও যেন লুকিয়ে থাকে, হেমন্তের মাঠে বয়ে চলা হাওয়ার তালে তালে।
উপন্যাসটিতে বারে বারেই চিঠির কথা ঘুরেফিরে আসে, ফলে সেটি একটি প্রতীকে রূপ নিয়েছে। যেমন আমিনুর রহমান তার পরিবারের সবাইকে চিঠি লিখত, নামহীন কথক, ছোটবোন, মা ও অন্য ভাইয়ের কাছে, কেউ বাদ যেত না। ফলে চিঠি তাদের পারিবারিক বন্ধনের এক প্রতীক। এই চিঠি আবার একই সাথে অস্তিত্বেরও প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে, অস্তিত্ব থাকলেই মানুষ চিঠি লেখে। কিন্তু পুরনো চিঠিগুলোর (আমিনুর রহমান ও যারা যারা এইধরণে গুম ও অত্যাচারের শিকার হয়েছিল ও যুগের কাঠামো অনুযায়ী চিঠিই ছিল যাদের সিরিয়াস যোগাযোগের মাধ্যম) মধ্যে তো ধরা আছে অস্তিত্ব থাকার সময়কার স্মৃতিদর্শন ও ইতিহাস। এই ইতিহাস থেকে যাওয়ার বা সংরক্ষিত হওয়ার ভাবনাটি যে লেখক আমাদেরও ভাবাতে চাচ্ছেন তা দেখা যায় যখন জানতে পারি, আমিনুর রহমানের ভাইবোনেরা কার কাছে বড় ভাই (আমিনুর রহমান) বেশি চিঠি লিখেছে তা নিয়ে প্রতিযোগীতাও করে।
তবে মূলগতভাবেই চিঠি যে সংরক্ষণের জিনিস সেটা তো সবাই জানে। কিন্তু লেখক এখানে এই ইঙ্গিতটা দিতে চাচ্ছেন, যে, জলপাই রঙের বাহিনী অসতর্কতায় আমিনুর রহমানের লেখা চিঠিগুলো নিয়ে যেতে পারেনি, তার চিঠিগুলো তাই, তার সুখ-বেদনার জীবনটি, চিঠির কালো অক্ষরগুলোতে তার পরিবারের কাছে থেকে যাবে। আর তাদের এই থেকে যাওয়া সামরিক শাসনের সময়টিকে ভবিষ্যতে অতীতের স্মৃতিবিস্তৃতি থেকে আমূল তুলে আনবে। ফলে ইমতিয়ার শামীমের আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক শিরোমের উপন্যাসটি যা করছে এই চিঠিগুলোও তাই করবে। বাংলাদেশে তখন যারা মারা গিয়েছিল, যারা জীবন্মৃত হয়েছিল তাদের জীবন তাদের ও তাদেরকে লেখা চিঠিগুলোতেও রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে বিচারহীনতা, বেঁচে থাকা পরিবারের হাহাকার, ক্ষতি, হেমন্তের হাওয়া লাগা চিঠিযুগ, আর যা মৃত্যুর, ক্ষয়ের মধ্যেও একটা রোমান্টিকতার আবহ তৈরি করে ইমতিয়ার শামীমের ভাষার কারণেই। তবে ক্ষয় ও মৃত্যুর মধ্যে এই রোমান্টিকতা নিয়ে আমাদের আপত্তি ধোপে টেকে না, কেননা চিঠি রোমান্টিক হলেও তার মধ্যে সময় ধরা থাকে, ফ্রয়েডের মতে, মৃত্যু জীবনের বিরুদ্ধে জয়ী হয় সবসময় আর যতক্ষণ মৃত্যুর জয় ঠেকিয়ে রাখা যায় ততক্ষণই জীবনের জয়। ইমতিয়ার শামীমের আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক তা-ই উপস্থাপন করে, সেই চিঠির মধ্যে থাকা জীবনকে, বাংলাদেশের সামরিক অতীতকে।
আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক
লেখক: ইমতিয়ার শামীম
বিষয়: উপন্যাস
প্রকাশকাল: ২০২০
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
মূল্য: ২৫০ টাকা।
আমাদের চিঠিযুগ কুউউ ঝিকঝিক উপন্যাসটি কিনতে চাইলে।
ইমতিয়ার শামীমের স্তোত্রপাঠের দিন উপন্যাসিকার রিভিউ পড়তে পারেন।
ইমতিয়ার শামীমের খোয়াব রন্ধন সংবাদ উপন্যাসের রিভিউ পড়তে পারেন।
