জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন উপন্যাস রিভিউয়ের প্রচ্ছদ

জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন: ভাষা আন্দোলন ও দ্রোহের উপন্যাস

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন নিয়ে গুটি কয়েক উল্লেখযোগ্য কাজই হয়েছে বাংলা সাহিত্যে। এক্ষেত্রে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় নিয়ে ছোটগল্প খোঁয়ারি, মিলির হাতে স্টেনগান অবিস্মরণীয় কাজ নি:সন্দেহে। হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হকসহ অনেক সাহিত্যিকেরই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। তবে তা হাতে ‍গুণা যায়। কিন্তু সেই তুলনায় ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের বিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগ্রন্থ যেমন, বদরুদ্দীন উমরের পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি পেলেও উপন্যাস, গল্প খুব কমই পেয়েছি আমরা। সফল লেখা তো আরো কম। এর মধ্যে জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন উপন্যাসটি একাধারে শিল্পোত্তীর্ণ ও ভাষা আন্দোলন নিয়ে স্বল্প লেখার অভাব পূরণ করছে। তবে হাজার বছর ধরে ‍উপন্যাস দিয়ে জহির রায়হান যেভাবে পরিচিত আমাদের আলোচ্য উপন্যাস দিয়ে ততটা নন। উপন্যাসটির সময় ভাষা আন্দোলনের পরের পর্বের, জহির রায়হান তার চরিত্রদের মাধ্যমে অস্থির রাজনৈতিক এক সময়কে এঁকেছেন, যেখানে সবাই মোমাবাতির আগুনের দিকে ঝাপিয়ে পড়ছে পতঙ্গের মতো কিন্তু তারা সঠিকভাবে জানে না কী জন্য কী করছে। সামনে আরো আরো অস্থির সময় পড়ে আছে যখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ও এর আগের আন্দোলনগুলোয় এই মোমাবাতির আলো সূর্যতে রূপান্তরিত হবে এই স্বাধীনতাভুক পতঙ্গদের পুড়ো দেহের জ্বালানিতে। তার কথকতাই যেন জহির রায়হায় এই উপন্যাসটিতে তুলে ধরেছেন ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর কলকাতা থেকে স্বপরিবারে বাংলাদেশে আসা মুহিন, ও দেশ পরিবর্তন করতে গিয়ে দুই হাত হারানো নববিবাহিত রওশন ও তার স্ত্রী সালমা—এই চরিত্রদের মাধ্যমে।

উপন্যাসটি ১৯৫২-এর পরের সময় নিয়ে, সময়টি এমন ছিল যে তখন একসঙ্গে ১০জন রাস্তায় বেরোনো যেত না, আইনের আওতায় পড়তে হতো। অস্বাধীনতার রূপটি কেমন তা এ বিষয়টি দিয়েই বোঝা যায়। অন্যদিকে তারুণ্য, প্রেম আর মিটিং মিছিলিই এই রুদ্ধতাকে হঠিয়ে দিতে পারে। তাই আমরা দেখি মুহিম আর ডলির প্রেম উত্তাল সময়ের আবর্তে বাক নিতে থাকে, তাদের হৃদয়ের আর্তি কখনও একসাথে জমাট বাঁধতে পারে না, তবে হারিয়েও যায় না, এসবই পূর্ব পাকিস্তানের অস্থিরতারই ফল।

আরেক ফাল্গুন উপন্যাসে জহির রায়হান ইতিহাসের পরিক্রমা নির্মাণের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। উপন্যাসটি ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের লালবাগ কেল্লার বর্ণনা দিয়ে শুরু হয়, যাতে পাঠকদের ইতিহাসের ধারাবাহিকতার বোধ জন্ম নেয়। পুরান ঢাকা বিশেষত বাংলা যে সিপাহি বিদ্রোহের অংশীদার ছিল, আর তারা যে অস্বাধীনতা কোনোকালেই গ্রহণ করেনি, এই অংশীদারীত্ব যে উত্তরকালে উত্তরাধীকারসূত্রেই তাদের মধ্যে বর্তমান, এ বর্ণনাটির মাধ্যমে আমাদের তারই খবর দেন জহির রায়হান।

“রাত দুপুরে সবাই যখন ঘুমে অচেতন তখন বৃটিশ মেরিনের সেপাহীরা এসে ছাউনি ফেলেছিল এখানে। শহরের এ অংশটায় তখন বসতি ছিল না। ছিলো, সার সার উর্ধ্বমুখী গাছের ঘন অরণ্য। দিনের বেলা কাঠুরের দল এসে কাঠ কাটতো আর রাতে হিংস্র পশুরা চড়ে বেড়াতো। শহরে তখন গভীর উত্তেজনা। লালবাগে সেপাহীরা যে কোনো মুহূ্র্তে বিদ্রোহ করবে। যে কটি ইংরেজ পরিবার ছিলো, তারা সভয়ে আশ্রয় নিলো বুড়িগঙ্গার উপর গ্রিনবোটে।”

(আরেক ফাল্গুন, জহির রায়হান)

উপন্যাসটি ১৯৫২-এর পরের সময় নিয়ে, সময়টি এমন ছিল যে তখন একসঙ্গে ১০জন রাস্তায় বেরোনো যেত না, আইনের আওতায় পড়তে হতো। অস্বাধীনতার রূপটি কেমন তা এ বিষয়টি দিয়েই বোঝা যায়। অন্যদিকে তারুণ্য, প্রেম আর মিটিং মিছিলিই এই রুদ্ধতাকে হঠিয়ে দিতে পারে। তাই আমরা দেখি মুহিম আর ডলির প্রেম উত্তাল সময়ের আবর্তে বাক নিতে থাকে, তাদের হৃদয়ের আর্তি কখনও একসাথে জমাট বাঁধতে পারে না, তবে হারিয়েও যায় না, এসবই পূর্ব পাকিস্তানের অস্থিরতারই ফল। ৫২ এর তিন বছর পর মুহিন তার স্মৃতিতে স্পষ্ট দেখতে পায় ভাষা আন্দোলনের মৃতদের মুখ, এরপর তাদের জন্য ছেলে, বুড়ো, ছাত্র জনতার একত্র হওয়া।

“যেদিকে তাকাও সমুদ্রের মত ছড়িয়ে আছে জনতা। আর সবার কন্ঠে বিদ্রোহের সুর।
এর জন্য পাকিস্তান চেয়েছিলাম আমরা?”
(ঐ)

সময়টি তখনও তরতাজা রয়েছে, তাই ৫২-এর অনেক চরিত্রকেও জহির রায়হান তুলে এনেছেন কাহিনির মধ্যে। এদের একজন আসাদ, তার স্লোগান, পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া, আর স্মৃতির বুননের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলেন সঙ্গে পাঠকদের সংযোগ তৈরি করা দেখতে পাই আমরা।

জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন উপন্যাসটি রাজনৈতিক, তবে সেটি ছাত্রদের রাজনীতি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রদের ভূমিকাকেই তুলে ধরেছেন তিনি উপন্যাসটিতে। উপন্যাসের মূল কাহিনি হলো ১৯৫৫ সালে ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ভাষাশহীদদের স্বরণে কালো পতাকা উত্তোলন, একুশে ফেব্রুয়ারি পালন। এই পতাকা উত্তোলনের নেতৃত্ব দেয় মুহিন ও আসাদ। আদতে এই মূল ঘটনাটিতে পৌঁছুতেই উপন্যাসজুড়ে বিভিন্ন উপকাহিনির সৃষ্টি করেছেন জহির রায়হান, যেমন মুহিন ও ডলির প্রেম, রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার হয়ে দুইহাত হাত হারানো রওশন ও তার স্ত্রী সালমার অনিশ্চিত সংসার, সালমার বড় চাচার প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকার চেষ্টা ও অন্যদেরও তার দলে ভেড়াবার চেষ্টা। আর এসবই ভাষাশহীদদের অবদান যে বৃথা যায়নি বরং গোপনে, অন্তরালে বিদ্রোহ যে দানা বাঁধছে তারই কতিপয় হীরকোজ্জ্ব ইঙ্গিত। কয়েকটি চরিত্র ও ঘটনা দিয়েই সেই সময়টিতে জহির রায়হান তুলে এনেছেন।

অন্যদিকে আরেক ফাল্গুন উপন্যাসের মূল চরিত্র ছাত্ররা, তবে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, বিরোধী পক্ষ কারা? বিরোধী পক্ষে আমরা লুই আলথুসের-এর (Louis Althusser) রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারেটাসকে দেখতে পাই, সেই দমনপীড়নের মূখ্যভূমিকায় আছে পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ বাহিনী। আলথুসেরের মতে দমনপীড়ন রাষ্ট্রেরই অংশ তবে কোনো সরকার দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে তাকে অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে নিজের আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে হয়। এটাই তাকে টিকিয়ে রাখে। আরেক ফাল্গুন উপন্যাসে জহির রায়হান আমাদের দেখান পাকিস্তান সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় তার আদর্শ বাস্তবায়ন করতে পারেনি, বরং সে বেছে নিয়েছে দমনের পথ।

আর ইতিহাস আমাদের বলছে পাকিস্থান ব্যর্থ হওয়ার পেছনেও এই শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের নিজেদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে না পারার বড় ভূমিকা রয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে ছাত্ররা যে দ্রোহের ও সচেতনতার রাজনীতি শুরু করেছিল ১৯৭১ তারই একপ্রকার পরিণতি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও ছাত্রদের ভূমিকাকে পাকিস্তান ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মিল ও পার্থক্যের সূত্র ধরেই স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে, উপন্যাসের শুরুতে যে সিপাহি বিদ্রোহের অবতারণা লেখক করেছেন তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলো ব্রিটিশ বাহিনী, তারই ছায়া অনুসরণ করে পাকিস্তান দমনপীড়নের পথ বেছে নিয়েছিল, কিন্তু জহির রায়হান কৌশলে দেখান ব্রিটিশদের চেয়ে পাকিস্তান একটি জায়গায় পিছিয়ে ছিল তা হলো ব্রিটিশরা শিক্ষাব্যবস্থাকেও তাদের দখলে নিয়েছিল—কিন্তু সেই দখলের সময় তাদের অজান্তেই পাশ্চাত্যের যুক্তিশীলতা ও আধুনিক বিজ্ঞানের পাঠও এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় চলে আসে— যা পাকিস্তান পারেনি, আর তাই এত দ্রুত তাদের প্রস্থান করতে হয়েছে। আর এই শিক্ষাব্যবস্থাই বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে যুগে যুগে রাজনৈতিক ভাষার যোগান দিয়েছে, দেশের হয়ে ছাত্রদের কন্ঠ ও মস্তিষ্কে উঠে এসেছে দ্রোহের ধ্বনি। ৫২, ৭১, ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান—সবখানেই এই দ্রোহ দৃষ্ট হয়েছে। এক্ষেত্রে জহির রায়হান আরেক ফাল্গুন উপন্যাসের মাধ্যমে ছাত্রদের ভূমিকাকে সফলভাবে তুলে আনার কৃতিত্বেরও দাবীদার। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে জহির রায়হান এই আশাবাদ আমাদের শোনান নামহীন এক ছাত্রের মুখে এই কথাটি তুলে দিয়ে,

“আর একজন বললো, এতেই ঘাবড়ে গেলেন নাকি? আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো।”
(ঐ)

এখানে দ্রোহী ছাত্রটির নাম কেন দেননি জহির রায়হান তার উদ্দেশ্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের সামনে। এর কারণ এই যে এই তরুণ ছাত্রটি ভবিষ্যতের লাখো প্রতিবাদীর প্রতীক, এই মোক্ষম বাক্যটি দিয়ে ইতিহাসের কাঠগড়ায় জহির রায়হানও সত্যি প্রমাণিত হয়েছেন। কারণ ইতিহাস জানাচ্ছে উপন্যাসটির নামহীন তরুণটির মতোই এদেশের লাখো তরুণ প্রকাশ্যে-গোপনে-আবডালে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছে আরেক ফাল্গুনকে সত্য করতে।

আরেক ফাল্গুন
লেখক: জহির রায়হান
বিষয়: উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৯ সাল
প্রকাশক: সন্ধানী প্রকাশনী
অনুপম প্রকাশনী, ২০১৬ (৫ম সংস্করণ)।

আরেক ফাল্গুন উপন্যাসটি কিনতে চাইলে

জহির রায়হানের শেষ বিকেলের মেয়ে উপন্যাসের রিভিউ।

মন্তব্য করুন

🛒 Cart 0